দেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্তের পর এখন পর্যন্ত দফায় দফায় সাধারণ ছুটি ও লকডাউন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। লকডাউন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রথমদিকে সরকার কিছুটা কঠোর ছিল। পরবর্তী সময়ে জীবন-জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির কথা চিন্তা করে একাধিকবার ঢিলেঢালাভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এটা সত্য যে, লকডাউন করোনার সংক্রমণ সাময়িকভাবে কমিয়ে আনতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বরং এতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিগত সময়ে দেশে-বিদেশে লকডাউন চালু থাকায় অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, অসংখ্য মানুষ কাজ হারিয়েছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
কয়েক মাস ধরে করোনা সংক্রমণের মধ্যেও আমাদের দেশে অর্থনৈতিক কার্যক্রম প্রায় স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু গত এপ্রিলে ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেয়। একই সময় বাংলাদেশেও সংক্রমণের হার বেড়ে যায়। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার লকডাউন ঘোষণা করে। প্রায় এক মাস ঢিলেঢালাভাবে লকডাউন চলে। এতে করোনা সংক্রমণও কমে আসে। গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে দেশে করোনার সংক্রমণ বেশ ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানীর পাশাপাশি রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ প্রায় সব অঞ্চলেই করোনার সংক্রমণ বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১ জুলাই থেকে কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।
এবারের লকডাউনের পরিপ্রেক্ষিত আগের লকডাউনের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। কাজেই এর ক্ষতির দিকটিও আগের তুলনায় ভিন্নতর। আগের লকডাউনগুলো ছিল মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। আর ঢাকার বাইরের উচ্চ সংক্রমিত অঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি উন্নয়নে এবারের লকডাউন দেওয়া হয়েছে। বিগত এক মাস ধরে যে লকডাউন চলছিল এর খুব বেশি প্রভাব ঢাকায় দেখা যায়নি। কারণ, ঢাকায় প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল ছিল। এখন যেহেতু জাতীয়ভাবে লকডাউন দেওয়া হয়েছে, আর গোটা দেশের অর্থনীতি যেহেতু ঢাকাকেন্দ্রিক, কাজেই চলতি লকডাউনের প্রভাব ঢাকায় দৃশ্যমান হবে। চলতি সাত দিনের লকডাউন বাস্তবায়নে সরকার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও রপ্তানিমুখী কার্যক্রম কঠোর বিধিনিষেধের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। কাজেই যে কঠোর লকডাউনের কথা বলা হচ্ছে, তা কতখানি বাস্তবায়ন হবে সে ব্যাপারে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। যদি কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন না হয় তাহলে অর্থনীতির খুব বেশি ক্ষতি হবে না। তবে অন্যান্য অফিস-আদালত যেহেতু বন্ধ রাখা হয়েছে, এর কিছুটা প্রভাব তো পড়বে।

দেশে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ রোধে প্রথমবার যে লকডাউন দেওয়া হয়েছিল, তাতে সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। চলমান লকডাউনে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও রপ্তানিমুখী কার্যক্রম চালু রয়েছে। রপ্তানিমুখী কার্যক্রম চালু রাখতে ব্যাংক খোলা রাখতে হচ্ছে, পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক চলছে, আমদানি-রপ্তানির কাজে সংশ্নিষ্টরা বাইরে বের হচ্ছে। ফলে ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ কম পড়বে। কিন্তু লকডাউন দেশব্যাপী বলবৎ থাকায় ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়বে। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, চলমান লকডাউন আমের বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ইতোমধ্যে রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষিদের দুর্দশা আমরা দেখেছি। এখন রংপুরের হাঁড়িভাঙা আম পাকার সময়। হাঁড়িভাঙার বড় বাজার ঢাকা। কিন্তু এই সময় লকডাউন শুরু হওয়ায় মানুষ বাইরে বের হতে পারছে না। এতে আমদানি ও বিক্রি কমেছে। এসব আম সংরক্ষণেরও কোনো উপায় নেই। ফলে যারা আমের বাগানে বিনিয়োগ করেছিলেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
কয়েকদিন পর আসছে ঈদুল আজহা। আমরা জানি, এই ঈদকে সামনে রেখে দেশব্যাপী লাখ লাখ খামারি গরু মোটাতাজা করে থাকেন। এসব গরু এবার তারা প্রত্যাশিত দামে বিক্রি করতে পারবেন না। এমনকি দাম কমিয়েও পর্যাপ্ত সংখ্যক গরু বিক্রি করা যাবে না। এতে হয়তো তাদের খুব বেশি লোকসান হবে না, তারা পরবর্তী সময়ে নিয়মিত দামে গরু বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু তারা যে লাভের আশায় বছর ধরে গরুগুলো পালন করছেন সেই কাঙ্ক্ষিত লাভ পাবেন না। এই লকডাউনে সবচেয়ে বেশি লোকসানে পড়তে পারে ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। কোরবানির ঈদের আগে প্রতিবছর লাখ লাখ ফ্রিজ, টিভিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্যের চাহিদা থাকে। ঈদ সামনে রেখে গ্রাহক এসব পণ্য কেনার পরিকল্পনা আগেই করে থাকেন। লকডাউনের কারণে এবার সেই মাত্রায় এ ধরনের পণ্য বিক্রি নাও হতে পারে। তেমনিভাবে দেশীয় বাজারে পোশাক ও জুতার মতো পণ্য বিক্রিও কম হবে। পর্যটন খাতও লোকসানে পড়বে। আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে যেসব আর্থিক কর্মকাণ্ড ঘটত, সেগুলোও মুখ থুবড়ে পড়বে। এতে দুধ, ডিম ও মুরগির দাম কমবে। উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। করোনা শুরুর পর এর একাধিক ঢেউ আমরা দেখলাম। গত এপ্রিলে দ্বিতীয় এবং বর্তমানে তৃতীয় ঢেউ বিরাজমান। করোনার তৃতীয় ঢেউ এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, পর্যায়ক্রমে এর আরও ঢেউ আসতে থাকবে এবং পরবর্তী ঢেউগুলো আরও বেশি ভয়াবহ হতে পারে, যা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলছে, অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই অনিশ্চয়তা দূর না হলে- এক. মানুষ কেনাকাটা করবে না। এতে চাহিদা সৃষ্টি হবে না। দুই. মানুষ বিনিয়োগে আগ্রহ পাবে না। ফলে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না। তিন. বিদেশি বিনিয়োগও কমে যাবে। কারণ, তারা এখানে আসতে না পারলে বিনিয়োগ করবে কীভাবে? এতে আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি দুই ধরনের বিনিয়োগই ব্যাহত হবে।
এভাবে করোনা নতুন মাত্রায় সংক্রমণ ছড়াতে থাকলে, আর এর প্রতিকারে কয়েকদিন পর পর লকডাউন দিয়ে কোনো লাভ হবে না। বরং তাতে মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হবে, মানুষ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। এই অনিশ্চয়তা দূর করতে চাইলে আমাদের টিকাদান কর্মসূচি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এই কর্মসূচি যেমন দ্রুত চালাতে হবে, তেমনি এর প্রসারও বাড়াতে হবে। কিন্তু আমাদের হাতে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নেই। ভ্যাকসিন প্রদানের পরিকল্পনাও খুব বিস্তৃত নয়। কাজেই পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন আমদানি সাপেক্ষে ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষকে টিকা দিতে হবে। বিগত সময়ে আমরা গড়ে এক লাখ করে টিকা দিয়েছি। এখন এর আকার ২০ গুণ বাড়াতে হবে। ভারতে এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৮৭ লাখ টিকা দেওয়া হয়েছে। সেখানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫৫ লাখ থেকে ৬০ লাখ টিকা দেওয়া হচ্ছে। ভারতের জনসংখ্যা আমাদের দেশের তুলনায় প্রায় ৯ গুণ বেশি। সে অনুপাতে আমাদের প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৫ লাখ করে টিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে ভারতের হারে টিকা দিলে তাও যথেষ্ট হবে না। কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। আমরা জানি, ভারতে পর্যাপ্ত টিকা মজুদ আছে, তারা টিকাদান কর্মসূচি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
আমাদের জন্য ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচির প্রসার বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লোকবল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ থাকা যেমন বাঞ্ছনীয়, তেমনি টিকা গ্রহণে মানুষের আগ্রহ থাকাও জরুরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে মানুষ টিকা নিতে চাচ্ছে না, সেখানে টিকা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই বাস্তবতায় আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ টিকা গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। সরকারকে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। মানুষকে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী করতে হবে, মানুষের কাছে যেতে হবে, প্রয়োজনে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। একমাত্র টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা বিদ্যমান অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। সুতরাং, আমাদের সেদিকেই মনোনিবেশ করা উচিত।
নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট