বিশেষ মন্তব্য

আইনের তোয়াক্কা করছে না কেউ

 প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৯ | আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৯      

 ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান

কোথাও আগুন লাগলে বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হলেই সবাই সাময়িকভাবে সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করি। বাস্তবতা হচ্ছে, ভবন নির্মাণের সময়ে কেউই নিয়ম-কানুন মানেন না। ভবন মালিকেরা বিল্ডিং কোড এবং অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ক নিয়ম-কানুন মানেন না। নিয়ম মানলে চোখের সামনে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু দেখতে হতো না। আইন না মানলে, সচেতন না হলে আগুনে বড় ধরনের ক্ষতি বা প্রাণহানি ঘটতেই থাকবে।

অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটবে, এটা স্বাভাবিক। তবে কারও অনিয়মের জন্য প্রাণহানির ঘটনা দুঃখজনক। বহুতল ভবনগুলোতে অগ্নিনির্গমন পথটুকু পর্যন্ত থাকে না। জলাধার থাকে না। তাহলে ফায়ার সার্ভিস দ্রুততার সঙ্গে আগুন নেভাবে কীভাবে? আগুন লাগা ও ভবন ধসের পর বাড়ির নকশা পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

আমি ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনের সময় রাজধানীর বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন ভবনে অগ্নি-নিরাপত্তা জরিপ করেছিলাম। ওই জরিপের ফলাফলে হতাশ হতে হয়েছে। জরিপে নামকরা বহুতল ভবন, শপিং মল থেকে শুরু করে হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও অগ্নিঝুঁকিতে থাকার চিত্র উঠে আসে। এরপর চিঠি দেওয়া হয় সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কেউই আইনের তোয়াক্কা করেন না। এজন্য আগুন লাগার দায়টা পুরোপুরি ভবন মালিকদের বহন করা উচিত।

বনানীতে এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড এবং মর্মান্তিক প্রাণহানির পর ভবনটির নানা অনিয়মের চিত্র উঠে আসছে।

এত প্রাণহানির পর ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, গুলশান, বনানীসহ ঢাকার দুই অংশেই এ ধরনের অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। আবার অগ্নি-নিরাপত্তার সব ধরনের নিয়ম মেনেও দেশে অনেক বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে।

যেসব ভবনে অগ্নি-নিরাপত্তা নেই বা নকশা-বহির্ভূতভাবে তৈরি করা হয়েছে সেগুলো ভেঙে ফেলারও দরকার নেই। এসব ভবন সংস্কার করেই ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব। এজন্য সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলোকে কঠোর হতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সেরও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে বড় অগ্নি-দুর্ঘটনা প্রতিরোধের মতো সক্ষমতাও এই বাহিনী দেখিয়েছে এবং তা রয়েছেও। ২০ তলা ভবন পর্যন্ত আগুন নেভানো এবং উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর মতো সক্ষমতা ও অত্যাধুনিক সরঞ্জাম রয়েছে। এসব যন্ত্র তো সময় মতো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। যানজটের কারণে সময় মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এজন্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও প্রাণহানিও বেশি হচ্ছে। আগুন লাগার খবর পাওয়ার এক মিনিটের মধ্যেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে গাড়ি বের হয়। ঘটনার ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো গেলে আগুন দ্রুত নির্বাপণ সম্ভব। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরেই যানজটে রাস্তায় বসে থাকতে হয়। তখন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা অসহায় বোধ করেন। এরপরও বনানীর ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস সফল হয়েছে। অন্য কোনো ভবনে আগুন ছড়াতে দেয়নি। একইভাবে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টাতেও আগুন ছড়াতে দেওয়া হয়নি।

সমস্যা শুধু এটাই নয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে পানি পাওয়া যায় না। বহুতল ভবনের জলাধার বাধ্যতামূলক থাকলেও তা কোথায়ও পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের ভিড়ের জন্য স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রমও চালানো যায় না। এসব বিষয়ে সবাইকে ভাবতে হবে।

ঢাকার অভিজাত এলাকা বনানী, পুরান ঢাকার নিমতলী বা চুড়িহাট্টার মতো ট্র্যাজেডিগুলোর পুনারাবৃত্তি ঠেকাতে আইন মানার বিকল্প নেই। সচেতনতার বিকল্প নেই। বিল্ডিং কোড মেনে, অগ্নি-নিরাপত্তা কোড মেনে ভবন তৈরি করলে আগুন লাগলেও বড় ধরনের প্রাণহানি হওয়ার সুযোগ নেই। বহুতল ভবনগুলোতে আগুন নেভানোর মতো নিজস্ব সক্ষমতা থাকতে হবে। অগ্নি নিগর্মন পথ যেমন থাকবে, আগুন নেভানোর সরঞ্জামও থাকতে হবে, প্রয়োজনীয় জলাধার থাকতে হবে। ভবনে আলাদা ফায়ার সার্ভিস ইউনিট থাকতে হবে। তবেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

কোনো সংস্থার আধুনিকতা একটা আপেক্ষিক বিষয়। আগে ফায়ার সার্ভিসের তেমন কোনো সরঞ্জাম ছিল না। এখন অনেক অত্যাধুনিক সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, গাড়ি যুক্ত হয়েছে। এই উন্নতির শেষ নেই। মনে রাখতে হবে আমরা উন্নত দেশে পরিণত হচ্ছি। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাকেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তা ছাড়া অগ্নি-নিরাপত্তার নিয়ম-কানুনগুলোও বেশ পুরাতন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব আইন-কানুন সংস্কার করা উচিত।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান :সাবেক ডিজি, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স