গত ৩ জুলাই আফ্রিকার দেশ মালি থেকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে তিন দশক ধরে অংশগ্রহণ করছে। মালিতে জাতিসংঘের মিশনের বৃহত্তম দলটিও ছিল বাংলাদেশের। তাই এই ঘোষণাপর্ব ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ শুরু করে বাংলাদেশ। এরপর থেকে দেশের জন্য গর্ব ও মর্যাদা বয়ে আনছেন শান্তিরক্ষীরা। এ পর্যন্ত এক লাখ ৮৮ হাজার ৫৫৮ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪০টি দেশে জাতিসংঘের ৬৩টি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ দিয়েছেন ১৬৭ জন।   

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, সাহসিকতা ও মানবিকতার জন্য প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন। জাতিসংঘের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ একদিকে জাতীয় মর্যাদার বিষয়, অন্যদিকে এর আর্থিক এবং রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সুফলও রয়েছে। বাংলাদেশের ‘উদীয়মান শক্তির’ নেপথ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ জাতিসংঘের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। যখনই প্রয়োজন তখনই উৎসাহের সঙ্গে সাড়া দেওয়ার বিষয়টি ‘জাতিসংঘের মডেল সদস্য’ হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সাহায্য করেছে।

মালির সরকারের অনুরোধে ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল দেশটিতে জাতিসংঘের বহুমাত্রিক সমন্বিত স্থিতিশীলতা মিশন (এমআইএনইউএসএমএ) শুরু করে নিরাপত্তা পরিষদ। ২০১২ সাল থেকে পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটি বিদ্রোহ, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, জাতিগত সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হয়। সরকার দেশের বেশিরভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে মালিতে শান্তিরক্ষী সেনা মোতায়েনের আগেই দেশটিতে ফরাসি, আফ্রিকান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সৈন্য মোতায়েন করা হয়। 

মালিতে জাতিসংঘের মিশনটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান। এই মিশনে জাতিসংঘের ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি খরচ হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছেন ৩০৯ জন শান্তিরক্ষী। 

বাংলাদেশ প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ এই মিশনে সেনা পাঠাতে জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। গত মে মাস পর্যন্ত এক হাজার ৩৩১ জন সেনাসদস্য, ৪৭ জন অফিসার ও ২৮২ জন পুলিশ সদস্য বাংলাদেশ থেকে এই মিশনে যোগ দেন। মিশনের সবচেয়ে বড় দলটি ছিল বাংলাদেশের।

শান্তিরক্ষার প্রথাগত কাজের (যেমন- ঘাঁটি সুরক্ষা, টহল, সামরিক পর্যবেক্ষণ ও যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা) পাশাপাশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সেনাবহর পাহারা দিয়েছেন। মালির মানুষকে মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়েছেন। এর মাধ্যমে স্থাপন করেছেন বেসামরিক-সামরিক সহযোগিতার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

মিশনে অংশ নেওয়া অন্যান্য দেশ, জাতিসংঘ ও স্থানীয় জনগণ মালিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, কর্তব্যপরায়ণতা, মানবিকতা ও কঠোর শৃঙ্খলার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বারবার পুরস্কৃত হয়েছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল ওই মিশনে ১৩৯ জন বাংলাদেশি পুলিশ সদস্য জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা পদক পান। ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ১৪০ জন বাংলাদেশি পুলিশ সদস্য শান্তিরক্ষা পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২২ সালের ২৮ নভেম্বর ৩২৯ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জাতিসংঘ পদক পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশিরা মিশনে প্রশংসিত হলেও মালির সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছিল। ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে মালির সরকার উৎখাত করে সেনা-নিয়ন্ত্রিত অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। ২০২১ সালের ২৪ মে আরেক সামরিক অভ্যুত্থানে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করে সেনা-নিয়ন্ত্রিত নতুন সরকার গঠিত হয়। এদিকে, মোতায়েন মিনুসমা ও ইউরোপীয় সেনা সম্পর্কে  দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। 

মালি সরকার ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাশিয়ান ভাড়াটে সৈন্যবাহিনী নিয়োগ করে। মস্কোর দিকে এই ঝুঁকে পড়ার কারণে অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে বামাকোর (মালির রাজধানী) সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ২০২২ সালের জুন ও আগস্টে মালি থেকে ইউরোপীয় এবং ফরাসি সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়।

একই সময়ে মালি সরকার জাতিসংঘের মিশনের ওপর বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে। ২০২২ সালের জুলাই মাসে বামাকোতে আসার সময় ‘ভাড়াটে’ তকমা দিয়ে ৪৯ জন আইভোরিয়ান সৈন্যকে আটক করা হয়। আইভোরি সরকার বলেছিল আটক সৈন্যরা জাতিসংঘের মিশনে গেছেন। 

ওই বছরই জাতিসংঘের মিশন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে হাজার হাজার মালিয়ান বিক্ষোভ করেন। গত ১৬ জুন মালি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘকে শান্তিরক্ষী প্রত্যাহারের অনুরোধ করে। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী কোনো দেশের ভূখণ্ডে ওই দেশের সরকারের অনুমতি ছাড়া শান্তি অভিযান পরিচালনা করা যায় না। তাই জাতিসংঘ মালি সরকারের অনুরোধ মেনে নেয়। নিরাপত্তা পরিষদ গত ৩০ জুন বহুমাত্রিক সমন্বিত স্থিতিশীলতা মিশনটি বাতিল করার পক্ষে ভোট দেয়।

জাতিসংঘ আগামী বছরের ১ জানুয়ারির মধ্যে মালি থেকে শান্তিরক্ষীদের পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেবে। এর অংশ হিসেবেই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাহার করা। বাংলাদেশের পাশাপাশি ইতোমধ্যে জার্মানিও তাদের শান্তিরক্ষী প্রত্যাহার শুরু করেছে।

মালি থেকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রত্যাহারকে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ জাতিসংঘ বা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ‘এক ধরনের শাস্তি’ বলে উল্লেখ করতে চাইছেন। এই ব্যাখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেশের ভাবমূর্তি ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। বেশিরভাগ বাংলাদেশি মালিতে জাতিসংঘের শান্তি অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। ফলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রত্যাহার নিয়ে (এ ধরনের প্রোপাগান্ডায়) তাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। 

মনে রাখতে হবে, মালিতে এই মিশন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনের একটি। ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘের মিশনে অংশ নিয়ে যে ১৬৭ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রাণ দিয়েছেন তাদের মধ্যে মালিতেই নিহত হয়েছেন ১৬ জন। নিহতের হারে এটি ৯.৫৮ শতাংশ। মালির বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এই প্রাণহানির জন্য দায়ী। এখন যেহেতু মালি সরকারও মিশন আর চায় না, তাই দেশটি শান্তিরক্ষীদের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে মালি থেকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রত্যাহার একটি যথাযথ ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।

এ আলোচনা থেকে উপসংহারে সংক্ষেপে তিনটি কথা বলে যেতে পারে। 

প্রথমত, মালিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা, কঠোর পরিশ্রম ও মানবিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। সেটি জাতিসংঘ ও মালিয়ান কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশটির সাধারণ মানুষও স্বীকার করেন।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা পরিষদ মালিতে জাতিসংঘের কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে সেখান থেকে সকল শান্তিরক্ষী প্রত্যাহার করা হবে।

তৃতীয়ত, মালি থেকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রত্যাহারের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি বাংলাদেশের ওপর কোনো ধরনের ‘শাস্তি’ও নয়। বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষাপ্রধান জ্যঁ-পিয়ের ল্যাক্রোইক্সের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর ইঙ্গিত করছে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘ আরও শান্তিরক্ষী নিয়োগ করবে।

তাই মালি থেকে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাহারের ঘটনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। বরং মালিতে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রচেষ্টা এবং আত্মত্যাগকে স্বীকৃতি ও সম্মান জানানো উচিত। 

মো. হিমেল রহমান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর। আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত বিষয়ের বিশ্লেষক। সাউথ এশিয়ান ভয়েসেস ও দ্য জিওপলিটিক্সসহ দেশি-বিদেশি নানা প্ল্যাটফর্মে তার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। 

দ্য জিওপলিটিক্স থেকে ভাষান্তর করেছেন হাসনাত কাদীর।

/এইচকে/