প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হবে বলেই আমার কাছে মনে হয়। তিনি চলমান বিশ্ব বাস্তবতার এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন, যা শুধু বাংলাদেশের নয়; স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল এবং উন্নত বিশ্বের জন্যও জরুরি। তার ভাষণ বাংলাদেশকে বিশ্বে মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করেছে।

প্রথমত, তিনি কভিড-১৯ টিকার বৈষম্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। টিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বৈষম্য চলছে, তা শুধু বাংলাদেশকেই নয়, অন্য অনেক দেশকেও সংকটে ফেলেছে। কারণ, বিশ্বকে মহামারিমুক্ত করতে হলে সব দেশের সব মানুষের জন্য টিকাপ্রাপ্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মনের কথাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে প্রতিফলিত হয়েছে।
যেমন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২৪ কোটি ডোজ টিকা। এর সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে টিকার সহজলভ্যতা যেমন থাকতে হবে, তেমনি দেশেও উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

উন্নত বিশ্বকে তাই টিকা সরবরাহের পাশাপাশি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতেও টিকা উৎপাদনের যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটা সারাবিশ্বেই আলোচিত হচ্ছে। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই এ বিষয়টি অত্যন্ত জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তিনি কভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে দৃঢ় সক্ষমতা দেখিয়েছে, জীবন ও জীবিকার সমন্বয় করে মহামারি পরিস্থিতির সামাল দিয়েছে, সে বিষয়টিও সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্রটিও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উঠে এসেছে। কভিড-১৯ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তাই খুবই দূরদর্শী হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তিনি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানেও নতুন একটি বিষয় উঠে এসেছে। তিনি এবারের বক্তব্যে আসিয়ানের ভূমিকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বের কথাও আরও একবার স্মরণ করে দিয়েছেন। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আসিয়ানের অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের পর আসিয়ানের ভূমিকার বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। রোহিঙ্গা সংকট বয়ে বেড়ানো কিংবা এর সমাধান একা বাংলাদেশের দায় নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এর দায়িত্ব নিতে হবে, সে কথাটি জোর দিয়েই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন।

তৃতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী আরও একটি বড় আন্তর্জাতিক সমস্যার কথা বলেছেন। মহামারি পরিস্থিতিতে যেসব উন্নত দেশ স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ থেকে শ্রমশক্তি গ্রহণ করে, তাদের এ মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশসহ অনেক দেশ থেকে শ্রমশক্তি উন্নত দেশে যাচ্ছে। তারা একদিকে নিজের দেশে রেমিট্যান্স পাঠায়, আবার যে দেশে কাজ করে সেখানকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। অতএব, শ্রমশক্তি গ্রহণকারী দেশগুলোরও চলমান মহামারি পরিস্থিতিতে তাদের সুরক্ষার এবং কাজের নিশ্চয়তার দায়িত্ব নিতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের নয়, আরও অনেক দেশের দাবি। শেখ হাসিনা সেই বৈশ্বিক দাবিটিই জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন।

চতুর্থত, বর্তমান জটিল বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের আরও বিস্তৃত ও কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোই জাতিসংঘকে বেশি গুরুত্ব দেয়, মহামারি পরিস্থিতি মোকাবিলাসহ বৈশ্বিক নানা জটিলতা নিরসনে জাতিসংঘের আরও কার্যকর ভূমিকা আশা করে। তিনি এ বিষয়টি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের এবং বাংলাদেশের গুরুত্ব নিঃসন্দেহে বাড়িয়েছেন।

পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী যথাযথভাবেই তুলে ধরেছেন। তবে তার বক্তব্যে জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের মানুষের কর্মপ্রচেষ্টা, বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের যে সক্রিয় ভূমিকা, তা আরও বিস্তারিতভাবে উঠে এলে সেটা ভালো হতো। তবে শেখ হাসিনার বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবেই উঠে এসেছে।