সিনেমার কথা

বাংলা চলচ্চিত্রের উত্থানপর্বে লোককাহিনি

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০১৭     আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০১৭      

মিছিল খন্দকার

পাকিস্তান আমলে পূর্বপাকিস্তান তথা বাংলাদেশে উর্দু সিনেমার রমরমা বাজার ছিল। সে সময় জাতীয় চেতনার উন্মেষ ও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে বাঙালি পরিচালকরা বাংলা ভাষায় সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসেন। বাজারি উর্দু সিনেমার চটকদার ও খোলামেলা নাচ-গানের কারণে এসব বাংলা সিনেমার বেশির ভাগই ব্যবসা করতে পারেনি।

১৯৫৬ সালে আব্দুল জাব্বার নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র 'মুখ ও মুখোশ' মুক্তির পর থেকে তার পথ অনুসরণ করেন অনেক নির্মাতা। একে একে নির্মিত হতে থাকে পরিচ্ছন্ন ও সমাজ সচেতনতামূলক বাংলা সিনেমা 'এদেশ তোমার আমার', 'ধারাপাত', 'যে নদী মরু পথে', 'রাজধানীর বুকে', 'হারানো দিন', 'কাঁচের দেয়াল', 'সুতরাং', 'নদী ও নারী'। এসব সিনেমা প্রশংসিত হলেও বাণিজ্যিকভাবে লাভের মুখ দেখতে পারেনি।

এর ফলে অধিক মুনাফা ও দুই পাকিস্তানের বাজার ধরার আশায় ঢাকায় বসেই নাচে-গানসমৃদ্ধ উর্দু সিনেমা বানানোর উদ্যোগ নেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা। এ সময় উর্দু ভাষায় সিনেমা নির্মাণ করেন ঢাকার নির্মাতা এহতেশাম, মুস্তাফিজ, ফজলে দোসানী, আনিস দোসানী প্রমুখ। ঢাকায় নির্মিত হয় উর্দু সিনেমা– চান্দা, তালাশ, মালা, সংগম, তানহা, বাহানা, চকোরী ইত্যাদি। উর্দু সিনেমার প্রতাপে বাংলা সিনেমা চরম সংকটে পড়ে যায়। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে ঢাকায় ১৪টি বাংলা সিনেমা নির্মিত হয়। এর বিপরীতে উর্দু সিনেমা হয়েছিল ১৮টি।

বাংলা চলচ্চিত্রের এমন দুঃসময়ে পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে এগিয়ে আসেন সালাহউদ্দিন। বাঙালি পরিচালক হিসেবে তিনি নজর দেন শেকড়ের দিকে। এমন ছবি নির্মাণে আগ্রহী হন যেটি বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে। এরপর ১৯৬৫ সালে তিনি নির্মাণ করেন দেশের প্রথম লোককাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র 'রূপবান'। এটির নির্মাতা সালাহউদ্দিন হলেও সিনেমাটি নির্মাণে পর্দার অন্তরালে ভূমিকা রেখেছিলেন সিনেমা সংশ্লিষ্ট দুই ভাই সফদর আলী ভুঁইয়া ও সিরাজুল ইসলাম ভুঁইয়া। তাদের দীর্ঘদিনের উৎসাহে এ সিনেমা নির্মাণে নেমেছিলেন সালাহউদ্দিন।

 ১৯৬৫ সালের ৫ নভেম্বর মুক্তি পায় 'রূপবান'। সাদাকালো যুগের এ সিনেমা পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং প্রযোজনাও করেছিলেন সালাউদ্দিন। ছবিটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল দেড় লাখ টাকা। ঢাকা, সিলেট, গাজীপুর ও মধুপুরে এর শ্যুটিং হয়েছিল।

ছবিটি যাত্রাপালার ঢংয়ে নির্মিত হওয়ায় এতে লোকজ কাহিনির সরলতা ও সৌন্দর্যের বিশ্বস্ত চিত্রায়ন সম্ভব হয়েছিল। গ্রামীণ জনগণ তাদের চিরচেনা কাহিনির এমন পর্দায় আবির্ভাব দেখতে পেয়ে তা দারুণভাবে লুফে নিয়েছিল। আবহমান কালের বাঙালির চিরপরিচিত রূপকথা পর্দায় দেখার জন্য সে সময় হলগুলোতে ভিড় করেছিল মানুষ।

সিনেমাটিতে রূপবান চরিত্রে সুজাতা, রহিম বাদশাহ চরিত্রে মনসুর এবং রাজকন্যা তাজেলের ভূমিকায় চন্দনা অভিনয় করেছিলেন। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন মনসুর, সিরাজুল ইসলাম, ইনাম আহমেদ, আনোয়ার হোসেন ও সুভাষ দত্ত।

ছবিটির সংগীত পরিচালক ছিলেন কিংবদন্তী সত্য সাহা। তিনি 'রূপবান' যাত্রা পালা থেকে লোকজ আবহ অক্ষুণ্ণ রেখে প্রচলিত গানগুলো ব্যবহার করেছিলেন, যা তখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। গীতিকার ছিলেন মাসুদ করিম। চিত্রগ্রাহক আব্দুস সামাদ ও সম্পাদনায় ছিলেন বশীর হোসেন। এ সিনেমার গানগুলোতে কন্ঠ দিয়েছিলেন নীনা হামিদ, আব্দুল আলীম, ইসমত আরা, কুসুম হক ও নজমুল হোসেন।

'রূপবান'-এর এমন জনপ্রিয়তা আরও অনেক পরিচালককে লোককাহিনি নিয়ে সিনেমা নির্মাণে উৎসাহী করে তোলে। ফলে ১৯৬৬ সালের মার্চে সফদার আলী ভূঁইয়ার পরিচালনায় মুক্তি পায় 'রহিম বাদশাহ ও রূপবান'। এটিও  দারুণ ব্যবসা সফল হয়। এরপর ওই বছর একে একে মুক্তি পায় ইবনে মিজানের পরিচালনায় 'আবার বনবাসে রূপবান', সৈয়দ আউয়ালের পরিচালনায় 'গুনাই বিবি', বজলুর রহমান পরিচালিত 'গুনাই', আলি মনসুর পরিচারিত 'মহুয়া', জহির রায়হান পরিচালিত 'বেহুলা' এবং ইবনে মিজান পরিচালিত 'জরিনা সুন্দরী'।

এর মধ্যে জহির রায়হানের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় 'বেহুলা' ছবিতে আত্মপ্রকাশ করেন নতুন জুটি সুচন্দা-রাজ্জাক। এটি ছিল লোককাহিনিভিত্তিক এমন সিনেমা যার মধ্য দিয়ে বাঙালি নারীর চিরন্তন আবেগ ও আত্মত্যাগ প্রকাশিত হয়েছিল। পরিচালকের মুন্সীআনায় ছবিটি একই সঙ্গে হয়ে উঠেছিল আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির ধারক। 'বেহুলা' ছবিতে গ্রামবাংলার জীবনধারার অনেক ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ পর্দায় উঠে এসেছিল।

মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম প্রধান কাব্য 'মনসামঙ্গল'-এর বেহুলা-লখিন্দরের উপাখ্যান অবলম্বনে এ সিনেমার কাহিনি। এমন গল্প বাছাইয়ের পেছনে বাণিজ্যিক কারণ ছিল। কারণ জহির রায়হানের এর ঠিক আগের ছবি 'বাহানা' ব্যবসাসফল হয়নি। বহু খরচ করে উর্দুতে মুক্তি দিয়েও সেটি লাভের মুখ দেখেনি। তাই তিনি নিজস্ব ছাপ ও অভ্যস্ত সৃষ্টিশীলতা দিয়ে 'বেহুলা'কে পর্দায় তুলে আনেন।

ছবিটিতে রাজ্জাকের প্রথম দিককার অভিনয় ছাড়া প্রায় সবাই আশানুরূপ অভিনয় করেছিলেন। 'বেহুলা' ও 'মনসাদেবী' চরিত্রে ছিলেন সূচন্দা ও সুমিতা দেবী। 'বিশু' চরিত্রে আমজাদ হোসেন ছিলেন অনবদ্য। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন ফতেহ লোহানী, মোহাম্মদ জাকারিয়া, রানী সরকার, নাসিমা, রুবিনা, জয়শ্রী, আঞ্জুম, রঞ্জনা, সাকিলা, জাভেদ করিম ও হারুন (অতিথি শিল্পী)।

আলতাফ মাহমুদের সুরে ছবির গানগুলো ছিলে শ্রুতিমধুর। লোককাহিনী নির্ভর কথায় সংগীতের ব্যবহার ছিল চমৎকার। এটি প্রযোজনা করেছিলেন ইফতেখারুল আলম। সংলাপে আমজাদ হোসেন। কণ্ঠশিল্পী ছিলেন- শাহনাজ বেগম, নীনা খান, ঝর্না ব্যানার্জী, মৌসুমি কবির, কণা, লাভলী, নাজমুল হুদা, দিলীপ বিশ্বাস, আবদুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ ও মাহমুদুন্নবী।

 এরপর একে একে লোককাহিনিভিত্তিক সিনেমা ঢল নামে।  ১৯৬৭ সালে 'কাঞ্চনমালা' ও ১৯৬৮ সালে মুক্তি পায় 'সাত ভাই চম্পা'। ১৯৬৯ সাল থেকে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত মুক্তি পায় 'সুয়োরানী দুয়োরানী', 'কুচবরণ কন্যা', 'অরুণ বরুণ কিরণ মালা', 'রূপবানের রূপকথা', 'পারুলের সংসার', 'গাজী কালু চম্পাবতী', 'পাতালপুরীর রাজকন্যা', 'বেদের মেয়ে', 'মলুয়া', 'আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী'।

এসব সিনেমার মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও চেতনার জাগরণ ঘটেছিল, যা দর্শকদের ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করে। ফলে ৬০ দশকের চলচ্চিত্র ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান হয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও বাংলার মানুষকে সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছিল।

লিভার সিরোসিস কখন হয়

লিভার সিরোসিস কখন হয়

লিভার সিরোসিস একটি জটিল রোগ। সাধারণত লিভারের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের কারণে ...

বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে ভারত

বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে ভারত

ভারত আগামী ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিনিধিদল ...

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাবে দেশ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাবে দেশ

প্রতি বছরই আসে ১৬ ডিসেম্বর, আসে বিজয়ের দিন। আবারও 'বিজয় ...

সিলেট বিভাগের ১৯ আসনে জয়-পরাজয়ে যত ফ্যাক্টর

সিলেট বিভাগের ১৯ আসনে জয়-পরাজয়ে যত ফ্যাক্টর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯ আসন নিয়ে পুলিশের ...

টি২০-তেও দারুণ চমকের অপেক্ষা

টি২০-তেও দারুণ চমকের অপেক্ষা

দূরে মাইকে কোথাও বেজে চলেছে বিজয় দিবসে কচিকাঁচার কণ্ঠে আমার ...

সরব বাবলা, নীরব সালাহ উদ্দিন

সরব বাবলা, নীরব সালাহ উদ্দিন

ঢাকা-৪ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপকভাবে এগিয়ে আছেন মহাজোটভুক্ত জাতীয় পার্টির ...

২৭ লাখ নারী ভোটার নিয়ে বিশেষ কৌশল ৩২

২৭ লাখ নারী ভোটার নিয়ে বিশেষ কৌশল ৩২

চট্টগ্রামের বন্দর-পতেঙ্গা আসনে ৫ লাখ ৮ হাজার ভোটারের প্রায় অর্ধেকই ...

রক্তিম অলরেডসে রং চটা ম্যানইউ

রক্তিম অলরেডসে রং চটা ম্যানইউ

কোন দলের রং বেশি লাল। রেড ডেভিলস নাকি অল রেডসদের। ...