দার্শনিক ভলতেয়ার বলে গেছেন, 'আমি তোমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের অধিকারের নিশ্চয়তার জন্য আমি জীবন দিতেও কুণ্ঠিত নই।' আসলে গণতন্ত্র মানে মুক্তচিন্তা চর্চার স্বাধীনতা। বাংলাদেশের সংবিধানে মতামত প্রকাশে মোটাদাগে কিছু সংবেদনশীল বিষয় চিহ্নিত করা আছে; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, পররাষ্ট্রনীতি, শিষ্টাচার, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, ব্যক্তির মানহানির শঙ্কা অথবা কোনো উস্কানি। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তি চাইলেই যে কোনো কিছু বলতে পারে না। তবে এই গ্রাউন্ডগুলো সরকার চাইলে যেনতেনভাবে ব্যবহার করতে পারে না। দিতে পারে না কোনো মনগড়া ব্যাখ্যা। আইন অনুযায়ী, এসব বিষয়ে একমাত্র বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা রাখেন।

একুশে বইমেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি আদর্শ প্রকাশনীকে একটি প্রকাশনার কারণে বইমেলায় স্টলের অনুমতি দেয়নি। বাংলা একাডেমির বক্তব্য হলো- বইটি অমর একুশে বইমেলা ২০২৩-এর 'নীতিমালা ও নিয়মাবলি'র অনুচ্ছেদ ১৪.১৪ ও ১৪.১৫-এর পরিপন্থি। সেজন্য প্রতিষ্ঠানটি রোববার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, 'গত ২১ জানুয়ারি বিকেলে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, এবার আদর্শকে কোনো স্টল বরাদ্দ দেওয়া হবে না। এমনকি প্রকাশনা সংস্থা আদর্শ বইমেলার স্টল বরাদ্দসংক্রান্ত শর্তাবলি মেনে চলতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে স্টল বরাদ্দের লটারিতে অংশগ্রহণেও অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে।'

মাঝে দুই বছর বাদ দিলে ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এ দেশে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আছে। মনে রাখা দরকার, 'রাজনৈতিক দল' আর 'রাজনৈতিক সরকার' এক বিষয় নয়। দুটো পৃথক সত্তা! যে রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে, তাদের নিজেদের এবং দেশের স্বার্থে দল ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য টানা উচিত। দুটোই যেহেতু ইনস্টিটিউশন, সেহেতু কেউ কারও কাজে হস্তক্ষেপ না করাই শ্রেয়। পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যেন ক্ষমতাসীন দল এবং দলীয় সরকারকে আলাদা করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখার দায়িত্ব উভয়েরই।

দেশে দেশে যেসব মৌলিক অধিকার বা মানবাধিকারের জন্য সবচেয়ে বেশি আন্দোলন হয়, বিক্ষোভ বা আইনি লড়াই চলে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য হচ্ছে বাক বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তাই আন্তর্জাতিক আদালত, কমিটি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আদালতে এই অধিকারের পক্ষে সবচেয়ে বেশি বিচারিক রায় দেখা যায়। এই অধিকারের বিষয়বস্তু এখন অনেক বেশি বিস্তৃত এবং সুরক্ষিত। এই অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে এই অধিকারকে অহেতুক নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই আত্মঘাতী। বিরোধী দল বা বিরোধী মতের লোকেরা সরকারের বিপরীতে কথা বলবে, সমালোচনা করবে, লেখালেখি করবে- এগুলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক চর্চা। ক্ষমতাসীন দল এগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে। কিন্তু যথেষ্ট কারণ না থাকলে রাজনৈতিক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ব্যবহার অমূলক।

সরকার বইমেলার সময় বিভিন্ন বইয়ের ওপর পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কি আসলে নিজেদের কোনোভাবে লাভবান করে? খুব সহজ উত্তর হচ্ছে 'না'। একটি বই, একজন লেখক বা একটি প্রকাশনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা অথবা শর্তের বাড়াবাড়ি মূলত ওই বই, লেখক বা প্রকাশককে প্রকারান্তরে সুবিধা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে মানুষ এই ঘটনাগুলো তিল থেকে তাল করে ছড়াতে থাকে। ওই লেখক বা প্রকাশকের বই যদি আগে কেউ না-ও কিনত, এই কারণে তারা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বা সমর্থন পেতে থাকে। যে ব্যক্তি আসলে কোনো পাঠক নয় বা বইয়ের তেমন কোনো নিয়মিত ক্রেতাও নয়, সেও ওই প্রকাশক আর লেখকের পক্ষ নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে। হয়তো এক শ্রেণির পাঠক ছাড়া তেমন কেউ ওই বই ছুঁয়েও দেখত না; কিন্তু বইয়ের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার কারণে মানুষ ওই বইয়ের প্রতি দুর্নিবারভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে বইগুলোর ব্যাপক কাটতি ঘটে, পায় বিনা পয়সার প্রচারণা।

প্রযুক্তির কল্যাণে এখন অনেক প্রচারমাধ্যম বিদ্যমান। বইমেলায় পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো বই যদি বিক্রি না হয়, দোকানে অন্য সময়ে স্বাভাবিকভাবে বিক্রি হতে তো সমস্যা থাকবে না। যেহেতু সেসব বই অফিসিয়ালি নিষিদ্ধ নয়। হার্ড কপি হিসেবে বিক্রি হতে যদি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করা হয়, বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেগুলো প্রচার পাবে। এমনকি অডিও বুক আকারেও যে কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সত্যি কথা বলতে, মানুষ তার চিন্তাকে ছড়িয়ে দিতে এখন অনেকটাই বেপরোয়া। আর প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে অনেকটা সহায়তা করে। তাই আদর্শ প্রকাশনীকে এতটা 'হাইলাইটেড' হওয়ার সুযোগ সরকার না দিলেও পারত! স্মরণ রাখা দরকার, এখন আর কোনো কিছুই গোপন থাকে না। কী, কীভাবে এবং কেন- সব প্রশ্নের উত্তরই কেউ না কেউ দিতে বা প্রকাশ করতে প্রস্তুত। সবকিছুতেই নির্বাহী আদেশ বা গুপ্ত হুকুম দেওয়ার মানে হয় না। এতে আপাতদৃষ্টে কোনো উদ্দেশ্য হাসিল হলেও ভবিষ্যতে তা ভালো ফল দেয় না। রাজনীতি অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের কৌশলের সমষ্টি। শুধু বর্তমান নিয়ে ভাবলে রাজনৈতিক সরকারের চলে না। তাকে ভবিষ্যতের হিসাবনিকাশেও তীক্ষষ্ট দৃষ্টি রাখতে হয়।