১ ফেব্রুয়ারি যে ছয়টি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেগুলো- অতীত অভিজ্ঞতা অনুসারে- এক প্রকার নিয়মরক্ষার নির্বাচনই হওয়ার কথা। সব কয়টি আসনেই ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন। গত ডিসেম্বরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের 'কৌশল' হিসেবে দলটির সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে দলটির পক্ষে নিজেদের শূন্য আসনে আবারও নির্বাচন করার কোনো কারণ নেই। দলটির ঘোষিত বর্তমান সরকার ও ইসির অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার নীতি প্রতিপালনের বিষয়টিও এখানে কাজ করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ উপনির্বাচনগুলোয় শাসক দল আওয়ামী লীগের এক ধরনের ওয়াকওভার পাওয়ার কথা। বহু দশক ধরেই- বিশেষত গণঅভ্যুত্থানে সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রার পর থেকে- দেশের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি তৎপরতাকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনেও এ দুই দলই প্রধান খোলোয়াড়। বলা হয়ে থাকে, ভোটারদের অন্তত ৮০ শতাংশ এ দুই দলকে সমর্থন করেন, যেখানে দুই দলের শেয়ারও প্রায় কাছাকাছি। ফলে বিএনপিবিহীন উপনির্বাচনগুলোতে ভোটারদের খুব একটা আগ্রহ না থাকারই কথা; বাস্তবতাও অনেকটা তেমনই বলে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে।

উপনির্বাচনগুলোতে বর্তমানে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি প্রার্থী দিলেও তাদেরকে সাধারণ মানুষ- বাস্তব কারণেই- ক্ষমতাসীনদের সহযোগী হিসেবেই গণ্য করে। প্রধানত রংপুর অঞ্চলে তাদের উল্লেখযোগ্য সমর্থক থাকলেও দলটি প্রায় দুই দশক ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট চর্চা করে আসছে। একাধিকবার আওয়ামী লীগের কাছ থেকে মন্ত্রিত্বেরও ভাগ নিয়েছে এরশাদের হাতে গড়া দলটি। ফলে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণও আজকের উপনির্বাচনগুলো সম্পর্কে ভোটারদের অনাগ্রহে খুব একটা চিড় ধরাতে পারেনি।

তবে এ নিস্তরঙ্গ ভোটের মাঠেও- অন্তত সংবাদমাধ্যমে- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এর উপনির্বাচন বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ আলোচনার প্রাথমিক কারণ নিজের ছেড়ে দেওয়া আসনে উকিল আবদুস সাত্তারের- যিনি ৪৩ বছর দলটি করার পর সম্প্রতি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন অথবা দল যাঁকে ছেড়ে দিয়েছে- স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা হলেও, তাঁর সমর্থনে শাসকদলের তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পাশাপাশি গোটা দল ও প্রশাসনের সক্রিয়তাই মানুষকে এ নিয়ে কৌতূহলী করেছে বেশি। সরকারি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পর্যন্ত সাত্তার সাহেবের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন। বয়োবৃদ্ধ সাত্তার সাহেবকে মানুষ ভোটের ময়দানে খুব একটা না পেলেও শাসক দলের একাধিক সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় নেতাকর্মী তাঁর প্রতীক কলার ছড়ির পক্ষে ব্যাপকভাবে চষে বেড়িয়েছেন সরাইল-আশুগঞ্জের আনাচ-কানাচ। এমনকি সাত্তার সাহেবের জয়ের পথ পরিস্কার করতে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরও জাতীয় পার্টির নেতা রেজাউল ইসলামকে প্রার্থী হতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। জাতীয় পার্টি থেকে এই আসনে ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন জিয়াউল হক মৃধা। কিছু উন্নয়নকাজ করার কারণে সেখানে নাকি জনপ্রিয়তাও আছে তাঁর; কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও তিনি বসে গেছেন।

কাহিনি এখানেই শেষ নয়; মঙ্গলবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি দলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি থেকে সদ্য বহিস্কৃত আবু আহমেদ আসিফ হয়ে গিয়েছিলেন আবদুস সাত্তারের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী; অদৃশ্য কারও চাপে তিনিও এখন 'লাপাত্তা'। অর্থাৎ সরকার ও সরকারি দলের যৌথ প্রয়াসে উকিল আবদুস সাত্তারের আবারও সংসদ সদস্য হওয়া প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁর এ জয়ের রথকে কণ্টকমুক্ত করতে এই যে এত কাণ্ড ঘটানো হলো, যেখানে দৃশ্যত সরকার ও সরকারি দলের চাপের মুখে একের পর এক প্রার্থী সরে দাঁড়ালেন, যে কারণে নির্বাচনটা একটু প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় হওয়ার সুযোগও শেষ হয়ে গেল, সেখানে কি ইসি বা নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার ছিল না?

গত বছরের মার্চে দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যতগুলো স্থানীয় নির্বাচন ও সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই ছিল আলোচিত এবং তার অন্যতম কারণ ছিল- বিশেষত দুই পূর্বসূরির সঙ্গে ভিন্নতা তৈরির মাধ্যমে- নির্বাচনগুলোতে ইসির সদর্থক ভূমিকা। এর আগের দুই ইসি যেখানে চূড়ান্ত মেরুদণ্ডহীনতার পরিচয় দিয়ে জাতীয় কিংবা স্থানীয় সব নির্বাচনকেই প্রহসনে পরিণত করেছিলেন, নির্বাচনব্যবস্থার ওপর ভোটারদের আস্থা প্রায় তলানিতে নিয়ে গিয়েছিলেন; সেখানে বর্তমান ইসি অন্তত ভোটারদের আস্থা ফেরাতে এ পর্যন্ত কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেননি।

এ ইসির অধীনে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় নির্বাচন ছিল কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আমরা দেখেছি নির্বাচনী বিধি ভাঙার কারণে- আইনের ফাঁকফোকর তা কার্যকর হতে না দিলেও- সরকারদলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্যকে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁরা। ঝিনাইদহ পৌর নির্বাচনে আচরণ বিধি ভঙ্গ করায় সরকারদলীয় প্রার্থীর প্রার্থিতা পর্যন্ত বাতিল ঘোষণা করেছিলেন। সর্বশেষ- বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে- গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচন স্থগিত করার ঘটনা তো এখনও স্মৃতিতে বেশ তাজা আছে। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপনির্বাচন নিয়ে ইসি- একেবারে শুরু থেকে শেষ অবধি- তেমন কোনো কথা বললেন না!

হ্যাঁ, সোমবার- নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে- ইসি আবু আহমেদ আসিফকে খুঁজে বের করার জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু তা কতটা মুখ রক্ষার্থে আর কতটা দায়িত্ববোধ থেকে দেওয়া হয়েছে- এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ খেলা শেষ হওয়ার পর প্রতিদ্বন্দ্বীকে পুরো মাঠ ছেড়ে দিলেও ফল পাল্টায় না।এটা ঠিক, আবদুস সাত্তারের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরে যেতে বাধ্য করার জন্য সরকারকে হয়তো অন্তত আইনগতভাবে দায়ী করা যাবে না; কারণ দৃশ্যত সবাই স্বীয় বিবেচনাতেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু বিচারের ক্ষেত্রে সারকামস্টান্সিয়াল এভিডেন্স বা পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে প্রাপ্ত সাক্ষ্য বলে একটা বিধান আছে; যা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপনির্বাচন সরকার-সমর্থিত প্রার্থীর অনুকূলে নেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের ভূমিকার প্রশ্নে বেশ স্পষ্ট।

এমনিতেই- গাইবান্ধার উপনির্বাচনে সিসি ক্যামেরার সাফল্যজনক ব্যবহার সত্ত্বেও- বুধবারের ছয়টি উপনির্বাচনে সিসি ক্যামেরা না থাকার বিষয়টি একটু হলেও জল্পনার জন্ম দিয়েছে। কারণ হিসেবে ইসির পক্ষ থেকে তহবিল ঘাটতির কথা বলা হলেও, এমন মানুষের অভাব নেই, যাঁরা মনে করেন- গাইবান্ধার উপনির্বাচন স্থগিতের পর সরকার ও সরকারি দলের অনেকে ইসির বিরুদ্ধে যে ধরনের সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন, যেখানে কোনো কোনো মন্ত্রী এমনকি নির্বাচনী বুথের ভেতর সিসি ক্যামেরা স্থাপনের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইসি হয়তো চলমান প্রায় গুরুত্বহীন উপনির্বাচন ঘিরে এমন কোনো পরিস্থিতি এড়াতে চায়। বলা বাহুল্য নয়, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার উপনির্বাচনে সরকারের তরফ থেকে ভোটারদের আস্থা নষ্ট করার মতো কাণ্ডকীর্তি দেখেও ইসির প্রায় নিষ্ফ্ক্রিয়তা ওই সন্দেহকে আরও উস্কে দেবে; যার নেতিবাচক প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনেও দেখা যেতে পারে।