আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস আজ

জীবিকার সংকটে নারীরাও

পাহাড়ের চিত্র

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা, বান্দরবান

করোনায় এমন শূন্য পড়ে আছে বান্দরবান শহরের স্বং স্বং রেস্টুরেন্টটি। তবুও প্রতিদিন ক্রেতার আশায় বসে থাকেন থুইমেচিং মারমা 	- সমকাল

করোনায় এমন শূন্য পড়ে আছে বান্দরবান শহরের স্বং স্বং রেস্টুরেন্টটি। তবুও প্রতিদিন ক্রেতার আশায় বসে থাকেন থুইমেচিং মারমা - সমকাল

চন্দনা তঞ্চঙ্গ্যা ও অঞ্জনা তঞ্চঙ্গ্যা দুই বোন। বড় বোন চন্দনা ছোটবেলা থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাই অঞ্জনারই বেশি দায়িত্ব পালন করতে হয়। একসময় তাদের মাথার ওপর ছিল ছাদ। বাবার মৃত্যুর পর সেই ছাদও হারিয়ে ফেলেছেন। মাকে হারিয়েছেন বাবার মৃত্যুর তিন বছর আগে। ভরসার স্থল হারানোর পর চোখে-মুখে অন্ধকার নেমে আসে তাদের। কীভাবে বেঁচে থাকবেন ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না। এরপর স্বজনদের কাছ থেকে কয়েক হাজার টাকা ধারকর্জ করে ছোট্ট একটি খাবারের দোকান খোলেন। সকালে কলাপাতা দিয়ে মোড়ানো বিভিন্ন ধরনের নাশতা আর দুপুরে ভাত বিক্রি করেন। এতে যে আয় হতো তা দিয়ে তাদের সংসার বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু করোনাকালে তাদের এই সুখের সংসারে নেমে এসেছে অন্ধকার। যে সামান্য ক'টা টাকা আয় হতো, সেই আয়ের পথও একেবারে বন্ধ হয়ে যায় কভিড-১৯ মহামারি আসার পর থেকে।
টানা লকডাউনের কারণে গত পাঁচ মাস দোকান বন্ধ ছিল। এখন দোকান খুলেছেন, কিন্তু বেচাকেনা নেই বললেই চলে। করোনাকালীন ক্ষতি কীভাবে পূরণ করবেন ভেবে তারা দিশেহারা। করোনাভাইরাসের ছোবলে বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে, তার ছোবল থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষজনও বাদ যায়নি। চন্দনা ও অঞ্জনার মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীতে হাজারো নারী আজ তাদের উপার্জন হারিয়েছেন। পুরুষের তুলনায় এই গোষ্ঠীর নারীরা বেশি পরিশ্রমী। এখন অসহায় নারীরা বনে-জঙ্গলে মশা ও জোঁকের কামড় খেয়ে বাঁশকুড়ূল, লতাপাতাসহ তাদের দৈনন্দিন খাদ্য সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে আসে। এতে তাদের অনেকেরই দৈনিক আয় হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। ওই সামান্য কটা টাকা দিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
চন্দনা ও অঞ্জনার মতো জেলা শহরে আরও কয়েকটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। তাদের মধ্যে রি স্বং স্বং রেস্টুরেন্ট, শৈ ক্যাফে, শৈ শৈ ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, নিউ বোমাং থং, জুম্ম রেস্টুরেন্টসহ ১০টি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। যাদের বেশির ভাগ দেখভালের দায়িত্বে নারীরা। এদের অনেকে রেস্টুরেন্টের আয় বৃদ্ধির জন্য ব্যাংক ও স্থানীয় এনজিওর কাছ থেকে লোন নিয়েছেন। লোন নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে করোনাভাইরাসের মহামারি তাদের সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। এখন লকডাউন খুলেছে, কিন্তু রেস্টুরেন্টে কাস্টমার নেই, তাই বিক্রিও নেই। বিক্রি না থাকায় কীভাবে ব্যাংক ও এনজিও লোন পরিশোধ করবেন, কীভাবে রেস্টুরেন্টের ভাড়া পরিশোধ করবেন ভেবে কূল পাচ্ছেন না।
বান্দরবান শহরের বালাঘাটা এলাকার শামুক রেস্টুরেন্টের মালিক চন্দনা তঞ্চঙ্গ্যা ও অঞ্জনা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, রেস্টুুরেন্টটির আয় বাড়ানোর জন্য একটি স্থানীয় এনজিও থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিই। প্রতিদিন চার-পাঁচ হাজার টাকা বিক্রি হতো। ঋণ নেওয়ার দুই মাস পর শুরু হয় মহামারি। দোকান বন্ধ হয়ে যায়। এখন প্রতিদিন গড়ে বিক্রি হয় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। এদিকে, খেয়ে না খেয়ে প্রতি সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।
উদ্যোগী ও সংগ্রামী নারী রি স্বং স্বং রেস্টুরেন্ট ও জুস বারের মালিক থুইমেচিং মারমা বলেন, মহামারি আসার আগে প্রতিদিন গড়ে ২০-২২ হাজার টাকা বিক্রি হতো। পর্যটক থেকে শুরু করে বিভিন্ন অফিসের স্টাফরা তার রেস্টুরেন্টের কাস্টমার। তখন দোকানে স্টাফ ছিল ১০ জন। জুলাই মাসের শেষ দিকে নতুন করে খোলার পর থেকে লোকজন আসছে না বললেই চলে। পাওনাদাররা টাকার জন্য রেস্টুরেন্টে-বাড়িতে হানা দিচ্ছে। মানসম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শৈ শৈ ক্যাফের স্বত্বাধিকারী মেচিংসাং মারমা বলেন, ট্যুরিস্টরা তো বটেই, সপ্তাহে দুই হাটবাজারের লোকজন ছিল দোকানের কাস্টমার। এখন শূন্য রেস্টুরেন্ট পাহারা দিচ্ছি।
সমতলের চেয়ে পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য আরও বেশি সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে দিনে এনে দিনে খাওয়াদের অবস্থা আরও করুণ। বাচ্চারা না খেতে পেয়ে কান্নাকাটি করছে। বন-জঙ্গল থেকে সবজি সংগ্রহ করে বাজারে এসে দেখছেন ক্রেতা নেই। তেমনি একজন সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের উজি হেডম্যানপাড়ার উমাপ্রু মারমা। তিনি করোনার আগে লাকড়ি বিক্রি করতেন এবং দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন করোনার কারণে দিনমজুরি বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার করতে পারছেন না। কীভাবে তিন সন্তান নিয়ে সংসার চলবে- এই ভেবে রাতে ঘুমাতে পারেন না।
মানবাধিকার ও নারী নেত্রী ডনাই প্রু নেলী বলেন, 'নারীরা সব সময় অবহেলিত ছিল। সমতলের চেয়ে পাহাড়ের নারীরা আজও বৈষম্যের শিকার বেশি। অথচ এই নারীরাই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করে। দূরের বন-জঙ্গল থেকে সবজি সংগ্রহ করে বিক্রি করতে আসে তারা। সেই টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য চাল কিনে রান্না করে পুরুষকে খাওয়ায়। এই নারীদের হয়ে কথা বলার মানুষ নেই।'
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, 'সামগ্রিকভাবে আদিবাসী নারীরা আগে থেকেই শোষিত, বঞ্চিত। আদিবাসী নারীরা গরিব থেকে আরও গরিব হয়েছে। বিউটি পার্লারে কাজ করা ৮০ শতাংশ নারী চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। তারা চাকরি হারানোর ফলে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।' তিনি আরও বলেন, 'সাভারের ইপিজেডে আমার ধারণা, ২০ হাজার আদিবাসী নারী কাজ করতেন। চট্টগ্রামে ইপিজেডে সেই সংখ্যা ৫০ হাজার হবে। এখন তারা অনেকে কাজে ফিরেছেন। তবে গ্রামে থেকে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারও বেশি নারী। যার কারণে আদিবাসী নারীরা একটা অনিশ্চিত অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।'