নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ২০০৭-১১ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সম্মাননীয় এ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলশাস্ত্রে ১৯৬১ সালে স্নাতক ও ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯৬৩-২০০৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮২-৮৬ চার বছর ব্যাংককের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর জন্ম ১৯৩৯ সালে, শরীয়তপুরে।

সমকাল: সম্প্রতি রাজধানীর সিদ্দিকবাজার ও সায়েন্স ল্যাবের কাছে দুটি প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

নজরুল ইসলাম: শুধু ঢাকা মহানগর নয়, দেশের অন্যান্য স্থানে প্রায়ই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের এক বছর না ঘুরতেই সীমা অক্সিজেন প্লান্টে ট্র্যাজেডি দেখতে হলো। গত ৫ মার্চ সায়েন্স ল্যাবের কাছে একটি ভবনে বিস্ফোরণে হতাহতদের পরিবারে শোক না কাটতেই ৭ মার্চ পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণে দুটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অনেক মানুষের প্রাণহানি দেখতে হলো। পরপর ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনা আমাদের জন্য ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ভবনই তুলনামূলক নতুন। এরপরও কীভাবে এতটা ক্ষয়ক্ষতি হলো, তা তদন্ত প্রতিবেদন পেলে বোঝা যাবে।

সমকাল: তিতাস গ্যাস দাবি করেছে, তাদের লাইনে ত্রুটি ছিল না। বোমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিস্ফোরক থেকে বিস্ফোরণ ঘটেনি। ঘটনার সম্ভাব্য কারণ তাহলে কী হতে পারে?

নজরুল ইসলাম: এ ধরনের বিস্ফোরণের নিয়ামক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়– গ্যাস লাইনে ত্রুটি, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার ও জেনারেটর বিস্ফোরণ অথবা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসি বিস্ফোরণ। আগুন লাগার ক্ষেত্রে রান্নার চুলা ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ থেকেও এমন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

সমকাল: ঢাকা শহরে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন তৈরিতে বিল্ডিং কোড না মানার অভিযোগ বিস্তর। বাস্তবতা কী হতে পারে?

নজরুল ইসলাম: দেশে নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে না– এটি সরকারিভাবে স্বীকৃত। স্বয়ং রাজউকের চেয়ারম্যানকে বলতে শোনা গেছে– ৯০ শতাংশ ভবন নিয়ম মেনে নির্মাণ করা হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এসব ঠেকাতে না পারার কারণ হতে পারে, তাদের পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের অভাব ও সদিচ্ছার ঘাটতি। অথচ ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার আগে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। দুবাই, হংকংয়ে ৫০ তলা ভবন নির্মাণ করলেও অগ্নি ও ভূমিকম্প নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। আমরা ২০-৩০ তলা বা এর চেয়ে কম উঁচু ভবনেও তা নিশ্চিত করতে পারছি না। এ ঘাটতির খেসারত মাঝেমধ্যেই দিতে হচ্ছে। বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা এর একটা উদাহরণ। আধুনিক নগরীতে এটি কাম্য নয়। একটি ভবন নির্মাণ করতে হলে রাজউকের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং ক্ষেত্রবিশেষে সিভিল এভিয়েশনের ছাড়পত্র নিতে হয়। যদি বিল্ডিং কোড মানা না হয় এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা দক্ষ জনবল দিয়ে তদারক না করে, তাহলে এসব দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে না। নাশকতা হলে তা ভিন্ন বিষয়। নাশকতা ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শুরু করে ভারত-পাকিস্তানেও হচ্ছে।

সমকাল: বিস্ফোরণে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে ভবন নির্মাণে কারিগরি ত্রুটিই কি প্রধান নয়?

নজরুল ইসলাম: অন্যতম প্রধান কারণ কারিগরি ত্রুটি। আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুতল ভবন ছিল না। এখন ১৫-২০ তলার টাওয়ার হয়েছে। বস্তিবাসী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসনের জন্য ১৬ থেকে ২০ তলার টাওয়ার হচ্ছে। আমরা আশা করব, সরকারি এসব ভবনে যেন নির্মাণজনিত ত্রুটি না থাকে। বেসরকারি ভবন নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনাপত্তি নিতে হয়। কিন্তু সরকারি ভবনের ক্ষেত্রে ধরেই নেওয়া হয়, তাদের এসব ছাড়পত্র রয়েছে। যদি কোনো সরকারি ভবনে দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতি জনমনে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হবে।

সমকাল: রাজউক, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখছেন?

নজরুল ইসলাম: সমন্বয়হীনতা কিছুটা রয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। আগে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি হতো। এখন কেন হচ্ছে না, জানি না। ঢাকা সিটি করপোরেশনের দু’জন মেয়রই মন্ত্রী পদমর্যাদার। অন্যান্য সংস্থার চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী সচিবের ঊর্ধ্বে নন। সুতরাং মেয়রের নেতৃত্বে সমন্বয় কমিটি হতে পারে। ড্যাপের সমন্বয়ের জন্য স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটি রয়েছে। এতে আংশিক সমন্বয় হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীর ২ কোটি বাসিন্দার নিরাপত্তার স্বার্থে সব ব্যাপারেই সমন্বয় কমিটি থাকা উচিত। দরকার হলে সরকারের একজন মন্ত্রী এর নেতৃত্ব দেবেন। সব ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে না থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর উচিত সমন্বয় করে কাজ করা।

সমকাল: সিদ্দিকবাজারে বিস্ফোরণের ৭ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও অনেকের প্রাণহানি ঠেকানো যায়নি। ঘটনাস্থল মূল সড়কে না হয়ে গলিতে হলে ভয়াবহতা কি আরও বাড়ত?

নজরুল ইসলাম: পুরান ঢাকার নিমতলী, চুড়িহাট্টার মতো গলিতে দুর্ঘটনা হলে ফায়ার সার্ভিস তথা উদ্ধারকারী সংস্থার গাড়ি প্রবেশ করাতে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। সে ক্ষেত্রে সায়েন্স ল্যাব ও সিদ্দিকবাজারে দ্রুততম সময়ে তারা উদ্ধারকাজ শুরু করতে পেরেছে। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নির্ভর করে দুর্ঘটনার ধরনের ওপর। বিস্ফোরণে তাৎক্ষণিক প্রাণহানি ঘটে গেলে উদ্ধারকারীরা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পৌঁছেও স্বজনের কান্না থামাতে পারেন না। রাস্তার প্রশস্ততা কমপক্ষে ১২ ফুট না হলে ভবন নির্মাণ করা যাবে না। দেখা যাচ্ছে, রাজউক ও সিটি করপোরেশনের দুর্বলতার কারণে এ নিয়ম ভাঙা হচ্ছে। রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক, ব্যবসায়িক অযোগ্যতা ও দুর্নীতি অনেক সময় অবৈধভাবে ভবন নির্মাণে সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

সমকাল: সম্প্রতি এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ার কারণ কী?

নজরুল ইসলাম: রাজনীতিবিদরা এসব ঘটনার নেপথ্যে নাশকতার ঘ্রাণ পেতেই পারেন। তবে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। তদন্তে নাশকতার প্রমাণ পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর নিয়ম না মানা ও রক্ষণাবেক্ষণে ত্রুটির কারণে হলে তা দূর করতে হবে। কড়াইল বস্তিতে গত ৩০ বছরে অসংখ্যবার আগুন লেগেছে। বাংলাদেশে না হলেও পৃথিবীর অনেক দেশে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়। আমি ১৯৮২-৮৬ সালে ব্যাংককে ছিলাম। সেখানে দেখেছি, নতুন ভবনে অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে। ইন্স্যুরেন্সের জন্য বড় বড় কোম্পানি এসব করে থাকে।

সমকাল: এসি বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ভবন নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে; যদি মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানে তাহলে পরিণতি কী হবে?

নজরুল ইসলাম: ঢাকা, সিলেটসহ দেশের অনেক স্থানই ভূমিকম্প-সতর্কতার মধ্যে রয়েছে। তুরস্ক, সিরিয়ার মতো ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভবন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আধুনিক নিয়ম মেনে ভবন তৈরি করতে হবে। ভবনে দুর্যোগকালীন নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেই চলবে না; এগুলোর ব্যবহার সবাইকে শেখাতে হবে। এসি, বৈদ্যুতিক সংযোগ, লিফট, রান্নার চুলা ও গ্যাস সিলিন্ডার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সমকাল: বিদ্যমান বাস্তবতায় নগরের নিরাপত্তায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?

নজরুল ইসলাম: বড় শহরে পরিকল্পনা বিভাগ ও ছোট শহরে প্রকৌশল দপ্তর রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চিত করতে হবে– নিয়ম অমান্য করে কোনো স্থাপনা নির্মিত হবে না। এ দীর্ঘসূত্রতার অবসান দরকার। দুবাই, সিঙ্গাপুরে একটি ভবনও নিয়মের বাইরে গিয়ে নির্মাণ করা যায় না। উন্নয়নশীল দেশ বলে ভুল-ত্রুটিকে স্বাভাবিক বিষয় মনে করে সান্ত্বনা নিলে ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে। সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি জোরদার করে ঝুঁকি কমাতে হবে। রাজউক ড্যাপ প্রণয়ন করেছে। ২০১৬-২০৩৫ এর পরিকল্পনাটি পাস করতেই সাত বছর লেগেছে। এত মন্থর গতিতে চললে হবে না। রাজউকের পরিকল্পনাকে মডেল ধরে অন্য শহরও কাজ করতে পারে। যদিও ড্যাপের ব্যাপারে পরিবেশবিদ ও প্রকৌশলীদের কারও কারও ভিন্নমত রয়েছে। এসব মতামতের যৌক্তিকতা যাচাই করে এটিকে আরও বাস্তবমুখী করা যেতে পারে।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

নজরুল ইসলাম: সমকালের জন্য শুভকামনা।