বহুব্রীহি সমস্যায় আক্রান্ত জনঘনত্বের এই নগরী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা-আকাঙ্ক্ষার অন্ত নেই। আসলে কেমন মেয়র চাই আমরা? মেয়রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তারা নগরবাসীর মৌলিক অধিকার, মৌলিক মানবিকতা, নিরাপত্তা, চলাচলের সক্ষমতা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। ইতোমধ্যে নগরীতে যারা মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের উদাহরণগুলোর মধ্যেই আমাদের প্রত্যাশার একটি ধারণা পাই। তাদের ধারণার কথা বলছি কারণ যারা নির্বাচিত হবেন তাদেরকে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে- এটা মেনে নিয়েই আমাদের প্রত্যাশা ঠিক করা উচিত।

স্থানীয় সরকার বা নগর সরকার ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে বর্তমান সিটি করপোরেশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী একজন মেয়রের চারটি মৌলিক গুণ, বৈশিষ্ট্য কিংবা যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, মেয়রের গুণ হলো, তিনি একনায়ক হবেন না। তাকে অঞ্চলভিত্তিক কাউন্সিলর, সমাজসেবী, রাজনৈতিক কর্মী তথা দল-মত নির্বিশেষে সবার মত-পথ গ্রহণ, অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের মতের বাইরে গেলেও যে কারও সঠিক মতকে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার মতো মানসিকতা থাকতে হবে। তিনি নিজে নিজে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে উদ্যোগী না হয়ে তার কাউন্সিলর পরিষদসহ নগরীর বিশিষ্টজন, বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও জনসাধারণের মতামত গ্রহণের চেষ্টা করবেন। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের জন্য অর্ধশতাধিক যে সেবা দেওয়ার কথা, সেগুলো নিশ্চিতের ক্ষেত্রে মেয়রকে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে হবে। জনদুর্ভোগ লাঘবে ও জনস্বার্থে কোনো কোনো পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের সামর্থ্য থাকতে হবে। সমন্বিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সব পক্ষের আস্থাভাজন হওয়া মেয়রের জন্য জরুরি হবে। মনে রাখতে হবে, ঢাকা দেশের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। এই শহরের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশন ছাড়াও রাজউক, ওয়াসা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করে। রাজউক যেসব পরিকল্পনা নিচ্ছে, সে পরিকল্পনা অনুযায়ী জনভোগান্তি কমছে কি-না, ভূমির ব্যবহার কেমন হচ্ছে, সে বিষয়ে মেয়রকে নজর রাখতে হবে। কোথাও কোনো অব্যবস্থাপনা দেখলে তিনি অবশ্যই রাজউকের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবেন। নগরীর অন্যতম সমস্যা জলজট। ওয়াসা এই সমস্যা নিরসনে কী করছে, তাদের পরিকল্পনামাফিক জনদুর্ভোগ না কমলে সংস্থাটির ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। যানজট নিরসন ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য মেট্রোপলিটন পুলিশ ও সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, মেয়র জনগণের সরাসরি ভোটে কয়েকজন সংসদ সদস্যের প্রাপ্ত ভোটের চেয়েও অধিক ভোটে নির্বাচিত হন। তাকে এই বিষয়টি অনুধাবন করে নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। সিটি করপোরেশন অধ্যাদেশের তৃতীয় অধ্যায় অনুযায়ী একজন মেয়র প্রতি দুই বছরের জন্য ১৪টি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে পারবেন। এই ১৪টি কমিটির মাধ্যমে মেয়রকে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে ও জনদুর্ভোগ কমাতে পারলে মেয়রদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায় এবং নেতৃত্ব প্রসারিত হয়। এমনটি হলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংস্থা মেয়রের প্রস্তাবনা, অনুরোধ ও নির্দেশনা মানতে ও বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে। চতুর্থত, মেয়রকে স্বপ্ন রচনা করতে হবে, স্বপ্নবাজ হতে হবে। জনসম্পৃক্ততা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। আমরা ঢাকায় এ রকম একজন মেয়রকে দেখেছি, যিনি তাঁর আড়াই বছরের স্বল্প সময়ে প্রমাণ করেছেন- সাহস থাকলে সীমাবদ্ধতা বা প্রতিবন্ধকতা কিছুই নয়। কারণ মেয়রের সঙ্গে থাকে বিপুল সংখ্যক জনগণের শক্তি। মনে রাখতে হবে- মানুষের প্রত্যাশা, চাহিদা ও দুর্ভোগের মুখে কোনো কিছুই বাধা হয়ে থাকতে পারে না।

সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারলে মেয়ররা আরও বেশি জনপ্রিয় ও আস্থাভাজন হয়ে উঠবেন। অনেক সময় আমরা মেয়রদের চেষ্টা করতে দেখি, কিন্তু আন্তরিকতা দেখি না। কিছু ক্ষেত্রে তার আন্তরিকতা থাকে কিন্তু সংশ্নিষ্টতা থাকে না। ফলে প্রকল্পের নাম হয় কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। অর্থ ব্যয় হয় কিন্তু জনদুর্ভোগ দূর হয় না। এসব উদাহরণ থেকে আমরা চারটি গুণের মানুষকে কাঙ্ক্ষিত মেয়র হিসেবে পেতে চাই। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন অযাচিত জটিলতা ও বিতর্ক তৈরির মধ্য দিয়ে জনআকাঙ্ক্ষাকে ধোঁয়াশা করার চেষ্টা করেছে। অযাচিতভাবে নির্বাচনের তারিখ, পদ্ধতি, আচরণবিধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক তৈরি করে জনআকাঙ্ক্ষা ও জনদুর্ভোগের আলোচনা করা থেকে জনগণকে বিরত রাখা হয়েছে। ফলে প্রার্থীরাও জনগণের আকাঙ্ক্ষাগুলো শুনে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারছেন না। তারপরও মনে করি, জনগণ যাচাই-বাছাই করে প্রার্থী নির্বাচন করবে। এতে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এ শহর কিছুটা গতি পাবে এবং আমরা একটি কাঙ্ক্ষিত জায়গায় যেতে পারব। যাতে সবচেয়ে দূষণ ও বসবাসের অযোগ্য শহরের তকমা আমাদের গায়ে লাগানোর আগে যে কোনো সংস্থাকে ১০ বার ভাবতে হয়।

মেয়রের ক্ষমতাকে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছায় অবশ্যই পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। কোনো যুক্তিতে নগরীর পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন-নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন কোনো মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হতে পারে না। বরং জনপ্রতিনিধিত্বশীল কর্তৃত্বে যদি এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতো, তাহলে তারা জনগণের কাছে জবাবদিহ্বি করতে বাধ্য হতো। এই সংস্থাগুলোর দুরাচার-দুর্বিনীত মনোভাব দূর করতে হলে সেগুলোর ওপর মেয়রের কর্তৃত্ব থাকা দরকার। তাহলে মেয়রও বলতে পারবেন না- সেখানে আমার ক্ষমতা নেই। বিদুৎ বিভাগ মেয়রের হাতে না থাকায় তিনি ফুটপাতের মাঝ থেকে বৈদ্যুতিক খুঁটি সরাতে পারেন না। মেয়রের হাতে পুলিশ না থাকায় তিনি গণমানুষের নিরাপত্তায় কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। অবশ্য মেয়র আনিসুল হক এসব বাধাকে বাধা মনে করেননি। এর পরও বলব, তাদের ক্ষমতায়ন অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন। তবে আনিসুল হক বলেছিলেন, 'যেখানেই সীমান্ত তোমার, সেখানেই বসন্ত আমার।' মেয়রদের অবশ্যই এ বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। আমার হাতে ক্ষমতা নেই বা সমন্বয়ের অভাব- এই বলে দায় এড়ানোর মানসিকতা পরিহার করতে হবে।