দু'জনই মনেপ্রাণে জাতীয়তাবাদী। বড় ভাই আবদুল মজিদ নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির উপদেষ্টা আর ছোট ভাই হাসান আহাম্মেদ মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক। চাঁদাবাজিতে দুই ভাইয়ের দারুণ দোস্তি। নগরের মণ্ডলপাড়া বৈধ স্ট্যান্ডে অবৈধ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের ওপর তাদের নজর। ইজিবাইক যত না 'ইজি' তার চেয়েও যেন সহজ মজিদ-হাসানের চাঁদাবাজি।

কোনো রাখঢাক নেই। স্ট্যান্ডে বসেই মজিদ তার ছোট ভাই হাসানের সহযোগীদের দিয়ে দিনের আলোতেই চাঁদা তোলেন। রাতেও সচল থাকে সেই ধারাবাহিকতা। প্রকাশ্যে চাঁদার নহর বইলেও যেন দেখার কেউ নেই। বিএনপির এ দুই নেতার দাপটে চালকরা অসহায়। বাধ্য হয়ে আয়ের একটি বড় অংশ প্রতিদিন তুলে দিতে হচ্ছে তাদের হাতে।

নগরের মণ্ডলপাড়া জিমখানা বটতলার স্ট্যান্ডটি মূলত সিএনজিচালিত থ্রি হুইলার রাখার স্থান। এখানে সিএনজিচালিত গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো গাড়ির দেখা মেলে না। তবে সিএনজিচালিত থ্রি হুইলার স্ট্যান্ডের নামে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ একটি ইজিবাইক স্ট্যান্ড। এই অবৈধ কাজের মূল হোতা স্ট্যান্ডের ইজারাদার আবদুল মজিদ।

ভুক্তভোগী ইজিবাইক চালক ও মালিকরা আবদুল মজিদ ও হাসান আহাম্মেদের নাম মুখে আনতেও ভয় পান। হাসানের স্ত্রী আফরোজা হাসান বিভা সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। সদ্য সমাপ্ত নাসিক নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো বিভা কাউন্সিলর হয়েছেন। বিভা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তিনি নাসিকের তৃতীয়বারের নির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।

জিমখানা স্ট্যান্ড থেকে সিএনজিচালিত থ্রি হুইলারগুলো মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর ও মাওয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত চলাচল করে। আর ইজিবাইকগুলো ফতুল্লার কাশীপুর খিলমার্কেট, দেওয়ানবাড়ী, ভোলাইল, চরনরসিংপুর, হাটখোলা ও মুক্তারপুর ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করে। এসব পথে চলাচল করা কমপক্ষে দুই হাজার ইজিবাইকের চালকের কাছ থেকে জোর করে চাঁদা তুলছে মজিদ ও হাসানের নিয়োজিত বাহিনী।

জানা যায়, ইজিবাইক থেকে ট্রিপপ্রতি ১০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। একটি ইজিবাইক যদি ১০টি ট্রিপ নেয় তাহলে তাকে দিতে হয় ১০০ টাকা চাঁদা। চাঁদা তোলার দায়িত্বে রয়েছে রাসেল ওরফে মুরগি রাসেলসহ দুই ভাইয়ের নিয়োজিত কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ইজিবাইক চালক বলেন, অনেক সময় যাত্রী কম হলেও চাঁদার অঙ্ক কমে না। দুই হাজার ইজিবাইক থেকে চক্রটি প্রতিদিন দুই লাখ টাকার মতো আদায় করছে।

অন্যদিকে, কাশিপুর দেওয়ানবাড়ি ও খিল মার্কেট স্ট্যান্ড থেকে অন্য একটি গ্রুপ চাঁদা নিচ্ছে ৪০ টাকা করে। এই সড়কগুলোতে গাড়ির সংখ্যা আনুমানিক দুই হাজারের মতো। চালকদের দাবি, এই চাঁদার টাকার কারণে আমরা গাড়িচালকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই যাত্রীদের কাছ থেকে পাঁচ টাকা করে ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছি। এতে করে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে আমাদের প্রতিদিনই ঝগড়া-বিবাদ হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার বাবুরাইল লেকপাড়, জল্লারপাড় ও বাংলাবাজার সড়কের তিন মোড়ে বাবুরাইল মসজিদের সামনে অটোস্ট্যান্ডটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে জানা যায়, জিমখানা সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে।

ওই দিন দুপুরে ঘটনাস্থল বাবুরাইল লেকপাড়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ফুটপাতে চায়ের দোকানের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে ছিলেন বিএনপি নেতা আবদুল মজিদ। পরনে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি। গলায় কালো মাফলার, মুখে মাস্ক। তিনি স্ট্যান্ডে বসে থেকে চাঁদা আদায়কারীদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

চাঁদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করে আবদুল মজিদ বলেন, 'আমি এই স্ট্যান্ড ইজারা নিয়েছি। আমার লোকজন ইজারার টাকা ( টোল) ওঠাচ্ছে।' আপনি সিএনজিচালিত থ্রি হুইলার স্ট্যান্ড ইজারা নিয়েছেন, কিন্তু অবৈধভাবে চলাচল করা ইজিবাইক থেকেও চাঁদা নিচ্ছেন কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'স্ট্যান্ড থেকে যে গাড়ি ছেড়ে যাবে, সেটাকেই টোল দিতে হবে।'

রাসেল নামে এক ইজিবাইক চালকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে জানানো হলে মজিদ বলেন, 'এমন কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। সবাই জানে আমি ইজারাদার। তবে আগে যারা ইজারা তোলার দায়িত্বে ছিল তখন কিছু অনিয়ম হয়েছে। আগের লোকরা বেশি টাকা নিত। তাই ওদের বাদ দিয়ে আমি নতুন লোক দিয়েছি। আমি নিজে স্ট্যান্ডের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেব। চাঁদাবাজির অভিযোগ মিথ্যা।' তিনি বলেন, 'আমার ভাই হাসান আহাম্মেদ সন্ত্রাসী নয়। ছোট ভাই হাসানের স্ত্রী বিভার বিরুদ্ধেও অনেকে অনেক কিছু লিখেছে। অথচ আমার বোন বিভা এবারও কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছে।'

ইজিবাইক থেকে চাঁদাবাজি ঘিরে ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর সদর উপজেলার ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়নের হোসাইনী নগর এলাকায় একটি রিকশা গ্যারেজের ভেতরে মিল্টন হাওলাদার (৪০) ও পারভেজ আহমেদ (৩০) নামে দু'জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ফতুল্লা থানার এসআই মাজারুল ২২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১২৫ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছিলেন। এ দুই ভাই ওই হত্যাকাণ্ডের হুমুকদাতা ছিলেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।

এ ব্যাপারে কথা বলতে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

ইজিবাইক থেকে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে সদর মডেল থানার ওসি শাহ জামান ফোন ধরেননি। তবে এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম বলেন, ইজিবাইক এমনিতেই অবৈধ। সেই অবৈধ যানবাহন থেকে যারা চাঁদা আদায় করছে, তাদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।