‘ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে স্মরণে রাখতে হবে’

 প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০১৯ | আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৯      

 অনলাইন ডেস্ক

রাশেদ খান মেনন

বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ( ন্যাপ) সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ শুক্রবার রাতে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সারা জীবনই তিনি নীতি-আদর্শের ব্যাপারে অটল ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতির এই নক্ষত্রকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এ দেশের রাজনীতির এক অধ্যায়। আমরা যখন প্রথম ছাত্র আন্দালনে আসি অর্থাৎ ষাটের দশকে আইয়ুবের সামরিক শাসনের আমলে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে মোজাফফর আহমদের ওপর হুলিয়া ছিল। তিনি তখন ন্যাপও করতেন। ওই সময় তার মাথার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

ছাত্র আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে অর্থাৎ '৬৩-৬৪ সালের দিকে ওইসব হুলিয়া তুলে নেওয়া হয়। একজন বামপন্থি নেতা হিসেবে মোজাফফর আহমদ আত্মগোপন করে আছেন- এটাই তার সম্পর্কে জানতাম ওই সময়ে।

উনি যখন আত্মগোপন থেকে বেরিয়েছেন, ওই সময় তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে। তখন সারাদেশে পাটকল শ্রমিকদের ধর্মঘট হচ্ছিল । যারা তখন আত্মগোপনে থাকতেন তারা আমাদের কাছে মহান পুরুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তারপর তাকে দেখেছি বিভিন্ন সময়। আমি যেহেতু অন্য দলে সংযুক্ত ছিলাম, এ কারণে রাজনৈতিকভাবে তার সঙ্গে আমার সেরকম নৈকট্য ছিল না। কিন্তু আমরা তাকে জানতাম ত্যাগী রাজনীতিক হিসেবে। মূলত তার সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে এরশাদ সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ হতো।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় যখন আমরা ১৫ দল করি, তখন বিভিন্ন মিটিংয়ের সময় সকালবেলায় তিনি আমাকে ফোন করতেন। জানতে চাইতেন, মেনন আজকে তোমরা কী করবে? তার মধ্যে সবসময় অভিভাবকসুলভ একটা ব্যাপার ছিল। তিনি খুব রসিয়ে কথা বলতেন। অনেক সময় ভাববাচ্যেও বলতেন। মূলত সেই সময়েই ওনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।

অধ্যাপক মোজাফফরকে দেখেছি নির্লোভ, আদর্শনিষ্ঠ, নীতির প্রশ্নে আপসহীন একজন মানুষ হিসেবে। তখনকার দিনে মস্কোপন্থি বলে যারা পরিচিতি ছিলেন সেই ঘরানার সামনের সারির লোক ছিলেন তিনি।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ


অধ্যাপক মোজাফফর সবসময় শ্রমিক অধিকার, সমাজতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। একটা পর্যায়ে এসে তিনি ধর্মকর্ম, সমাজতন্ত্র নিয়ে একটা তত্ত্ব সামনে নিয়ে আসেন।

আদর্শের, নীতির ব্যাপারে তিনি অটল ছিলেন। তার দলের মধ্যে বিভক্তি এসেছে। কিন্তু তিনি তার নীতি, আদর্শ থেকে সরেননি।

সবচেয়ে বড় কথা, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে তিনি বিভিন্ন প্রচারণা চালিয়েছেন। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি বড় ধরনের অবদান রেখেছেন। সরকারের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সেই সময় জাতিসংঘেও গিয়েছিলেন।

অধ্যাপক মেজাফফর মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে তার একটা বড় ধরনের অবদান ছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাকে অনেক সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রসিকতা করতেও দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দলীয় ও ব্যক্তিগতভাবে তার সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটাও ভালো ছিল।

বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পক্ষে তিনি সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীকালে যখন বাংলাদেশ হয় তখনও গণতান্ত্রিক যাত্রায় তিনি থেকেছেন। শেষের দিকে এসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেও রাজনীতির খবর রাখতেন। মাঝেমধ্যেই আমার কাছে ফোন করে রাজনীতির খবর জানতে চাইতেন। তার বয়স যখন ৯০ বছর, তখনও তিনি খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করেছেন।

অধ্যাপক মোজাফফরের মৃত্যুতে আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। নতুন প্রজন্ম তাকে চেনে না এতে তাদের কোনো দোষ নেই। ইতিহাসের যে বিকৃতি ঘটেছে, ইতিহাসের ধারবাহিকতায় যে ছেদ ঘটেছে, যেখানে বঙ্গবন্ধুকে পর্যন্ত ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে অন্য কাউকে মানুষ মনে রাখবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। নতুন প্রজন্ম যদি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে চায় এবং একটা আধুনিক উন্নত সমতাভিত্তিক দেশ গড়তে চায়, তাহলে অবশ্যই অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে স্মরণে রাখতে হবে। তার নীতি-আদর্শের পাশাপাশি নৈতিক, রাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।