কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) তৃতীয়বারের নির্বাচনে জনমনে প্রশ্ন তৈরির সুযোগ করে দিয়েছেন খোদ রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. শাহেদুন্নবী চৌধুরী। কেনই বা ফল ঘোষণার শেষ মুহূর্তে মাত্র চারটি কেন্দ্রের ফল ঘণ্টাখানেকের জন্য স্থগিত রাখা হলো। আর ওই সময়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ফোন এলো তাঁর মোবাইলে। তার পরই বা কেন মেয়র বাদে কেবল কাউন্সিলরদের ফল ঘোষণা শুরু হলো। এসব বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা সন্দেহ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তবে দিনভর সুষ্ঠু নির্বাচনের পর যে ফলাফল ঘোষিত হয়েছে, তার সারসংক্ষেপ এই দাঁড়ায়- ঘড়ি-ঘোড়ায় কাটাকাটির কারণেই জয় পেয়েছে নৌকা। এ দুই প্রতীকে নির্বাচন করা দু'জনই বিএনপির সাবেক নেতা। দু'জনই দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। ঘড়ি প্রতীকে নির্বাচন করেন দু'বারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু। ঘোড়া মার্কায় নির্বাচন করেছেন নিজাম উদ্দিন কায়সার। এই দু'জনেরই ভোটব্যাংক মূলত একই। তার পরও আওয়ামী লীগ প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত ৩৪৩ ভোটের যে জয় পেয়েছেন, তাতে এটাকে আওয়ামী লীগের বিজয় বলা যায় না।

বুধবার সকাল থেকে দিনভর সুন্দরভাবে ভোট গ্রহণ শেষে চলছিল ফল ঘোষণা। জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে খোলা কন্ট্রোল রুম থেকে একের পর এক কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহেদুন্নবী চৌধুরী। একেক কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পরপরই দেখা যাচ্ছিল কখনও সাক্কু বা আবার রিফাত সামান্য ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে থাকছেন। ১০৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০১টি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা শেষে রিফাতের চেয়ে ৮৩৫ ভোটে এগিয়ে ছিলেন সাক্কু। ঠিক সেই মুহূর্তেই শাহেদুন্নবীর মোবাইলে একটি ফোন আসে। কথা শেষ করেই তিনি মেয়র পদে ভোটের ফল ঘোষণা বন্ধ রেখে কেবল কাউন্সিলর প্রার্থীদের ফল ঘোষণা শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় হুলস্থুল। পরে সেখানে উভয় প্রার্থীর সমর্থকরা সমবেত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। রিফাত ও সাক্কু পক্ষের কর্মীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনাও তৈরি হয়। পুলিশের লাঠিচার্জে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। ঘণ্টাখানেক পর শাহেদুন্নবী একসঙ্গে বাকি চারটি কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতকে ৩৪৩ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হন মনিরুল হক সাক্কু। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে- ফোন আসার পরপরই কেন ফল ঘোষণা বন্ধ রাখলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। রহস্যময় ফোনটি ছিল কার?

অবশ্য এসব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহেদুন্নবী। তিনি বলেছেন, সিইসি, ডিসি ও এসপিরা ফোন দিয়েছিলেন পরিস্থিতি জানার জন্য। আর দু'পক্ষের গোলযোগের কারণে ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হয়েছে। কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফল আসতেও একটু দেরি হয়েছিল। ভোটে কোনো কারচুপির ঘটনা ঘটেনি। আর কারও মনে সন্দেহ থাকলে তিনি জানাতে পারতেন। এখন চাইলে তিনি আইনেরও আশ্রয় নিতে পারেন।

এসব বিষয়ে মনিরুল হক সাক্কু সমকালকে বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা ১০১ কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পর ফল ঘোষণা বন্ধ করে দেন। তখন আমি এগিয়ে ছিলাম। রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে অবশিষ্ট চার কেন্দ্রের ফলাফল ছিল। এ সময় কারও ফোন কল পেয়েই রিটার্নিং অফিসার ফলাফল বন্ধ রেখে পরে ফল পাল্টে দেন। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারি।

কায়সার যে ভোট পেয়েছেন তার সবই বিএনপির ভোট। কায়সার প্রার্থী না হলে এই ভোটের একটি বড় অংশই সাক্কুর পক্ষে যেত বলে দলীয় নেতাকর্মীদের অভিমত। আরেকটি ছোট অংশ যেতে পারত নৌকার পক্ষে। স্থানীয় রাজনৈতিক সচেতন মহলের অভিমত, ভোটের হিসাবে কায়সারই জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছেন। রিফাতের জয়ে ব্যক্তি রিফাত ও আওয়ামী লীগ বা নৌকার কোনো বিশেষ ভূমিকা ছিল না। ভোটের হিসাবেই দেখা যায়, ওই তিন প্রার্থী ছাড়াও অন্য দু'জন প্রার্থীর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম (হাতপাখা) পেয়েছেন ৩ হাজার ৪০ ভোট। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল হাসান বাবুল পেয়েছেন ২ হাজার ৩২৯ ভোট। বলা হয়, দেশে নৌকার ভোট ৩৭ শতাংশ। কুসিক নির্বাচনে এবার ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪৫। এই ফলাফলেও অবস্থার যে পরিবর্তন হয়নি, তাই ফুটে উঠেছে।

কাজেই স্থানীয়রা মনে করছেন, রিফাত জিতলেও এটাকে কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ বা নৌকার জয় হিসেবে মূল্যায়নের সুযোগ নেই। বরং এমপি আ. ক. ম. বাহাউদ্দিন বাহারের প্রভাবের কারণেই রিফাত জয় পেয়েছেন- এমন আলোচনাও এখন কুসিকের সর্বত্র। ফলাফল প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের কুমিল্লা জেলার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, বিএনপির ভোট দুই ভাগ হয়ে যাওয়ায় মূলত মনিরুলের পরাজয় হয়েছে। তিনি যে ভোট পেয়েছেন, তার অধিকাংশ সাধারণ ভোটারের। অন্যদিকে কায়সারের পক্ষে গেছে বিএনপির আরেকাংশের ভোট।