ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন

মন্ত্রী-এমপির অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক চলছেই

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ভোটে মন্ত্রী-এমপিদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। মন্ত্রী-এমপিদের প্রচার ও নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই- আচরণবিধির এই ধারা নিয়ে আপত্তি তুলেছে আওয়ামী লীগ। তারা বলছে, এই ধারা স্ববিরোধী ও বৈষম্যমূলক। ফলে 'নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' থাকছে না। তবে বিএনপি বলছে, আওয়ামী লীগ আইনের ভুল ব্যাখ্যা করছে। অনেক আগে থেকেই এটা চলে আসছে। সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও মনে করে, মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারে নামার সুযোগ থাকা দরকার।

ঢাকার দুই সিটির তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আচরণবিধি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সামনে চলে আসে। নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই বলে আসছে, বিদ্যমান আচরণবিধি অনুযায়ী সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তির আওতায় মন্ত্রী এবং এমপিদের প্রচার ও নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। আচরণবিধিতে স্পষ্টতই বলা আছে- 'সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (মন্ত্রী ও তাদের সমমর্যাদার কোনো ব্যক্তি ও সংসদ সদস্যরা) ও কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নির্বাচনী এলাকায় প্রচার বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।' ২০০৪ সালে আচরণবিধিতে এই ধারা সংযোজন করা হয়েছিল। আচরণবিধির উপরোক্ত ধারায় শুধু এমপিদের প্রচারে বাধা নিয়ে আপত্তি আওয়ামী লীগের।

১০ জানুয়ারি  প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়। এর আগের দিন অন্যতম নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে এক আন অফিসিয়াল নোটে জানিয়েছেন, এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী প্রচার ও নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। এটা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন। এটা বন্ধ করতে না পারলে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না। কমিশনের ভাবমূর্তিও নষ্ট হবে।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদাসহ কমিশন সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে আচরণবিধির ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল। সিইসির সঙ্গে বৈঠক থেকে বেরিয়ে দলের সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ এমপি বলেছেন, আচরণবিধিতে স্ববিরোধী বিষয় রয়েছে। তিনি বলেন, কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে তারা বুঝতে পেরেছেন- এমপিরা ভোটের প্রচার ছাড়া আর সবকিছুই করতে পারবেন। কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় একজন কমিশনার (মাহবুব তালুকদার) ছাড়া বাকিরা তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করছেন। কিন্তু পরে সিইসি কে এম নূরুল হুদা সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন, নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো সমন্বয় সংসদ সদস্যরা করতে পারবেন না। নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো কাজ তারা ঘরোয়া বা বাইরে হোক, করতে পারবেন না।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, অনেক দেশে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারে নামার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেখানকার বাস্তবতা আর বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এ ধরনের বিধি-নিষেধ নেই। সেখানে মন্ত্রী-এমপিদের পক্ষে নির্বাচন প্রভাবিত করার সুযোগও নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, আচরণবিধি নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা এবং পুরো পরিস্থিতিকে কমিশনের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারের বাইরে রাখাই শ্রেয়। কারণ দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি পুরনো দলে মন্ত্রী-এমপিদের বাইরে অনেক নেতাকর্মী রয়েছেন। তাদের প্রচারে নামতে কোনো সমস্যা নেই। প্রচারে মন্ত্রী-এমপিরা না থাকলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না- এটা যুক্তিযুক্ত নয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনের বিএনপিদলীয় সমন্বয়ক ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আচরণবিধি নিয়ে আওয়ামী লীগের এই তৎপরতা অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক। তাদের এই ভুল ব্যাখ্যা দুর্ভাগ্যজনক। তারা নির্বাচনে জোর করে জয়ী হওয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে এসব তৎপরতা চালাচ্ছে। বিএনপি বেশি সুযোগ পাচ্ছে- এমন অভিযোগের জবাবে মওদুদ আহমদ বলেন, এটা পুরোপুরি মূল্যহীন কথা। ক্ষমতার জোরে তারা যা খুশি বলে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের উচিত হবে এই নির্বাচন থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ বিরত রেখে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অংসখ্য নেতা ও কর্মী আছেন, যারা মন্ত্রী ও এমপি নন। তারা প্রচারে অংশ নিলেই তো কোনো সমস্যা নেই।

জাপার কো-চেয়ারম্যান ও ঢাকা-৬ আসনের এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, এতে অবশ্যই নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিঘ্নিত হচ্ছে। কারণ বিএনপির সিনিয়র নেতারা সবাই প্রচারে নামতে পারলেও মন্ত্রী-এমপিরা নামতে পারছেন না। এতে এক দল বেশি সুযোগ পাচ্ছে, আরেক দল বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, তার নির্বাচনী এলাকায় সিটি করপোরেশনের ১৬টি ওয়ার্ড রয়েছে। এই ওয়ার্ডে কারা কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন- সে বিষয়ে তার নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের তিনি মতামত দিতে পারবেন না। এতে পরবর্তী সময়ে উন্নয়ন কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দেবে। কারণ তিনি নিজেও ওই এলাকার একজন ভোটার।

এমপিরা নির্বাচনের সমন্বয়ক হতে পারবেন না :সিইসি

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেন, তারা আচরণবিধির ব্যাখ্যা জানতে এসেছিলেন। কমিশন বলেছে, নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো সমন্বয় সংসদ সদস্যরা করতে পারবেন না। নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো কাজ তারা ঘরোয়া হোক বা বাইরে হোক, করতে পারবেন না। এটাই আচরণবিধিতে বলা হয়েছে। এটা তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে। অবশ্য সিইসি এটাও বলেছেন, এমপিরা ঘরে বসে কী করবেন, সেটা তিনি কী করে বলবেন?

আওয়ামী লীগদলীয় সিনিয়র এমপি আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদকে দুই সিটি নির্বাচনের সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া বৈধ কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এটা তিনি বলতে পারছেন না। তার কাছে আনুষ্ঠানিক এ ধরনের কিছু আসেনি। কারা এই কমিটিতে আছেন, তা তারা জানেন না।

নির্বাচনের ক্যাম্পে বসে এমপিরা সমন্বয় করতে পারেন কি-না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমার মনে হয়, তারা পারেন না। আমি জানি না, কাদের কীভাবে কী কমিটিতে রেখেছে। আমরা অফিসিয়ালি এখনও পাইনি। এ রকম পেয়ে থাকলে তাদের নিষেধ করব। সমন্বয়কারী হিসেবে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।'

সিইসি বলেন, এমপিরা সবকিছুই করতে পারবেন। কেবল নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা, কোনো প্রচার এবং নির্বাচনী কার্যক্রম করতে পারবেন না। নির্বাচনের বাইরে যে কাজ, সেখান থেকে তাদের নিষ্ফ্ক্রিয় করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী সরকারি সুবিধাভোগী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে কোনো কথা বলতে পারবেন না। নির্বাচনী এলাকায় তাদের যে রাজনৈতিক কর্মসূচি আছে, সেগুলোতে অংশ নিতে পারবেন।

প্রার্থীর সঙ্গে এমপিরা থাকতে পারবেন কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে কে এম নূরুল হুদা বলেন, 'প্রার্থীর সঙ্গে এমপিরা থাকতে পারবেন কি-না, আইনে এমন ডিটেইলস বাধা-নিষেধ নেই। এখন তারা পার্টির লোক হিসেবে একই সঙ্গে যদি কোনো এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে থেকে থাকেন, সেখানে যেতে পারবেন। রাজনৈতিক কথা হতে পারে, যেমন মুজিববর্ষের কর্মসূচি থাকতে পারে। সেখানে তো যে কোনো লোক যেতে পারেন। শুধু সেখানে নির্বাচনের কোনো প্রচার হবে না।'

প্রচার ছাড়া সবই পারবেন এমপিরা :তোফায়েল

বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় তারা পথসভা, নির্বাচনী প্রচারে সংসদ সদস্যরা যাবেন না- এটা তারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তাদের নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা কার্যালয়ে বসে পরিকল্পনা করতে পারবেন, কর্মীদের দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন। এতে কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, এমপিরা নির্বাচনী প্রচার ছাড়া সব করতে পারবেন।

উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমন্বয়ক তোফায়েল আহমেদ আরও বলেন, আচরণবিধিতে কিছু স্ববিরোধী বিষয় আছে। সংসদ সদস্যরা সরকারি সুবিধাভোগী নন। আবার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়- তারা মন্ত্রী ছিলেন। তারাও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। নির্বাচন কমিশনও তাদের এই ব্যাখ্যায় একমত হয়েছে। কিন্তু তারা বলেছে, এখন কিছু করার নেই। এখন কিছু করা হলে সেটা মানুষের চোখে সরকারের জন্য ভালো হবে না।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইসি আচরণবিধি পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তারাও এখন এটা পরিবর্তন করতে বলেননি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, সংসদ সদস্যরা ঘরে, কার্যালয়ে বসেও নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা বলতে পারবেন না। বৈঠকে মাহবুব তালুকদার ছাড়া সবাই একমত হয়েছেন, এটা বাস্তবসম্মত নয়। তারা ঘরোয়াভাবে কার্যালয়ে, মহল্লায় গিয়ে ঘরের মধ্যে বৈঠক করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে বাধা নেই। একজন দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন। তিনি আরও জানান, মুজিববর্ষে আগামী এক বছর কর্মসূচিতে এমপিরা থাকবেন। ইসি বলেছে, এমপিরা যেন এসব কর্মসূচিতে ভোট না চান। কিন্তু এমপি ছাড়া যারা থাকবেন তারা ভোট চাইতে পারবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তোফায়েল বলেন, 'এই আলোচনা করে আমরা ক্লিয়ার হলাম। আমরা এমপিরা ভোট চাইব না। কিন্তু মাহবুব তালুকদার যে বলেছেন, আমরা ঘরে বসেও কোনো কিছু করতে পারব না- এটা ঠিক নয়।

সিইসির সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে আরও অংশ নেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি, উত্তর সিটির মিডিয়া সেলের সদস্য জয়দেব নন্দী, মাহমুদ সালাহউদ্দীন চৌধুরী। অন্যদিকে সিইসির সঙ্গে ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, শাহাদাত হোসেন চৌধুরী প্রমুখ।