মন্তব্য

বিশেষ মন্তব্য

শুধু তালিকা নয় চাই আইনি ব্যবস্থাও

 প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

 এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

সংসদে শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিষয়টি ইতিবাচক। আমি এর প্রশংসা করি। তালিকা প্রকাশের একটা সুফল হয়তো আছে। জনগণ জানল- কারা ব্যাংকের টাকা নিয়ে শোধ করছে না। গণমাধ্যমে নাম প্রকাশের কারণে তারা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবে। অন্তত চক্ষুলজ্জার ভয়ে ঋণখেলাপিদের কেউ কেউ টাকা ফেরত দিলে এ তালিকা প্রকাশের সার্থকতা পাওয়া যাবে।

তবে চক্ষুলজ্জার ভয়ে ঋণখেলাপিদের কেউ টাকা ফেরত দেবে- এমন আশা আমি করছি না। আশাবাদী না হওয়ার কারণ হলো, এর আগেও এমন তালিকা প্রকাশ হয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একাধিকবার এমন তালিকা প্রকাশ করেছিলেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উপরন্তু খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছেন, ২০১৫ সাল পর্যন্ত খেলাপি ঋণগ্রহীতা ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৯৫৪ জন এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। এর চার বছর পর ২০১৮ সালের শেষে এসে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ এবং খেলাপি ঋণের অঙ্ক ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ সময়ে খেলাপির সংখ্যা ৫৮ হাজার এবং পরিমাণ ৪৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা বেড়েছে।

মোদ্দা কথা, খেলাপি ঋণ একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। ঋণখেলাপিদের নিজে থেকে শুভবুদ্ধির উদয় হবে- এটা আমি মনে করি না। আইনগতভাবে বাধ্য না করা হলে এ সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। বর্তমান অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের সময় বলেছিলেন, তিনি এমন ব্যবস্থা নেবেন, যার কারণে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না। কিন্তু আমরা কী দেখছি? খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বা খেলাপি ঋণ কমেনি বরং বেড়েছে। কারণ তিনি খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনে খেলাপিদের 'খেলাপি ঘোষণা' বিলম্বিত করেছেন। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ১২ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ করে দিয়েছেন। আবার এক বছর গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ারও কথা বলেছেন। গত মে মাসেই এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার ইস্যু করেছে। ২০১৫ সালেও ঋণখেলাপিদের ঢালাওভাবে ঋণ পুনঃতসফিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। এভাবে খেলাপি ঋণ আদায় হয় না।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে- সরকারের এ ক্ষেত্রে কী করার আছে? করার আছে অনেক কিছু। প্রথমত, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খেলাপিরা কোনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবে না- এমন বিষয়টি রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে একটা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে হবে- খেলাপিদের টাকা ফেরত দিতে যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। যারা এর আগে সুযোগ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করেনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কারও প্রতি অনুকম্পা দেখানো চলবে না।

আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধান বিচারপতির কিছুটা হস্তক্ষেপ চাওয়া যেতে পারে। কারণ আমরা দেখছি, আদালতে ঋণখেলাপির মামলা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে থাকছে। এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার একটা পথ খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন পর্যন্ত ব্যাংকনির্ভরতা অনেক বেশি। ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়ে ঋণের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় সেগুলো নতুন গ্রাহকদের চাহিদামতো দিতে পারছে না। এর ফলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার ঋণের অর্থ সুদসমেত ফেরত না পাওয়ায় ব্যাংকগুলো খরচ মেটাতে সুদহার বাড়াচ্ছে। গত বছর সরকার ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়েও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এভাবে ব্যাংকগুলো সুদের হার কমাতে পারবে না। সুদহার না কমার কারণেও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে সরকার যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাইছে, তা অর্জনও সহজ হবে না।

খেলাপি ঋণের নেতিবাচক প্রভাব এখন জনগণের মধ্যেও পড়তে শুরু করেছে। কারণ কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে পড়ার কারণে তারা আমানতকারীদের অর্থ ঠিকমতো ফেরত দিতে পারছে না। এ প্রবণতা বাড়তে থাকলে পুরো ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট বাড়বে। তখন মানুষ তাদের সঞ্চয়ের অর্থ ব্যাংকে না রেখে অন্য কোথাও বিনিয়োগ করার চেষ্টা করবে। আমরা অবশ্যই সে ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হোক; তা চাই না। সম্ভাব্য এ পরিস্থিতি এড়াতে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে।

অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছেন, গত চার বছরে জনগণের করের টাকা থেকে ১৩ হাজার ৬১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি মেটাতে ব্যয় করেছে। জনগণের কষ্টের টাকার এমন অপচয় বন্ধ করা উচিত। এ ব্যবস্থা চালু রাখলে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার প্রকাশও হবে না।

লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা