ভোটে জেতানোর আশা দিয়ে ডিজিটাল প্রতারণা

সিটি নির্বাচনে 'স্পুফিং' কলে প্রার্থীদের ফাঁদে ফেলে ওরা, ব্যবহূত হয় ৮১১ সরকারি কর্মকর্তার ফোন নম্বর

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

'ইলেকশনে আপনার তো অবস্থা ভালো না। তবু আমরা ভাবছি আপনাকে জেতাতে কী করা যায়। আমাদের কিছু প্রসেস রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট আছে। প্রতি কেন্দ্রে একজন অফিসার থাকবে। সবাই দেখবে আপনার ব্যাপারে। কিছু টাকা খরচ করলে সবকিছু বদলে দেওয়া যাবে। নির্বাচনে জিততে কোনো সমস্যা হবে না।'

সদ্য সমাপ্ত সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের আগে ঢাকার বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থীর মোবাইলে কল করে দেওয়া হয়েছিল এ রকম প্রস্তাব। কাউন্সিলর প্রার্থীরা এ ধরনের কল পেয়েছিলেন বিভিন্ন থানার ওসিদের সরকারি নম্বর থেকে। কেউ কেউ বিশ্বাস করেছিলেন, ওই ফোনকল সত্যিই ওসিদের। ফোনকলের ফাঁদে পা দিয়ে বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থী তখনই মোটা অঙ্কের টাকা বিকাশে পাঠিয়ে দেন।

কিন্তু একইভাবে বারবার টাকা দাবি করায় একপর্যায়ে প্রার্থীদের সন্দেহ হয়। প্রার্থীরা তখন বিষয়টি পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জানান।

এরপর শুরু হয় তদন্ত। তখন জানা যায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিওআইপি সার্ভিস প্রোভাইডার 'ইনানী' সাইটে নিবন্ধিত হয়ে 'ইনটেল ডায়ালার অ্যাপসের' মাধ্যমে ওসিসহ সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারি নম্বর নকল করে 'স্পুফিং' কলের মাধ্যমে ভোটে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের একটি চক্র ফাঁদে ফেলেছে।

শুধু সদ্য সমাপ্ত সিটি করপোরেশন নির্বাচন নয়, অনেক দিন ধরেই এ দেশের বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় প্রার্থীদের সঙ্গে এভাবে প্রতারণা করে আসছিল এই চক্র। এরই মধ্যে চক্রের মূল হোতা সাইদুল ইসলাম বিপ্লব ও তার সহযোগী মো. পলাশকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ। বিপ্লব ও পলাশ দু'জন গতকাল রোববার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি ও পুলিশকে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে 'স্পুফিং' কলের মাধ্যমে প্রার্থীদের ফাঁসানোর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রার্থীর কাছ থেকে ৩৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। এই চক্র এবারের  নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের আলোচিত কাউন্সিলর প্রার্থী আলেয়া সারোয়ার ডেইজীর কাছ থেকেও পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ভোটে জিততে প্রার্থীদের অসাধুতার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়ার পর তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।

পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, গত ২২ জানুয়ারি সকাল ৯টার দিকে ডিএনসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ইয়াছিন মোল্লার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আদাবর থানার ওসির পরিচয় দেওয়া হয়। ইয়াছিনের ফোনে ওসির সরকারি নম্বর ভেসে ওঠে। ওসি পরিচয় দিয়ে ইয়াছিনকে বলা হয়, 'নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কথা বলেন। ম্যাজিস্ট্রেট আমার পাশে রয়েছেন।' কিছু সময় পর ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে আবার একটি মোবাইল নম্বর থেকে ইয়াছিনকে ফোন করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট তাকে বিজয়ী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন। এর মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা নির্বাচনের আগেই পরিশোধ করার চাপ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই দিনই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা দেন ইয়াছিন। পরে আবারও টাকার জন্য চাপ দিলে ইয়াছিন বুঝতে পারেন, প্রতারণার শিকার তিনি। এ অবস্থায় ইয়াছিন মোল্লার ছেলে কাউসার মোল্লা বাদী হয়ে আদাবর থানায় মামলা করেন।

ঠিক একইভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন ডিএনসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী ও নির্বাচনে বিজয়ী আবুল কাশেম। তার কাছ থেকে ওসি এবং ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কাশেমের ম্যানেজার বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন।

প্রার্থীদের কাছে এভাবে 'স্পুফিং' কল করে প্রতারণার একাধিক ঘটনা জানার পর এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে মাঠে নামে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ। শনিবার রাজধানীর দুটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাইদুল ইসলাম বিপ্লব ও মো. পলাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ২৯টি মোবাইল সিম, চারটি মোবাইল সেট, একটি পাসপোর্ট, নগদ টাকা, ডলার, একটি ডেবিট কার্ড ও ব্যাংকের জমা বইয়ের রসিদ পাওয়া যায়। তাদের লেনদেনের তথ্য যাচাই করে গতকাল পর্যন্ত ৩৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। তবে এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, প্রতারক এ চক্রের দলনেতা সাইদুল ইসলাম বিপ্লব। তার গ্রামের বাড়ি রংপুরের কাউনিয়ায়। বিপ্লবের মূল সহযোগী হলেন পলাশ। তারা দু'জন একসঙ্গে মিরপুরে মেসে থাকতেন। সেখান থেকে তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। পলাশ কম্পিউটারের ওপর পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে তিনি অ্যামাজন ডটকমে ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও কাজ করছেন। ২০১৭ সালের মে মাসে বিপ্লবের পরামর্শে ভিওআইপি প্রোভাইডার ইনানী সাইটে নিবন্ধন করেন পলাশ। এরপর তার আইডি থেকে 'স্পুফিং' কল করে প্রতারণা করতেন বিপ্লব। মোবাইল নম্বর ও কণ্ঠ নকল করে তিনি প্রথমে পরিচয় দিতেন ওসি হিসেবে। পরে পৃথক নম্বর থেকে তিনিই আবার নতুন নকল কণ্ঠে ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিয়ে কথা বলতেন।

পুলিশ জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনানীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ম্যাজিস্ট্রেট, কাস্টমস ও পুলিশের ৮১১ জন বিভিন্ন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তার ফোন নম্বরের বিপরীতে আইডি তৈরি করে প্রতারক চক্রটি প্রতারণা করেছে।

দুই প্রতারক জানান, অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য যে এলাকার কাউকে টার্গেট করা হতো, সেই এলাকার কোনো মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের কাছ থেকে টাকা তুলত না তারা। ঢাকার কারও কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে বিকাশে টাকা তুলত ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দূর-দূরান্তের এলাকা থেকে। আবার এজেন্টকে ফাঁকি দেওয়ারও বিশেষ কৌশল ছিল বিপ্লবের। টাকা তুলতে যাওয়ার সময় সঙ্গে একটি ব্যাগ নিয়ে যেতেন তিনি। দোকানে গিয়ে ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে বলতেন, 'কিছুক্ষণ পরই বিদেশে যাব। তাড়া আছে। দ্রুত টাকা দেন।' এজেন্ট জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলে তিনি ভুয়া এনআইডি নম্বর দিয়ে টাকা নিয়ে দ্রুত সটকে পড়তেন। প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছিলেন বিপ্লব।

আগেও বিপ্লব বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা করেছেন। তার বিরুদ্ধে শরীয়তপুরের গোসাইরহাট, সখীপুর ও লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ থানায় মামলা রয়েছে। বিপ্লব ও তার সহযোগীরা শেরপুরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রার্থীদের একইভাবে ফাঁদে ফেলে। সেখানেও মামলা হয়েছিল।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব বিজয় তালুকদার গতকাল বলেন, প্রার্থীদের স্পুফিং কলের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে প্রতারণার ঘটনায় তিনটি মামলা করা হচ্ছে। সারাদেশে এই চক্রের নেটওয়ার্ক রয়েছে।

যা বললেন ডেইজী ও আরেক প্রার্থীর ছেলে :প্রতারকদের খপ্পরে পড়ার ব্যাপারে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আলেয়া সরোয়ার ডেইজী গতকাল বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে তার বিদেশ ও সিলেট থেকে তার অনেক আত্মীয়স্বজন ঢাকায় এসেছিলেন। প্রচারের সময় ফোনে কল এলে তারাই রিসিভ করতেন। একদিন ওসির পরিচয় দিয়ে ফোন এলে তার এক বোন রিসিভ করে। এ ধরনের প্রস্তাব পেয়ে হয়তো সরলমনে বোনকে সহায়তা করার মানসিকতা থেকে ফাঁদে পা দেয় সে। তিনি বলেন, এ ঘটনা জানার পর ওকে থানায় গিয়ে অভিযোগ দিতে বলি। এর সঙ্গে তার কোনো সংশ্নিষ্টতা নেই বলেও জানান তিনি।

৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ইয়াছিন মোল্লার ছেলে ও মামলার বাদী কাওসার মোল্লা বলেন, কথা বলার সময় বুঝতেই পারিনি তারা প্রতারক। আরও কয়েকজন প্রার্থীকে ফাঁদে ফেলেছে তারা।