কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন জমে উঠতে শুরু করেছে। চলছে নানা মেরূকরণ। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে একাট্টা থাকলেও বিএনপি থেকে বহিস্কৃত দুই প্রার্থী রয়েছেন বেকায়দায়। তাঁদের এড়িয়ে চলছেন দলটির নেতাকর্মীরা। সাংগঠনিক শাস্তির ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ নির্বাচনী কার্যক্রমে নেই। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে দু'বারের কুসিক মেয়র ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু এবং নিজাম উদ্দিন কায়সারকে। আসন্ন নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীদের পাশে টানতে না পারলে নির্বাচনী প্রচার ও ফলাফলে এর যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। কুমিল্লা মহানগর বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী নিশ্চিত হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের পথ এখন অনেকটাই পরিস্কার। নানা জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাসুদ পারভেজ খান ইমরান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় আওয়ামী লীগ শিবিরে স্বস্তি বিরাজ করছে।

অন্যদিকে, বিএনপি এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। দলের এই সিদ্ধান্ত অমান্য করে পদধারী দুই নেতা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এরই মধ্যে বিএনপির দুই নেতার মেয়র পদে নির্বাচন নিয়ে সরগরম কুমিল্লার রাজনীতি। কে কার ভোট কাটবেন, তা নিয়ে নানা হিসাব কষতে শুরু করেছেন সংশ্নিষ্টরা।

জানা যায়, জেলার রাজনীতিতে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাক্কুর বিরোধী হিসেবে পরিচিত বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক এবং দলের কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক হাজি আমিন উর রশিদ ইয়াছিন। তাঁর শ্যালক ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার এবারই প্রথম নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। সাক্কু ঠেকাও স্লোগান তুলে তিনি এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। কুমিল্লায় শক্তিশালী বিএনপির অবস্থানের মধ্যে এই দু'জনেরই আলাদা বলয় ও অনুসারী রয়েছে। এবার বিএনপির ভোট দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে সাক্কু ও নিজামকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

গত দুটি নির্বাচনে সাক্কু ছাড়া বিএনপির কোনো প্রার্থী ছিলেন না। যে কারণে তিনি একচেটিয়া বিএনপির সব ভোট পেয়েছেন। তবে কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে সাক্কুর আগের সেই অবস্থান অনেকটা দুর্বল বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচন করায় ১৯ মে দল থেকে তাঁকে এবং অপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিজামকে আজীবন বহিস্কার করা হয়। ২১ মে সাক্কু-নিজামের ভোটের প্রচারে অংশ না নিতে দলের নেতাকর্মীদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। বহিস্কৃত ওই দুই নেতার সঙ্গে কোনো ধরনের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না হতে বলা হয়েছে। এতে বিপদ ও আতঙ্কে রয়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
তাঁরা জানান, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারাই এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, নির্বাচনী কাজে সম্পৃক্ত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে। এ অবস্থায় তাঁদের কারও পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না। এরই মধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছেন দলের হাইকমান্ড।

যদিও দলের একটি অংশ দাবি করছে, কুমিল্লা বিএনপিতে হাজি আমিন উর রশিদ ইয়াছিন অংশের নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় অংশ। দলের পদধারী নেতারা নির্বাচনে সরাসরি অংশ না নিলেও তাঁদের কর্মী-সমর্থকরা মাঠে নামবেন। এতে নিজাম উদ্দিন কায়সার সুবিধা পাবেন। ভিন্ন দিকে সাক্কুর পক্ষেও একটি অংশের কর্মী-সমর্থকরা নামতে পারেন।

তবে আনোয়ার হোসেন নামে একজন মহানগর ছাত্রনেতা সমকালকে বলেন, দলের পক্ষ থেকে যেসব বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে, তাতে দলের কর্মীদের মাঠে নামানো যাবে না। এবার ১০৫টি কেন্দ্রে ভোট হবে। প্রার্থীদের পক্ষ থেকে প্রতিটি কেন্দ্রে কমিটি করা হয়। এখন বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা যদি কেন্দ্র কমিটির দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তাঁদের বিপদে পড়ার আশঙ্কা আছে।

কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ বলেন, কর্মীরা একটি ভালো পদের জন্য কাজ করেন। এবারের নির্বাচনে তৃণমূল কর্মীদের কারও পক্ষে সরাসরি মাঠে কাজ করা সম্ভব হবে না। করলে নিজেরাই বিপদে পড়বেন।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতা সরওয়ার জাহান ভূঁইয়া দোলন বলেন, পদ-পদবিধারী কোনো নেতার মাঠে নামার প্রশ্নই ওঠে না। তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যেন নির্বাচনী মাঠে না নামেন। যারা প্রকৃত বিএনপির লোক, তাঁদের কেউই এই সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না।

মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ২০১২ সালের নির্বাচনে দল থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচন করেছেন। তখন তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই তাঁকে বিজয়ী করেছেন। এ পর্যন্ত যত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন প্রতিটি নির্বাচেন তৃণমূল কর্মীরাই তাঁর বিজয়ে মূল ভূমিকায় ছিলেন। তাই অতীতের মতোই এবারও তাঁরা তাঁর পক্ষে মাঠে থাকবেন। জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী।

নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীরাই তাঁর ভরসা। আশা করছি, তাঁরা নিরাশ করবেন না। তাঁরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবং তাঁর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হয়রানি না করা হলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন তিনি।