ইভিএম ভালো, তবে বিড়ম্বনাও কম নয়

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাশেদ মেহেদী ও দেলোয়ার হোসেন

ইভিএম পদ্ধতি ব্যালটের চেয়ে ভালো। সহজে ভোট দেওয়া যায়, কারচুপি কিংবা জালিয়াতিরও সুযোগ কম। কিন্তু আধুনিক এই প্রযুক্তিনির্ভর ইভিএম পদ্ধতিও বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি। গতকালের ভোটে আঙুলের ছাপ দিয়েও কোনো কোনো ভোটার নিজে তার প্রিয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। অভিযোগ উঠেছে ভোট দিয়ে দিয়েছেন অন্য কেউ। অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের আঙুলের ছাপ মেলেনি, অনেক সময় লেগেছে। কিছু ক্ষেত্রে মেশিনে ত্রুটি থাকায় ভোটগ্রহণ বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে বিতর্ক এড়াতে পারেনি বহুল আলোচিত-সমালোচিত ইভিএম।

তবে সার্বিকভাবে নতুন এই পদ্ধতির কারণে এবারের ভোটকেন্দ্রের দৃশ্যপট ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। কাগজের ব্যালট ছিল না। ভোট দিতে আসা ভোটারদের মধ্যেও ছিল ইভিএম নিয়ে কৌতূহল।

এর আগেও নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ হয়েছে। তবে এবারই প্রথম ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেওয়া হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭নং ওয়ার্ডের খিলক্ষেতে কুর্মিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়ে মনোয়ার বেগম জানালেন, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়েছেন। ইভিএমে প্রথমবার ভোট দেওয়ার কারণে কিছুটা সংশয় ছিল, কিন্তু ভোট দেওয়ার পর মনে হয়েছে, এই পদ্ধতিই সবচেয়ে সহজ। তিনি পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছেন, কোনো সমস্যা হয়নি। পুরুষ বুথে ভোট দিয়ে আতিকুর নামে এক ভোটার জানান, তিনিও সহজেই নিজের ভোট দিয়েছেন, কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি আরও জানান, এর আগের নির্বাচনে তিনি এসে দেখেছিলেন, তার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে, এবার ইভিএমে সে ঘটনা ঘটেনি।

অথচ এই কেন্দ্রেই সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর পরই একদল যুবক হামলা চালিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের বের করে দেয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা। কয়েকজন ভোটার অভিযোগ করেন, তারা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ভোট দিতে আসেন। মেশিনে আঙুলের ছাপ মিলে যায়। তারা গোপন বুথে ঢুকে দেখেন সেখানে আরেকজন বাটন চেপে তাদের ভোট দিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই ভোটকেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার সমকালকে বলেন, 'এসব ভুয়া অভিযোগ। আপনি নিজেই গিয়ে সব বুথে দেখেন কীভাবে ভোট হচ্ছে।' অবশ্য ১০টার পরে বিএনপি নেতাকর্মীরা আবার ফিরে এসে কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান নেন। যদিও এই কেন্দ্রের তিনটি বুথ ঘুরে কোনো কক্ষেই ধানের শীষের কোনো এজেন্ট দেখা যায়নি। একদল যুবককে দফায় দফায় কেন্দ্রের ভেতরে মহড়া দেখা দিতে দেখা যায়। কেন্দ্রের বাইরেও মোটরসাইকেল নিয়ে একদল যুবককে মহড়া দিতে দেখা গেছে। এ অবস্থা সম্পর্কে এলাকার একজন নেতার মন্তব্য, ভোটগ্রহণ পদ্ধতি ডিজিটাল হয়েছে, কিন্তু পেশিশক্তির মহড়া রয়ে গেছে সেই আগের মতো। মূল সমস্যাটাও এখানেই।

ভোটারের চোখে ইভিএম :'পদ্ধতি হিসেবে এই ইভিএমটাই ভালো। আঙুলের ছাপ দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা, বাটন চেপে ভোট দেওয়া, ব্যালটের চেয়ে অনেক ভালো পদ্ধতি।' বনানী বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে সকালে ভোট দিয়ে জানালেন মাঝবয়সী ভোটার কাওসার আহমেদ। তার ভাষায়, 'এই সিস্টেম ডেফিনেটলি বেটার। আমার মনে হয়, ভোটাররা এটা গ্রহণ করবেন।' আরেকজন তরুণ ভোটার রবিন বলেন, দেশে সব পদ্ধতিই যেখানে ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে, সেখানে অবশ্যই ভোটগ্রহণ পদ্ধতি ডিজিটালই হওয়া উচিত। কিন্তু এ পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে আরও ব্যাপকভাবে প্রচার করা উচিত ছিল। প্রচার কম হওয়ার কারণে অনেকেরই প্রথমে বুঝতে সমস্যা হয়েছে। এই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন ৮৯ বছর বয়সী প্রবীণ আমিরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক। ছেলে আশরাফুল ইসলামকে নিয়ে ভোট দিতে আসেন তিনি। আমিরুল ইসলাম জানান, তিনি তার জীবনে যত ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, কেন্দ্রে গেছেন ভোট দিতে। এবার ইভিএমের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, খুব ভালো। ভোট দিয়ে ভালো লাগছে। বাটন প্রেস করে ভোট দিতে কোনো সমস্যাই হয়নি। ভোটার কম ছিল, এ কারণে লাইনেও দাঁড়াতে হয়নি।

ভিকারুনন্নিসা নূন স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়ে ভোটার শরফুদ্দিন জানান, ইভিএম ভালো, তবে এটা শিক্ষিত মানুষের জন্য সহজ, অশিক্ষিত মানুষের জন্য কিছুটা কঠিন।

বিড়ম্বনার শিকার তাবিথ আউয়ালের মা :সকালে গুলশানের আল মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়েছিলেন ঢাকা উত্তরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের মা নাসরিন আউয়াল। কেন্দ্রের তিন নম্বর মহিলা বুথে ঢুকে আঙুলের ছাপ মেলার পর ভোট দিতে যাওয়ার মুহূর্তে মেশিন হ্যাং করে। ফলে মেশিনে ভোট দেওয়ার কোনো বাটন কাজ করছিল না। এরপর কর্মকর্তারা প্রায় ৪০ মিনিট চেষ্টা করে কেন্দ্র সচল করেন। পরে তিনি ভোট দেন। নাসরিন আউয়াল বলেন, তার ক্ষেত্রে এ ধরনের অবস্থা হলে সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রে কী ধরনের বিড়ম্বনা হচ্ছে, সেটা সহজেই অনুমেয়। কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ফারজানা শারমিন বলেন, মেশিনের সংযোগে ত্রুটি থাকার কারণে সমস্যা হয়েছিল। তবে পরে নাসরিন আউয়াল ভোট দিয়েছেন, কোনো সমস্যা হয়নি।

শা্যমলীর কিং ফয়সাল ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণের শুরুতেই পাঁচটি বুথে ইভিএম মেশিন অচল হয়ে পড়ে। পরে মেশিন বদলের পর প্রায় আধাঘণ্টা দেরিতে ভোটগ্রহণ শুরু হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুপুর ১২টার দিকে এই কেন্দ্রের সামনে কয়েকজন অভিযোগ করেন, এখানে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ঘুড়ি মার্কার বাটনে চাপ দিতে কিছু যুবক বাধ্য করছেন এবং পুলিশ ওই যুবকদের কেন্দ্রে থাকতে সহায়তা করছে। সকালে টিফিন ক্যারিয়ার মার্কার অপর কাউন্সিলর এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। পরে এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে কথা বলার জন্য ভেতরে যেতে চাইলে কয়েক যুবক ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয় সাংবাদিকদের। পরে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করলেও প্রিসাইডিং অফিসারকে পাওয়া যায়নি। তিনি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বুথ পরিদর্শনে ব্যস্ত আছেন বলে জানান কর্তব্যরত পুলিশ।

সিইসির আঙুলের ছাপ মেলেনি :প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা সকালে ভোট দিতে যান উত্তরার আইএএস স্কুল কেন্দ্রে। আট নম্বর বুথে ভোট দিতে গিয়ে মেশিনে আঙুলের ছাপ মেলেনি। অবশ্য পরে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর মিলিয়ে তার ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ ব্যাপারে সিইসি নূরুল হুদা বলেন, কারও আঙুলের ছাপ না মিললেও কোনো সমস্যা নেই। তিন-চার উপায়ে ভোট দেওয়া যায়। অতএব, এ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার সিদ্দিকা বুলবুল সাংবাদিকদের জানান, সিইসির দুই বৃদ্ধাঙ্গুলের ছাপই ম্যাচ করেনি। যে কারণে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর মিলিয়ে তার ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আঙুলের ছাপ না মিললে এই ব্যবস্থা সব ভোটারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

ঐক্যফ্রন্ট নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ভিকারুনন্নিসা নূন স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে গেলে ভোট কক্ষের মেশিনে তারও আঙুলের ছাপ মেলেনি। প্রায় আধাঘণ্টা চেষ্টার পরও আঙুলের ছাপ না মেলায় প্রিসাইডিং অফিসারের কোটায় তার ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পরে ড. কামাল হোসেন বলেন, তার ভোট দিতে সময় লেগেছে আধাঘণ্টা। তাহলে ইভিএম পদ্ধতিতে সাধারণ জনগণের কত সময় লাগবে?

প্রিসাইডিং অফিসাররা বলেন, সাধারণভাবে বয়স্ক এবং যারা হাতে পরিশ্রম বেশি করেন এমন শ্রমিকদের আঙুলের ছাপ মেলাতে কষ্ট হয়েছে। তবে এতে বড় সমস্যা হয়নি। এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ইভিএম সমন্বয়কারী কামরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ঢাকা উত্তরে ইভিএম ব্যবহারে খুব বেশি সমস্যা ছিল না। কোনো ইভিএম মেশিন বন্ধ হয়নি। কয়েকটি কেন্দ্রে ছোটোখাটো কিছু সমস্যা দেখা দেয়। এগুলো দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ইভিএম সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সকালে প্রায় অর্ধশত কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তবে প্রতিটি মেশিন ও এসডি কার্ডের সঙ্গে ব্যাকআপ মেশিন ও কার্ড থাকার কারণে সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়েছে।