আলোচনায় ফেনীর মেয়র আলাউদ্দিন

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

বিশেষ প্রতিনিধি,ঢাকা নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা

কুমিল্লার এক জামায়াত নেতার বাড়ি থেকে রোববার যুবলীগের বহিস্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট গ্রেফতারের পর আলোচনায় ফেনীর মেয়র হাজি আলাউদ্দিন। সম্রাটকে আশ্রয়দাতা জামায়াত নেতা মনিরুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে ছক্কা মিয়া আলাউদ্দিনের ভগ্নিপতি। আলাউদ্দিনের সঙ্গে সম্রাটের গভীর সখ্য রয়েছে। জানা গেছে, সম্রাটের মতো আলাউদ্দিনও অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার  মালিক হয়েছেন।

মেয়র আলাউদ্দিন সমকালকে বলেন, 'সম্রাট এলাকার ছেলে। আমাদের দু'জনের বাড়ি ফেনী। তার সঙ্গে আগে থেকেই ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। আমার ভগ্নিপতির বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। গ্রেফতারের চার-পাঁচ দিন আগে সে ওই বাসায় উঠেছিল। সম্রাটের এক চাচাতো ভাই সম্পর্কে আমার ভগ্নিপতির খালাতো ভাই হয়। সেই সূত্র ধরে সম্রাট তার বাসায় ওঠে। সম্রাট আমার কাছে আশ্রয় চাইলেও আমি তাকে আশ্রয় দিতাম।'

মেয়র আলাউদ্দিন আরও বলেন, একবার এনা পরিবহন কর্তৃপক্ষ তার স্টার লাইনের সব বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। এলাকার ছেলে হিসেবে তখন সম্রাটের কাছে সহযোগিতা চান। ওই ঘটনায় সম্রাট সহযোগিতা করেছেন। কয়েকবার তার কাকরাইলের অফিসে এসেছেন তিনি। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল, সেটা কেন অস্বীকার করব? আমার মেয়ের ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অনেকদিন ধরে সিঙ্গাপুরে ছিলাম। সেখানে কয়েকবার সম্রাটের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। মোস্তফা মার্টে একসঙ্গে খেয়েছি। তবে দুই থেকে আড়াই মাস ধরে সম্রাটের সঙ্গে কোনো কথা হয় না।

সম্রাটকে আশ্রয় দেওয়া কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামের চৌধুরী বাড়িটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জামায়াত অধ্যুষিত গ্রাম হিসেবে একসময় পরিচিতি ছিল এর। জামায়াত নেতা ছক্কা মিয়ার সঙ্গে তার বাড়িতেই আত্মগোপনে ছিলেন সম্রাট। শনিবার রাতে চৌদ্দগ্রামের ওই বাড়ি থেকেই যুবলীগের আরেক নেতা এনামুল হক আরমানসহ সম্রাটকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। বাড়িটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে।

বাড়ির মালিক পরিবহন ব্যবসায়ী ছক্কা মিয়ার বোন নাজু বেগম জানান, র‌্যাব যাদের ধরে নিয়ে যায়, তারা তিন দিন আগে এ বাড়িতে আসে। দোতলা বাড়িটির দোতলায় একটি কক্ষে তারা থাকত। সেখানেই তাদের খাবার পাঠিয়ে দিতেন তিনি। তারা কখনও বাসার বাইরে বের হতেন না। তিনি বলেন, আমাদের জানানো হয়, তারা বেড়াতে এসেছেন। তিন মাস আগে তার ভাই বাড়িটির নির্মাণকাজ শেষ করেন।

জানা গেছে, অভিযানের পরপরই ছক্কা মিয়া আত্মগোপনে চলে যান। তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি। ঢাকা-ফেনী রুটে চলাচলকারী স্টার লাইন পরিবহনের মালিক হাজি আলাউদ্দিন। ছক্কা মিয়া স্টার লাইনের পরিচালক। ছক্কা মিয়া ফেনীতেই বেশি থাকেন। তার পরিবার ঢাকায় থাকে। সম্রাটের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরাম থানার মির্জানগর ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রামে। গ্রামটিও ভারত সীমান্তের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সম্রাটের মতো মেয়র আলাউদ্দিনও অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তিনি পেট্রোলপাম্প, ইটভাটা, অটো বিস্কুট ও ময়দা কারখানার মালিক। এ ছাড়া ফেনী শহরে অন্তত তিনটি বড় মার্কেটের মালিক তিনি।

পৌর মেয়র হয়েছেন রাজনৈতিক ভোল পাল্টে। আশির দশকে ফেনী বাজারের তাকিয়া রোডে ছোট্ট একটি দোকান ছিল তার। স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা জানান, তৎকালীন জাতীয় পার্টির মন্ত্রী জাফর ইমাম ফেনীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য টাইগার বাহিনী গঠন করেছিলেন। আলাউদ্দিন ছিলেন এই বাহিনীর প্রধান।

স্থানীয় কয়েক নেতা জানান, জাতীয় পার্টির পতনের পর আলাউদ্দিন বিদেশে পালিয়ে যান। পরে বিদেশ থেকে ফিরে এসে স্টার লাইন পরিবহন সার্ভিস চালু করেন। একসময় ফেনী জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হন তিনি। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তখন আলাউদ্দিন দল বদলানোর প্ল্যাটফর্ম খুঁজতে থাকেন। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের এক নেতাকে ম্যানেজ করে জাতীয় পার্টির কোটায় উপনির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন লাভ করেন। ২০১৪ সালে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পরশুরামে অনুষ্ঠিত সভায় দুই নেতাকে ফুলের মালা দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন আলাউদ্দিন। জাতীয় নির্বাচনের পর পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন লাভ করেন তিনি।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে মেয়র আলাউদ্দিন সমকালকে বলেন, ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করছি। মেয়র হওয়ার পর কোনো সম্পদ করিনি। টাইগার বাহিনী নয়, ছিলাম টাইগার ক্লাবের সদস্য। এই ক্লাব থেকে অনেককে সাহায্য করা হতো। জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করার পর দলের জন্য অনেক কাজ করেছি। ২০১৩-১৪ সালে চারদলীয় জোটের আগুন সন্ত্রাস মোকাবেলায় ভূমিকা রেখেছি।

কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামের আবদুল কুদ্দুস নামের এক গ্রামবাসী জানান, ছক্কা মিয়া ছাত্রশিবিরের নেতা ছিলেন। পরে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। ফেনী থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। ২০১৩ কিংবা ২০১৪ সালের দিকে তার ভাতিজা নাজিম চট্টগ্রামে নাশকতা চালাতে গিয়ে গ্রেফতার হন। আরেক ভাতিজা তসলিমকে এ বাড়ি থেকেই বিপুল পরিমাণ ককটেলসহ আটক করে পুলিশ। গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন জানান, ছক্কা মিয়া জামায়াতের লোক। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক হেলালও জানিয়েছেন, মনির চৌধুরী জামায়াতের নেতা।

গ্রামবাসী জানান, আলাউদ্দিনের ব্যবসা দেখভালের সুবাদে ছক্কা মিয়াও টাকার কুমির হয়ে যান। ফেনীতে ছক্কা মিয়ার ইটভাটা রয়েছে বলে গ্রামবাসী জানান।