প্রটোকল সুবিধা না পাওয়ার অজুহাতে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি রনিকে। ফলে বাবার জানাজায় অংশ নেওয়া এবং শেষবারের মতো জন্মদাতার মুখ দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর। পল্টন থানায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে বন্দি আছেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রহিম রনি। আদালতে বিচারাধীন মামলা নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। কিন্তু যৌক্তিক প্রয়োজনে প্যারোলে মুক্তির সুবিধা আইনেই রয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদনের পরও রনিকে শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখা থেকে বঞ্চিত করার দায় সংশ্নিষ্টরা এড়াতে পারে না।

রোববার সমকালে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, শনিবার ভোরে রনির বাবার মৃত্যু হয়। এর পরই কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তাঁর আইনজীবী। কিন্তু শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় সংশ্নিষ্ট জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে রনির প্যারোলে মুক্তির জন্য সকালে আবেদন করা হলেও বিকেলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয় প্রটোকল সুবিধা না পাওয়ায় রনির মুক্তি মিলছে না। 

আমরা জানি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ২৪ ঘণ্টাই দায়িত্ব পালন করেন। কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও তাই। ছুটির দিনের অজুহাত সামনে এনে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কিনা তা কর্তৃপক্ষ যাচাই করে দেখতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ আসামি গ্রেপ্তার হলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের পাশাপাশি সন্ধ্যার পরও আদালত বসতে দেখা যায়। ছুটির দিন বলে রনির প্যারোল আবেদন আমলে না নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ দায়িত্বে গাফিলতি করেছে - এমন অভিযোগ এলে তা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। 

সম্প্রতি শেষ হলো পুলিশ সপ্তাহ। সামনে অনুষ্ঠিত হবে জেলা প্রশাসক সম্মেলন। প্রজাতন্ত্রের এসব কর্মচারী ঊর্ধ্বতনদের সামনে নিজেদের অতন্দ্র প্রহরী, পেশাদার, ত্যাগী নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করে থাকেন। মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক রনির প্যারোলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এত সময় নিলেন কেন; প্রটোকল সুবিধা কেন পাওয়া গেল না? গাজীপুর জেলা পুলিশ ও মহানগর পুলিশের এত সদস্য থাকা সত্ত্বেও প্রটোকলের জন্য চার থেকে পাঁচজন সদস্য পাওয়া কি খুব কঠিন ব্যাপার ছিল! ইজতেমার নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে- এটা আমরা জানি। কিন্তু রনির মতো বন্দির প্রটোকলে নিশ্চয়ই বাহিনীর বিশেষায়িত সদস্য দরকার ছিল না।

এর আগে একজন বন্দিকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হলেও জানাজা পড়ানোর সময় তাঁর হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি খুলে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দা জানান অনেকেই। সরকারের মন্ত্রীকেও এর সমালোচনা করতে দেখা গেছে। এবার আরেক সন্তানকে বঞ্চিত করা হলো বাবার জানাজায় অংশগ্রহণ করা থেকে। ঢাকার সিএমএম আদালতের সামনে থেকে জঙ্গি পালানোর পর বন্দিদের নিরাপত্তায় কারা কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অধিক সতর্ক হয়েছে। তাই বলে 'মানবিক' আচরণ থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত হবে না। করোনার সময় যাদের মানবিক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। পরে তারা এসে নিশ্চয়ই কোনো অমানবিক আচরণ করবেন না। 

জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার দায় যেমন সংশ্নিষ্টরা এড়িয়ে যেতে পারে না, তেমনি হাতকড়া পরিয়ে জানাজায় অংশগ্রহণ ও রনির প্যারোলে মুক্ত না হওয়ার দায়ও কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে যেতে পারে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর লালফিতার দৌরাত্ম্য কমানো দরকার। ডিজিটাল বাংলাদেশে প্যারোলের আবেদন যেন অনলাইনে কারা সদরদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সিনিয়র জেল সুপার/জেলার, জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার একযোগে দেখতে এবং দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারে সেই ব্যবস্থা করা দরকার। এসব তদারকির জন্য ২৪ ঘণ্টা নির্দিষ্ট ডেস্ক চালু রাখা যেতে পারে। ব্রিটিশ আমলের সিস্টেমে না চলে পরিবর্তন আনা দরকার। ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত এলে এর সুফল পাবে ভুক্তভোগী। আর তা না হলে 'যেই লাউ সেই কদু'। আর যেন কোনো রনির বেলায় এমন আচরণের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। চুন খেয়ে মুখ পুড়েছে বলে দই দেখলে ভয় পেলে চলবে না। জঙ্গি আর রাজনৈতিক মামলার আসামি এক নয়।