সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ হয়েছে ঢাকার দুই সিটি ভোটের প্রচারকাজ। টানা ২০ দিনের প্রচারে হাতেগোনা কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন কমিশন মনে করছে, ভোটের দিন পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকবে। আগামীকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণ করা হবে।

তবে নির্বাচন-সংশ্নিষ্টদের মতে, বড় কোনো সংঘর্ষ না ঘটলেও কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি আশানুরূপ নাও হতে পারে। এবারই প্রথম ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র পদে সরাসরি দলীয় প্রতীকে ভোটের লড়াই হচ্ছে। একই সঙ্গে সব কেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বহুল আলোচিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। ইসি দাবি করছে, ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, জাল ভোটসহ নির্বাচনের সব অনিয়ম দূর করা সম্ভব হবে। কিন্তু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির সন্দেহ, এই মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমেই জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। তাদের আরও অভিযোগ, ইসি ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোটের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলছে, নির্বাচনকে বিতর্কিত করে কমিশনকে হেয় করার চেষ্টা বিএনপি প্রথম দিন থেকেই শুরু করেছে। নির্বাচনে পরাজয় এবং ভোটের মাঠে নির্বাচন বর্জনে তাদের পুরোনো সংস্কৃতি চালু রাখতেই এসব অভিযোগ তুলছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও (সিপিবি) এ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও তারা এবার মেয়র পদে শুধু উত্তর সিটিতে প্রার্থী দিয়েছে।

এদিকে বিশ্নেষকদের মতে, এই নির্বাচনে কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে ইসির আরও কিছু করণীয় ছিল। সব দল অংশগ্রহণ করলেই জনগণ স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে যাবে- এ ধারণা ঠিক নয়। কারণ, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে অতীতে বেশির ভাগ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। তাই কমিশনের ওপর সাধারণ জনগণের আস্থা বাড়াতে ইসির সক্রিয় হওয়ার কোনো বিকল্প ছিল না। তা ছাড়া ইভিএম ব্যবহারের আগে যথেষ্ট প্রচার হয়নি। তাই এ মেশিন নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি কাটেনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ইভিএম নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কার জায়গা রয়েছে। ইসি নিজেই ভুগছে আস্থার সংকটে। তারপরে এই নতুন ব্যবস্থা ভোটারদের কাছে যথেষ্ট পরিচিতি পায়নি। বিএনপির মতো বড় একটি রাজনৈতিক দল ইভিএমের বিরোধিতা করছে। তা ছাড়া এই যন্ত্রে ভোটার ভ্যারিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি নেই। এর অর্থ হলো, ভোট দেওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে তার প্রিন্ট কপি বের হচ্ছে না। ভারতের তুলনায় ১১ গুণ বেশি দামে কেনা এই যন্ত্র। কিন্তু ভারতের ইভিএমে এ ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, ইভিএমে বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ফল আগে থেকে ঠিক করে রাখা সম্ভব। ভিভিপিএটি না থাকায় এ ধরনের সফটওয়্যার বসানো হলে তা প্রমাণের সুযোগ নেই।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেনও মনে করেন, এই ইভিএমের বড় দুর্বলতা ভিভিপিএটি না থাকা। পেপার টেইল না থাকার কারও মনে সন্দেহ জাগলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ নেই। এ কারণেই ইভিএম নিয়ে সন্দেহ ও বিতর্ক থামছে না।

ইসি-সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকার প্রায় সব কেন্দ্রে গতকাল ইভিএমের মক ভোটিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল ইসি। কিন্তু সেখানে যে পরিমাণ ভোটার অংশ নিয়েছেন, তাতে ইসির দুশ্চিন্তা বাড়ছে। কারণ তারা আশা করছেন, কমপক্ষে ৬০ ভাগ ভোটার উপস্থিত হবে কেন্দ্রে। কিন্তু ইভিএম নিয়ে নানা নেতিবাচক প্রচারের কারণে মানুষের মনে সন্দেহ দূর হচ্ছে না। মক ভোটিংয়েও তাই উপস্থিতি হাতেগোনা।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। গতকাল তিনি শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মক ভোটিং দেখে সাংবাদিকদের বলেন, এর আগে কখনও ইভিএমে ভোট দেননি। তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নতুন ভোটারের মতো কথা বলেছেন। একটা ইউনিটে তারা ১২টায় এসেছেন। তিন ঘণ্টায় মাত্র একজনকে তারা শেখাতে পেরেছেন; একজনের মাত্র ভোট নিয়েছেন। এর আগে তিনি এই ভোটকেন্দ্রের বিভিন্ন বুথ পরিদর্শন করেন। কর্মকর্তাদের কাছে ভোটদান পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চান। এ ছাড়া একই সময় এই প্রতিষ্ঠানের ৮৮৪ নম্বর কেন্দ্রে মক ভোট পড়েছে দুটি। অন্যদিকে, দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই কেন্দ্রের একটিতে মক ভোট পড়েছে চারটি, অপর একটিতে মাত্র একটি।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, বিগত সংসদ নির্বাচনে ছয়টি নির্বাচনী এলাকায় পুরোপুরি ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার হাতে ওভার রাইট করার ক্ষমতা ছিল ২৫ ভাগ ভোট। ওভার রাইটের অর্থ হলো ভোটারের আঙুলের ছাপ না মিললে নির্বাচন কর্মকর্তা তার নিজের ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যবহার করে ব্যালট ওপেন করতে পারবেন। তবে এবার এ সুযোগ থাকছে মাত্র ১ শতাংশ।

ইসি জানিয়েছে, এবার সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার জন্য এ ক্ষমতা ১ শতাংশের বেশি প্রয়োজন হলে রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে আরও ১ শতাংশ করা যাবে। এর বেশি প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশন থেকে অনুমতি আনতে হবে এবং কোন কোন ভোটারের ভোট এই প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে, তার তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

ইসি সূত্র জানায়, দুই সিটির নির্বাচনের জন্য ৩৫ হাজার ইভিএম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে সশস্ত্র বাহিনীর দু'জন করে সদস্য মোতায়েন থাকবে। কারিগরি ব্যবস্থাপনায় সশস্ত্র বাহিনীর পাঁচ হাজার ২৮০ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।

ইভিএম ভোট সম্পর্কে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাহীনতার বিষয়টি ইভিএমের ওপর ভর করেছে। যে কারণে মানুষের মনে সন্দেহ-অবিশ্বাস কাটছে না।

ইভিএম ব্যবহারের যৌক্তিকতার বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, আগের রাতে ভোট, জাল ভোট, এমনকি কেন্দ্র দখল- এসব অনিয়ম থেকে ইভিএম আমাদের রেহাই দেবে। নির্বাচনকে কলুষমুক্ত রাখা সম্ভব হবে। কারণ, এই ইভিএম ছিনতাই হলেও প্রিসাইডিং কর্মকর্তার আঙুলের ছাপ ছাড়া সেটা ওপেন করার সুযোগ থাকবে না। আবার একজনের ভোট আরেকজন যতই চাপাচাপি করুক, তাতে ভোট দেওয়ার সুযোগ হবে না।

দুই সিটির প্রার্থী সংখ্যা :ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে ৪৭০ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ৩৩৪ জন। বাকি ১৩৬ জনের অনেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন; আবার যাচাইয়ে অনেকের প্রার্থিতা হয়েছে। বর্তমানে মেয়র পদে ছয়জন, ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ডের বিপরীতে ২৫১ কাউন্সিলর ও ১৮টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৭৭ নারী কাউন্সিলর ভোটের মাঠে রয়েছেন।

অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন ৪১৬ জন। এ সিটিতে সাতজন মেয়র পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তারা সবাই চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। তবে কমেছে সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীর সংখ্যা। এ সিটিতে ৭৫টি ওয়ার্ডে ৪৬০ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও চূড়ান্ত লড়াইয়ে রয়েছেন ৩২৭ জন ও সংরক্ষিত ২৫টি ওয়ার্ডে ১০২ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও ভোটের মাঠে রয়েছেন ৮২ জন।

ভোটার সংখ্যা :ঢাকা দুই সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর থেকে জানা গেছে, দুই সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৮ লাখ ৪৩ হাজার আটজন ও নারী ভোটার ২৬ লাখ ২০ হাজার ৪৫৯ জন। সিটি করপোরেশনের হিসাবে ঢাকা উত্তর সিটিতে মোট ভোটার ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন; যার মধ্যে পুরুষ ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ ও নারী ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬ জন। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভোটার সংখ্যা ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন; যার মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১ ও নারী ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩ জন।

ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ :ইসি-সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকার দুই সিটিতে দুই হাজার ৪৬৮টি ভোটকেন্দ্র ও ১৪ হাজার ৪৪৫টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে এক হাজার ৩১৮টি ভোটকেন্দ্র ও সাত হাজার ৮৫৭টি ভোটকক্ষ এবং দক্ষিণ সিটিতে এক হাজার ১৫০টি ভোটকেন্দ্র ও ছয় হাজার ৫৮৮টি ভোটকক্ষ রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে ৬৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং দক্ষিণে ৬৪৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব কেন্দ্র অবস্থিত।

একক হিসাবে এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি ১১টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি আওতাধীন মিরপুরের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। একই সিটির তেজগাঁওয়ের সিভিল এভিয়েশন স্কুল অ্যান্ড কলেজে রয়েছে ১০টি ভোটকেন্দ্র। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কদমতলীর এ কে হাই স্কুল কেন্দ্রে সর্বোচ্চ আটটি ভোটকেন্দ্র রয়েছে।

ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা :ঢাকার দুই সিটিতে মোট ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা রয়েছেন ৪৫ হাজার ৮০৩ জন। এর মধ্যে দুই হাজার ৪৬৮ প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ১৪ হাজার ৪৩৪ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও ২৮ হাজার ৮৬৮ জন পোলিং কর্মকর্তা রয়েছেন। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে এক হাজার ৩১৮ জন প্রিসাইডিং ও সাত হাজার ৮৫৭ জন সহকারী প্রিসাইডিং ও ১৫ হাজার ৬৯২ জন পোলিং কর্মকর্তা ভোট গ্রহণ করবেন। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এক হাজার ১৫০ জন প্রিসাইডিং, ছয় হাজার ৫৮৮ জন সহকারী প্রিসাইডিং ও ১৩ হাজার ১৭৬ জন পোলিং কর্মকর্তা ভোট নেবেন।