জন্মভূমিতে বিশ্বকাপ উদযাপন

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, লন্ডন থেকে

ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

ইংল্যান্ড মাতৃভূমি, তবুও সে মাতৃক্রোড়ে থাকেনি। শৈশব থেকেই সে যাযাবর। দেশে দেশে এবং মহাদেশ পরিভ্রমণ করে বেড়িয়েছে। শৈশব কেটেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজে, ক্যারিবিয়ান সাগরের নীল জলের সুধা উপভোগ করে। আট বছর থেকে শৈশবেই নতুন ঠিকানা নেয় ভারতে। এশিয়ায় ভারতীয় ভালোবাসায় সিক্ত হয়। যে দেশের মানুষ ক্রিকেট খায়, ক্রিকেটে ঘুমায়, ক্রিকেটে স্বপ্ন দেখে এবং ক্রিকেটে ধন্যমগ্ন তপস্যা করে সেখানেও চার বছরের বেশি থাকল না। মন তার উড়ূক্কু, সে উড়ে উড়ে বেড়ায়। সে নতুন ঠিকানা গড়ে ওসেনিয়া মহাদেশের অস্ট্রেলিয়ায়, মায়ের বোনের বাড়িতে। খালার বাড়ি ভালো লেগে যায় তার। এজন্য সবচেয়ে বেশি সময় অস্ট্রেলিয়াতেই থাকে; কিন্তু ভ্রমণের নেশা কখনই কাটাতে পারেনি।

মাঝে পাকিস্তান ও শ্রীলংকা এবং ভারত পরিভ্রমণ করে ২০১৫ সালে আবারও খালার বাড়ি অস্ট্রেলিয়ায় চার বছরের জন্য থিতু হয় সে। এই ৪৪ বছরে বিশ্বকে কম দেখা হয়নি তার। অবশেষে মায়ের ডাকে সাড়া দেওয়ার ইচ্ছা হয় তার। উড়ূক্কু মন ঘরমুখো করতে মাতৃভূমি ইংল্যান্ডও নতুন কৌশল আঁটে। স্বদেশের সাধনায় মুগ্ধ হয়ে সে ঘরমুখো হয়। তাও কি সহজে বশ করা যায়। ইয়ন মরগানের হাতে শোভাবর্ধন করে লর্ডসের ব্যালকনিতে যাওয়ার আগে কত নাটকই না মঞ্চায়ন হলো তার জন্য। ইংল্যান্ডে থাকবে না নিউজিল্যান্ডে যাবে, এ নিয়ে দোটানায়। নাটকের পর নাটক উপহার দিয়ে শেষে ইংলিশদের হয়। আর ক্রিকেট ইতিহাসে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের তালিকায় লেখা হয় ইংল্যান্ডের নাম, তার মাতৃভূমির নাম। এই পরিব্রাজক হলো বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি। যাকে পেলে দেশ-জাতি গর্বিত হয়। অহঙ্কারে সমর্থকদের বুক ফুলে ওঠে।

ইংল্যান্ডের স্বাগতিকতায় দ্বাদশ বিশ্বকাপ হয়ে গেল এবার। বৈশ্বিক এ টুর্নামেন্টে প্রথম তিন আসর বসেছিল ইংল্যান্ডে। ক্রিকেটের তীর্থ মক্কাখ্যাত লর্ডস থেকে ক্লাইভ লয়েড, কপিল দেব ও স্টিভ ওয়াহ বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি নিয়ে গেছেন দেশে। লর্ডসের রাজকীয় ব্যালকনিতে এই অধিনায়করা ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন। ক্রিকেটের জননীর সন্তানরা দর্শক হয়ে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছেন। চার দশকেরও বেশি সময়ের আক্ষেপ অবশেষে ঘুচল ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ট্রফি বিজয়ে।

ট্রফি নিয়ে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের পোজ। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

ইয়ন মরগান লর্ডসে সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরতেই ইংরেজ জাতি আবেগী হলে স্বপ্ন পূরণে। সোনার হরিণ বিশ্বকাপ ট্রফি জেতায় ইংল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ মরগানদের বার্তা পাঠালেন রাজপ্রাসাদ থেকে, 'প্রিন্স ফিলিপ ও আমার পক্ষ থেকে ইংল্যান্ড পুরুষ দলকে এমন রোমাঞ্চকর বিশ্বকাপ জয়ের জন্য উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছি।' রানী বলে কথা, অতিথি দলের জন্য তাই পাঠালেন সহমর্তিতার বার্তা, 'রানার্সআপ নিউজিল্যান্ডের জন্য সহমর্তিতা। তারা অত্যন্ত দায়িত্ব ও পরিশ্রমের সঙ্গে খেলাটি শেষ করেছে।' এই নিউজিল্যান্ডের অধিবাসী কিউইরাও তো তাকে রানী মানে।

ইংল্যান্ড ক্রিকেটের মাতৃভূমি হলেও দেশটির বহুজাতিক নাগরিকদের কাছে খুব বেশি পছন্দের খেলা নয়। ক্রিকেট এলিট শ্রেণির খেলা এবং দর্শকও এলিট। আমজনতার খেলা ফুটবল। টেনিস, রাগবি, অ্যাথলেটিক্স এবং রোয়িংয়েও ভক্ত বেশি। হয়তো সে কারণেই রোববার ফাইনাল জেতার পরও লন্ডন নির্ঘুম উদযাপনে কাটেনি। উপমহাদেশের মতো হাজারে হাজারে সমর্থক বিজয় উদযাপন মিছিল করেনি। দেশটির সংবাদপত্রের মাস্ট হেড সরিয়ে লেখা হয়নি ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন; বরং লর্ডসের আঙিনায় উন্মাদনা সীমাবদ্ধ ছিল।

তবে ভদ্রতার সীমা-পরিসীমা ঠিক রেখে ইংলিশদের খেলা উপভোগ করতে দেখা গেছে। উদযাপনেও একটা সীমারেখা মেনে চলে তারা। তবে গতকাল রানীর প্রাসাদ ভ্রমণ করে এসেছে সোনালি ট্রফি এবং তার বিজয়ী খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, কর্মকর্তা ও সংগঠকরা। বিশ্বকাপ উদ্বোধনের আগেও একবার রানীর কাছে গিয়েছিলেন। যদিও সেই যাওয়া আর এই যাওয়ায় যোজন যোজন পার্থক্য। এবার গেছে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের সেরা প্রজন্ম, যারা বহুজাতিক।

লন্ডনের প্রাচীন ক্রিকেট মাঠ ওভালেও গতকাল খানিক সময় কাটান বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্যরা। বিজয়ী দলকে হয়তো দেওয়া হবে সংবর্ধনা। হয়তো অনেক অনেক উপহার, শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসায় সিক্ত হবেন মরগানরা। গতকাল যেমন লন্ডনের বড় বড় বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপনের জায়গায় শোভা পেয়েছে বিশ্বকাপজয়ী দলের খেলোয়াড়দের ছবি, থেকে থেকে বিলবোর্ডগুলো জানিয়ে দিচ্ছে- ক্রিকেট ব্যাক হোম, 'উই আর চ্যাম্পিয়ন', আর স্লোগান- 'উই প্লিজড'।

বিষয় : খেলা ক্রিকেট ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ-২০১৯ ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন