ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন

প্রচার শুরুর আগেই বিতর্কে আচরণবিধি

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০৬ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ     

মসিউর রহমান খান

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রচার শুরুর আগেই আচরণবিধি নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ইসি কর্তারা বলছেন, আইন লঙ্ঘনকারী কেউই রেহাই পাবে না। এজন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি কমিশন সদস্যরাও পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। তফসিল ঘোষণার পরপরই দুই সিটিতে ৪৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে নামানো হয়েছে। তারাই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

অবশ্য ইসি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকলেও এ পর্যন্ত তাদের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে গতকাল রোববার পৃথক বৈঠক করা হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছেন তারা।

বিশ্নেষকরা মনে করেন, নিকট অতীতের বেশ কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে আগ্রহী নয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কারণ রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আইনের ফাঁকফোকরে নানা সুবিধা খুঁজবেন। এ ক্ষেত্রে কমিশন দৃঢ় না হলে ভোটারদের স্বতঃস্ম্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে না এবং নির্বাচনও অর্থবহ হবে না।

সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে উত্তর সিটির বিএনপির মেয়র প্রার্থী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এ ছাড়াও উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ঘরোয়া পরিচিতি সভার আয়োজন, নির্বাচনী ক্যাম্প তৈরি এবং ক্যাম্প উদ্বোধনে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। এ ছাড়াও ৩১ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে প্রধান দলগুলোর একাধিক মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এসব ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে একজন মেয়র প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যে কেউ বিধি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ওই সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি এ ধরনের কোনো নির্দেশনা পাননি। তিনি জানান, অভিযোগের  বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দুই কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইসির পদক্ষেপ দৃশ্যমান হতে হবে। অন্যথায় ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে না। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি না থাকলে এই নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণ বিধিমালা প্রতিপালন দেখভালে মাঠে নামছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এ দুই সিটি নির্বাচনে সব মিলিয়ে ১৭২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিতে জনপ্রশাসন সচিবকে চিঠি দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। চিঠিতে ৪৩ জন ম্যাজিস্ট্রেটকে ২৩ ডিসেম্বর থেকে ভোটের তিন দিন আগে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এবং বাকি ১২৯ জনকে ভোটগ্রহণের দু'দিন আগ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মাঠে রাখতে বলা হয়েছে।

নির্বাচনী আইন অনুযায়ী প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারবেন না প্রার্থীরা। গত শনিবার বিএনপির প্রার্থী তাবিথ আউয়াল রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ঢাকা উত্তরের গুলশান-১ এলাকার গুলশান পার্কে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে একটি নির্বাচনী মঞ্চ করেন। এ সময় মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে নিজের পক্ষে ভোট চান ও ভোটারদের কাছে যাওয়ার জন্য কর্মীদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন, যা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণ বিধিমালার লঙ্ঘন।

এদিকে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর রোডে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প উদ্বোধন, মোটরসাইকেল র‌্যালি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সাহারা খাতুনের ক্যাম্প উদ্বোধন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচনী আইনে সংসদ সদস্যদের সিটি নির্বাচনে প্রচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু নির্বাচনী ক্যাম্প উদ্বোধন নিয়ে দুই সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা দুই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। দক্ষিণের রিটার্নিং কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন মনে করেন, নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনের সুযোগ নেই। কারণ সেটা প্রচারের মধ্যে পড়বে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রচারে অংশ নিতে পারেন না। এখানে কিন্তু আইনের একটা ফাঁক আছে। প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন না, কিন্তু ক্যাম্প উদ্বোধন প্রচারের মধ্যে পড়বে কিনা, তা দেখতে হবে। কমিশন তাকে বিরত থাকার জন্য বলবে। যদি বিরত না থাকেন তাহলে শোকজ করা হবে। তবে ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়ে উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাসেম বলেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। তারা ক্যাম্প করছে, প্রচার করছে কিনা, তা তার জানা নেই।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজমুদার বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের জোরালো কোনো তৎপরতা এখনও দৃশ্যমান হয়নি। অবশ্য বড় ধরনের কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তিনি মনে করেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রচার শুরুর আগেই প্রার্থী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কমিশনের তরফে কড়া বার্তা না থাকলে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। শুরুতে ঘটনাগুলো ছোট থাকলেও পরে এ ধরনের ঘটনায় নির্বাচনী পরিবেশে বড় ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে বৈঠক: নির্বাচনে আচরণবিধি ইস্যুতে গতকাল রোববার উত্তর ও দক্ষিণ সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা পৃথক বৈঠক করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিয়ে। কোথাও যেন কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘন না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে ওই বৈঠকে।

দক্ষিণ সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভায় আচরণবিধি লঙ্ঘন প্রতিরোধে কঠোর হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।