হেলিকপ্টারে এসে ভোট দিলেন ড. এনামুল

সরেজমিন: গুলশান-বনানী

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাব্বির নেওয়াজ ও মিরাজ শামস

ইভিএমে ভোট দেওয়ার শখ পূরণ করতে বগুড়া থেকে হেলিকপ্টারে চড়ে রাজধানীর বনানীর ভোটকেন্দ্রে এলেন জ্যেষ্ঠ নাগরিক ড. এনামুল হক। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট। রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন ভোটকেন্দ্রের সামনে এসে একটি গাড়ি থামল। এক বৃদ্ধকে পাঁচ-ছয় যুবক গাড়ি থেকে ধরে নামালেন। কাছে গিয়ে জানা গেল, তিনি এ এলাকার ভোটার ড. এনামুল হক। ৮৩ বছর বয়স তার। গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজ গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় ছিলেন গতকাল। সেখান থেকে ভোট দিতে হেলিকপ্টারে চড়ে ঢাকায় আসেন। তার শখ, তিনি ইভিএমের মাধ্যমে ভোট দেবেন। কেন্দ্রের দোতলায় নিজ বুথে গিয়ে তিনি ভোট দেন। শখ পূরণ হওয়ায় তিনি আনন্দিত। 

বনানীর বিদ্যানিকেতনের ওই ভোটকেন্দ্রের ভেতরে তাকে চেয়ারে বসিয়ে পালকির মতো করে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় উৎসুক জনতা দেখার জন্য ভিড় করেন। তার বুথ ছিল ভবনের দ্বিতীয় তলায়। চেয়ারে করে তাকে নেওয়া হয় ওই বুথে। বুথের ভেতরে প্রবেশের পর তার নাম-পরিচয় এবং আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। সেখানে ভোট দেওয়া শেষে ২০ মিনিট বিশ্রাম নেন তিনি। 

এ সময় সমকালের এ প্রতিবেদককে ড. এনামুল হক বলেন, জীবনে অনেকবার ব্যালট পেপারে সিল দিয়ে ভোট দিয়েছেন। জীবন সায়াহ্নে তিনি। অভিনব নতুন প্রযুক্তির ইভিএম সম্পর্কে বেশ কিছুদিন ধরে শুনে আসছেন। আগে কখনও ইভিএমে ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। এবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় গ্রামের বাড়ি  বগুড়া থেকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় বিমানবন্দরে আসেন। সেখান থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। ইভিএমে ভোট দিয়ে তিনি আত্মতুষ্টির কথা জানালেন। তিনি আরও বলেন, এতদিন নানাভাবে ভোট কারচুপির কথা শুনেছেন। কিন্তু ইভিএমে কোনো ভোট কারচুপির হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে মনে করেন তিনি। এটি অনেক সহজ। এ পদ্ধতিতে ভোট দিয়ে তিনি খুব খুশি। 

ড. এনামুল হকের বাবার নাম এনায়েত আলী ও মায়ের নাম রওশন আক্তার। ভোটার নম্বর ২৬১১০৯৪৭৭১৮৬। ভোট কেন্দ্রে আসার সময় তার পরিবারের একজন সদস্য ও প্রতিবেশীরা তার সঙ্গে ছিলেন। তারাই তাকে ভোট দিতে সহযোগিতা করেন। প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে তার ব্যক্তিগত গাড়ি ভোটকেন্দ্রের মাঠে নিয়ে এসে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বনানীর বাসভবনে। 

ইভিএমে ভোট দিতে তিনি শখ করে বগুড়া থেকে হেলিকপ্টারে এলেও খোদ এ মহল্লার বহু ভোটারই ভোট দিতে আসেননি। বিকেল ৩টা পর্যন্ত এই কেন্দ্রে এক- চতুর্থাংশ ভোটও পড়েনি। ভোটকেন্দ্রে সাধারণ ভোটারের উপস্থিতি ছিল অনেক কম। কেন্দ্রের ভেতরে কোনো লাইন ছিল না। বিকেল ৪টার আগে আগে দু-একজন ভোটারকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তবে কেন্দ্রের বাইরে প্রার্থীর কর্মীর ভিড় ছিল। 

সকাল ৯টার দিকে গুলশানের কালাচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকতেই প্রচণ্ড শব্দে ককটেল বিস্ম্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। লোকজন দিজ্ঞ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পরে একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকরা এসে ভোটকেন্দ্রের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন। সেখানে দাঁড়িয়ে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী শরিফ উদ্দিন জুয়েল সমকালকে বলেন, এই কেন্দ্রসহ ওয়ার্ডের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তার পোলিং এজেন্টদের পুলিশের সামনেই বের করে দেওয়া হয়। তিনি নিজে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি। অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর প্রার্থী মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, বিএনপির প্রার্থী অসত্য বলছেন। তিনি পোলিং এজেন্ট দেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাননি। এ বিদ্যালয়ের নারীকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আজিজুল হক মাহমুদ বলেন, কেন্দ্র থেকে কোনো পোলিং এজেন্টকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। বাইরে কিছু হয়ে থাকলে তিনি তা অবহিত নন।

৪০ নম্বর ওয়ার্ডের বারিধারা ইউআইটিসি স্কুলে সকালে বেছে বেছে ভোটারদের ঢুকতে দেওয়া হয়। বাকিদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের ভেতর ও বাইরে সরকারদলীয় কর্মী-সমর্থকের ভিড়। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার নুরুল হক মিয়া বলেন, কাউকে বাধা দেওয়ার তথ্য তার জানা নেই। ১৮৮০ ভোটারের এই কেন্দ্রে সকাল ১০টা পর্যন্ত ১৬৭ ভোট পড়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের পোলিং এজেন্ট নেই বলে তিনি জানান।

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের বেরাইদ একেএম রহমত উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারের দীর্ঘ লাইন। কিছুক্ষণ পরেই এ কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত লাটিম প্রতীকের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ঘুড়ি প্রতীকের আইয়ুব আনছার মিন্টুর সমর্থকদের মারামারি শুরু হয়। একপর্যায়ে ব্যাপক সংঘর্ষে রূপ নেয়। কেন্দ্রের ভেতরে ভোটার ও গণমাধ্যম কর্মীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। শতাধিক লোকের ওই সংঘর্ষে দুই গ্রুপের কর্মীরা পরস্পরের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ, রড ও লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আরিফ কায়সার এ সময় অসহায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

দুপুরে সাঁতারকুল উত্তরপাড়া দ্বীন মোহাম্মদ বালিকা দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে গিয়ে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ চলতে দেখা গেছে। এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. জামাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, কেন্দ্রের দুই হাজার ৪০৮ ভোটারের মধ্যে ৯০০ জন ভোট দিয়েছেন। 

তবে সার্বিকভাবে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি ছিল কম। উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দুই কেন্দ্রে গিয়ে সকাল ৯টা পর্যন্ত বিএনপির পোলিং এজেন্টদের দেখা মেলেনি। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একটি ভোটকক্ষে সকাল ৮টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত ভোট পড়ে মাত্র তিনটি, যেখানে মোট ভোটার ৩৪০ জন। সকাল সাড়ে ৮টায় ওই কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ভেতরে-বাইরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা অবস্থান করছেন। পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তাদের তৎপরতা ছিল না। 

সকালে গুলশানের মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোট দিতে গিয়ে ইভিএম জটিলতার কারণে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের মা নাসরিন আউয়ালকে আধা ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ফারজানা শারমিন বলেন, প্যানেলে কানেকশন লুজ ছিল, দু-তিন দফা চেষ্টা করেছি। পরে প্যানেল চেঞ্জ করে দিয়েছি। নাসরিন আউয়াল পরে ভোট দিয়েছেন।

বনানী বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জয়নাল আবেদিন বলেন, সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণের পর একটি বুথে আমরা ইভিএম প্রবলেম দেখতে পাই। ব্যালট প্যানেলের সঙ্গে কন্ট্রোল প্যানেলের সংযোগ পাচ্ছিল না। দুটি ভোট দেওয়ার পর ব্যালট প্যানেল ডিসকানেক্ট দেখাচ্ছিল। তবে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা সমস্যা সমাধান করে ফেলেছি।