১০০ কোটি টাকার সড়কটির এ কী হাল!

২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লাগে দেড় ঘণ্টা

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের হালিশহর আনন্দিপুর গেট থেকে সাগরিকা মোড় পর্যন্ত সড়কে বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে বন্দর থেকে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য নিয়ে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান সড়কটিতে চলাচল করছে 	- মো. রাশেদ

চট্টগ্রামের হালিশহর আনন্দিপুর গেট থেকে সাগরিকা মোড় পর্যন্ত সড়কে বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে বন্দর থেকে আমদানি ও রপ্তানি পণ্য নিয়ে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান সড়কটিতে চলাচল করছে - মো. রাশেদ

১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার হওয়া এক সড়কে নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে নগরীর ৬০ লাখ বাসিন্দাকে। চট্টগ্রামবাসীর দুঃখ হয়ে থাকা এই সড়কটির নাম 'পোর্ট কানেকটিং রোড'। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক লাগোয়া এই সড়কটির অবস্থান নগরীর প্রবেশমুখেই। এটি ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০ হাজার পণ্যবাহী গাড়ি যায় সারাদেশে। এটি দিয়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলায়ও প্রতিদিন যাতায়াত করে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির সংস্কারকাজ ঝুলে আছে চার বছর ধরে। গত বছরের জুনে ঠিকাদার এটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখন আবার সময় চাচ্ছেন ছয় মাস! ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়কটির দুই কিলোমিটারে এখনও আছে অন্তত দুই শতাধিক গর্ত। এসব গর্তে গাড়ি পড়ে দূর্ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিনই। ২০ মিনিটের এই পথ পাড়ি দিতেও সময় লাগছে প্রায় দেড় ঘণ্টা।
চসিকের নবনিযুক্ত প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই পরিদর্শন করেন গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি। ঠিকাদারকে সতর্ক করেন তিনি প্রথম দিনেই। পাঁচ দিনের মধ্যে সড়কটির এক পাশ যান চলাচলের উপযোগী করে দিতে ঠিকাদারকে তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশও দেন তিনি। পরিদর্শনের সময় চসিক প্রশাসক নিজেই এই সড়ক দিয়ে গাড়ি চালানোকে 'নরক যন্ত্রণা' বলে অভিহিত করেন। খোরশেদ আলম সুজন বলেন, 'পোর্ট কানেকটিং' সড়কটি নগরের অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে এটি সংস্কার করতে লাগছে বছরের পর বছর। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রতিদিন এই নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে কয়েক লাখ মানুষকে। ঠিকাদার কোনোভাবেই এটির দায় এড়াতে পারবে না।' পাঁচ দিনের মধ্যে সড়কের এক পাশে থাকা সব গর্ত ভরাট করে আপাতত যান চলাচলের ব্যবস্থা করতে ঠিকাদারকে তাৎক্ষণিক নির্দেশও দেন তিনি। এ সময় ঠিকাদার মঞ্জুর আলম চৌধুরী বলেন, 'আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মাত্রাতিরিক্ত যান চলাচলের কারণে এটির সংস্কার কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। এই কাজটি বিদেশি সংস্থা জাইকার করার কথা থাকলেও তারা করেনি। চসিক ২৭ মাস আগে এটির সংস্কারকাজ শুরু করে। প্রায় ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়কের বড় একটি অংশের কাজ শেষ হলেও এখন সমস্যা বেশি নয়াবাজার থেকে অলংকার পর্যন্ত দুই কিলোমিটারে।'
এই সড়কের সংস্কারকাজ নিয়ে ঠিকাদারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন সদ্য সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও। দায়িত্ব ছাড়ার আগের মাসে একাধিকবার এই সড়ক পরিদর্শন করে ঠিকাদারকে আলটিমেটাম দেন তিনিও। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে এই সড়ক সংস্কারের কাজে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'এটি অত্যন্ত ব্যস্ত সড়ক, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু বন্দরের ১০ হাজারের বেশি গাড়ি প্রতিদিন চলাচল করে এই সড়কে। করোনার জন্যও ব্যাহত হয়েছে কাজ। তার পরও আমি বলব, কাজ দ্রুত শেষ করার সুযোগ আছে। ইচ্ছা করে কেউ যদি দায়িত্বে গাফিলতি করে, তবে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।' কিন্তু সদ্য সাবেক মেয়রের এই হুঙ্কারেও আসেনি কোনো সুফল। এখনও নগরবাসীর নিত্যদিনের দূর্ভোগ পোর্ট কানেকটিং রোড।
সরেজমিন দেখা যায়, নয়াবাজারের তাসপিয়া কমিউনিটি সেন্টার থেকে অলংকার মোড়ের আগ পর্যন্ত ভয়াবহ অবস্থা পুরো সড়কে। দু'পাশেই শত শত গর্ত হা হয়ে আছে। মাতৃভূমি কমিউনিটি সেন্টারের সামনে গর্ত এত বড় হয়েছে যে, বৃষ্টির পানিতে এটিকে পুকুর মনে হয়। গ্রিন ভিউ আবাসিক এলাকার সামনে ৫০০ গজের মধ্যে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি ছোট-বড় গর্ত হয়েছে। রড-সিমেন্টের দোকান জাহাঙ্গীর ব্রাদার্সের সামনে থাকা গর্তে প্রতিনিয়ত দূর্ঘটনায় পড়ছে সিএনজি, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান। গ্রিন ভিউ থেকে আরও ২০০ গজ উত্তরে গেলে মডার্ন কার্গো কারখানা। পাশে আছে অ্যারো জিনস নামের একটি একটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানও। অথচ এখানকার সামনে রাস্তার এতটা দূরবস্থা যে, মানুষের হাঁটারও ব্যবস্থা নেই। এক পাশে হাঁটু সমান পানি আরেক পাশে কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সাগরিকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স ম্যানেজার গাজী মাহবুব হাসান। এই সড়ক দিয়েই প্রতিদিন অফিসে যেতে হয় তাকে। তিনি বলেন, '২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। অনেক সময় ১০ কিলোমিটার ঘুরে দক্ষিণ কাট্টলি কিংবা পাহাড়তলী দিয়ে অফিসে আসা-যাওয়া করি। রাস্তার অবস্থা দেখে মনে হয় না এই শহরে কোনো নগরপিতা আছেন।'
সিটি গভর্ন্যান্স প্রজেক্টের আওতায় জাপানি সাহায্য সংস্থা জাইকার অর্থায়নে পোর্ট কানেকটিং সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণে কাজ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। ২০১৭ সালে ২০ নভেম্বর এই কাজের উদ্বোধন হয়। প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করে নিমতলা থেকে অলংকার পর্যন্ত ৫ দশমিক ৭ কিলোমিটার এই সড়কটির সংস্কারকাজ করা হচ্ছে। ছয় লেনবিশিষ্ট এই সড়কটির প্রস্থ ১২০ ফুট। দু'পাশে প্রশস্ত আরসিসি ড্রেন ও ফুটপাত। মাঝে রাখা হচ্ছে চওড়া মিডিয়ান ও এলইডি আলোকায়নের ব্যবস্থা। বড়পোল থেকে তাসপিয়ার আগ পর্যন্ত এক পাশে কার্পেটিং করা হয়েছে। তাসপিয়া থেকে অলংকার পর্যন্ত উভয় পাশই খানাখন্দে ভরা। ২০১৯ সালের জুনে এই রাস্তার সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন ২০২০ সালের ডিসেম্বরের আগে কাজ শেষ হবে না বলে ধারণা করছেন খোদ ঠিকাদারই।