ইংল্যান্ডের এক্স ফ্যাক্টর

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, লর্ডস থেকে

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

এই জোফরা আর্চারের জন্য ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে যে কাউকে বাদ দিয়ে দিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ। তারও আগে এই আর্চারের জন্যই ইসিবি (ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড) ভিনদেশিদের ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার যোগ্যতায় সংশোধন এনেছিল।

একজনের জন্য কেন একটি বোর্ডের এমন তোড়জোড়, কেন ফ্রেডির মতো ক্রিকেটারের এত তাড়না- সেটির দৃষ্টান্তই দেখিয়ে গেলেন ২৪ বছর বয়সী আর্চার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বয়সভিত্তিক দলে খেলা এই বার্বাডিয়ান পেসার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের জার্সিতে নিয়েছেন ২০ উইকেট, দেশটির বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক আসরে যা সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইয়ান বোথামের ১৯৯২-এর শিকার ১৬ উইকেট। কেবল উইকেটসংখ্যায় নয়, আর্চারের কার্যকারিতা বোঝা যাবে তার ম্যাচকেন্দ্রিক পারফরম্যান্সে তাকালে। তার ২০ উইকেটের মধ্যে একটিও চার বা পাঁচ উইকেট নেই; অর্থাৎ এক ম্যাচে ভালো করে অন্য তিন ম্যাচে উইকেটহীন থাকেননি।

একমাত্র ভারত ও পাকিস্তান ম্যাচ বাদে বাকি সবক'টিতেই নূন্যতম একটি করে উইকেট নিয়েছেন। প্রতি ম্যাচেই দলকে দিয়েছেন ব্রেক থ্রু। রান নিয়ন্ত্রণেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ১১ ইনিংসে ১০০.৫ ওভার বল করে রান দিয়েছেন মোটে ৪৬১, গড়ে ওভারপ্রতি ৪.৫৭ ইকোনমিতে। পুরো টুর্নামেন্টে করা ৬০৫ বলের মধ্যে ৩৭১টিতেই তার বলে কোনো রান নিতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা। এছাড়া গতিতেও আগুন ঝরিয়েছেন নিয়মিত। এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে গতিময় বল ঘণ্টায় ১৫৪ কিলোমিটার গতির যৌথ রেকর্ডে আছে তার ডেলিভারিও।

সব মিলিয়েই ম্যাচের পর ম্যাচ ইংল্যান্ডকে গতি, উইকেটশিকারে, রান নিয়ন্ত্রণে বড় সার্ভিস দিয়ে গেছেন ডানহাতি এ পেসার। অথচ এই আর্চার যে বিশ্বকাপ খেলতে পারবেন, বিশ্বকাপের এক মাস আগেও নিশ্চিত ছিল না। বার্বাডোজে জন্ম এবং বেড়ে ওঠার সুবাদে খেলতেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বয়সভিত্তিক দলে। তবে ক্যারিবীয় ক্রিকেটের অনিশ্চয়তায় ২০১৪ সালে চলে আসেন পিতৃভূমি ইংল্যান্ডে। এখানেই কাউন্টি ক্রিকেট আর বিশ্বজুড়ে চলা ফ্র্যাঞ্চাইজি টি২০ খেলে ইসিবির নজরে চলে আসেন। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলতে নামার আগে ব্যাটিং নিয়ে শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিল ইংলিশরা। কিন্তু বোলিংয়ে অভাব অনুভূত হচ্ছিল একজন এক্স-ফ্যাক্টরের।

ইংল্যান্ড কোচ ট্রেভর বেলিসসহ কোচিং স্টাফের অনেকে আর্চারকে এ ক্ষেত্রে সমাধান হিসেবে ধরে নেন। ইসিবির বিধি অনুসারে ইংল্যান্ডের বাইরে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটাররা তখনই দেশটির হয়ে খেলতে পারবেন, যখন ইউরোপিয়ান দেশটিতে তারা ৭ বছর অবস্থান করবেন। বিধিমতে আর্চারকে ইংল্যান্ড দলে নেওয়ার সুযোগ এ বছর ছিল না। কিন্তু তাকে নিতে ইসিবি এবং টিম ম্যানেজমেন্ট এতটাই মরিয়া হয়ে ওঠে যে সাত বছরের নিয়ম শিথিল করে তিন বছর করে ফেলা হয়। আর তাতেই এ বছরের মার্চে ইংল্যান্ডের জন্য খেলার উপযুক্ত হন আর্চার। তবে যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরপর বিশ্বকাপের মতো আসরে তাকে জাতীয় দলভুক্ত করে নেওয়াতে আপত্তি ছিল অনেকের। যে তালিকায় বিশ্বকাপের বোলিং সঙ্গী ক্রিস ওকস, মার্ক উডরাও ছিলেন।

বর্তমান ক্রিকেটারদের এই নেতিবাচক মনোভাবের কারণে সরাসরি তাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা দেয়নি ইসিবি। এপ্রিলের মাঝামাঝিতে বিশ্বকাপের প্রাথমিক দল ঘোষণা করে বলা হয়, যে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা হতে পারে এতে। আর্চারকে নেওয়া হয় মে মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তান সিরিজে। তিন ম্যাচ খেলে উইকেট অবশ্য তেমন একটা পাননি; তবে উইকেটসংখ্যা মাত্র তিন হলেও বলের লাইন-লেন্থ আর গতি দিয়ে নেতিবাচক মনোভাবযুক্ত ক্রিকেটারদেরও অনুকূলে নিয়ে আসেন।

ওই সময়ই ফ্লিনটফ তাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডভুক্ত করার দাবি জানিয়ে তার বদলে যে কাউকে বাদ দিয়ে দিতে পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত ডেভিড উইলিকে সরিয়ে জায়গা দেওয়া হয় আর্চারকে। প্রত্যাশার বিরাট চাপ এবং সতীর্থদের কারও কারও নেতিবাচক মনোভাবের যে অস্বস্তি, সেটি নিয়েই বিশ্বকাপ মাঠে নামেন তিনি। আর নেমেই বাজিমাত। ১১ ইনিংসে ২৩.০৫ গড়ে ২০ উইকেট, চলতি আসরে যা দ্বিতীয় সেরা। ইয়ন মরগানদের ফাইনালে ওঠার পথে বোলিংয়ের এক্স-ফ্যাক্টর নিশ্চিতভাবে আর্চারই।

বিষয় : খেলা ক্রিকেট ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ-২০১৯ ইংল্যান্ড