বিপিএল গ্রাউন্ডস স্বত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আলী সেকান্দার

ছবি: ফাইল

বিসিবির আয়ের অন্যতম একটি উৎস গ্রাউন্ডসের স্পন্সর স্বত্ব বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ। আন্তর্জাতিক হোম সিরিজ এবং বিপিএলের গ্রাউন্ডসের স্পন্সর স্বত্ব বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা আয় করে বিসিবি। ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই দুই জায়গা থেকে ভালোই আয় হয়েছে বলে জানা গেছে। জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে উন্নতি এবং বিপিএলে জৌলুস বাড়ায় গত ক'বছরে গ্রাউন্ডস স্পন্সর স্বত্ব থেকে আয় আরও বাড়ার কথা। অথচ তা না হয়ে গত দুই বছরে আয় উল্টো কমে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি স্বত্ব নেওয়া প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রাপ্য টাকাও নির্ধারিত সময়ে আদায় হয়নি বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিছু বলতে রাজি হননি।

সমকালের হাতে আসা বিসিবির ডকুমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯- এই তিন বছরের জন্য ২৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় বিপিএলের গ্রাউন্ডস অ্যান্ড অফিসিয়াল স্পন্সরশিপ স্বত্ব যৌথভাবে পেয়েছে কে-স্পোর্টস ও ঢাকা কমিউনিকেশন্স। এর মধ্যে কে-স্পোর্টস পরিচিত প্রতিষ্ঠান হলেও ঢাকা কমিউনিকেশন্স নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। এই প্রতিষ্ঠান ঠিক কী কাজ করে, কোথায় এর কার্যালয় বা উদ্যোক্তা কারা- এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দালিলিক তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির নামে কোনো ওয়েবসাইটও নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাগজে-কলমে থাকা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত আছেন বিসিবির পরিচালক ও ফ্যাসিলিটিজ বিভাগের চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। তার সঙ্গে আছেন আরেকজন প্রভাবশালী পরিচালক। তবে বিসিবির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে এমন একজন নাম গোপন রাখার শর্তে বলেছেন, লোকমান হোসেন ভূঁইয়া ঢাকা কমিউনিকেশন্সের মালিক। গ্রাউন্ডস স্পন্সরশিপ স্বত্বের অংশ হওয়ার জন্য তিনি এই নাম জমা দিয়েছেন।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের বিপিএল পঞ্চম আসরের জন্য আট কোটি, ২০১৮ সালের (এ বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত) ষষ্ঠ আসরের জন্য আট কোটি ৩৫ লাখ এবং ২০১৯ সালের (৬ ডিসেম্বর শুরু হবে) সপ্তম আসরের জন্য আট কোটি ৬০ লাখ টাকায় গ্রাউন্ডস স্পন্সরশিপ স্বত্ব অনুমোদন দেয় বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ। এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া পঞ্চম ও ষষ্ঠ আসরের জন্য কে-স্পোর্টস ও ঢাকা কমিউনিকেশন্সের কাছ থেকে ১৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পাওয়ার কথা বিসিবির। এর মধ্যে ঠিক কত টাকা পাওয়া গেছে, তা সুনির্দিষ্ট কেউই বলতে পারছেন না। বিসিবি সিইও এ বিষয়ে বলতে চাননি। তবে একাধিক পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত মাত্র আট কোটি টাকা পেয়েছে বিসিবি।

কে-স্পোর্টসের সিইও ফাহাদ করিম অবশ্য পুরো টাকাই দিয়েছেন বলে দাবি করে বলেন, 'আমার কাছে শুধু এ বছরের টাকা পাবে বিসিবি।' মজার বিষয় হচ্ছে, গত বছর তিনি বিসিবিকে দুই কোটি টাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন গত বুধবার। আবার প্রশ্ন আছে অর্থের পরিমাণ নিয়েও। বিসিবির একজন পরিচালক জানান, বিপিএলের গ্রাউন্ডস স্পন্সর স্বত্ব ২০১৫ সালে ছিল ৯ কোটি টাকা। টুর্নামেন্টের জৌলুস বাড়ার পরও সেটা কমে কী করে, প্রশ্ন বোর্ড কর্মকর্তার। সবকিছু শুনে বিসিবি পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি বলেন, 'কত টাকায় চুক্তি হচ্ছে, আর কত টাকা পাওয়া যাচ্ছে, আমাদের তা জানানো হয় না। তবে যেটা শুনছি তাতে আমি বিস্মিত।'

শুধু বিপিএলই নয়, জাতীয় দলের ছয়টি হোম সিরিজ ১৭ কোটি টাকায় গ্রাউন্ডস স্পন্সর স্বত্বও যৌথভাবে নিয়েছে কে-স্পোর্টস ও ঢাকা কমিউনিকেশন্স। ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিসিবির সঙ্গে চুক্তি তাদের। এরই মধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক সিরিজ হয়ে গেছে। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হোম সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। গত মাসে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একটি টেস্ট এবং তিন জাতি টি-২০ সিরিজ খেলেছে। টি-২০ সিরিজটি ত্রিদেশীয় হওয়ায় ম্যাচ সংখ্যাও বেড়ে হয়েছে সাতটি। ফাইনাল ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ায় খেলা হয়েছে ছয়টি ম্যাচ। এই সিরিজটি ছিল আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-২০।

সেদিক থেকে অতিরিক্ত তিনটি ম্যাচের জন্য গ্রাউন্ডস স্পন্সরের টাকাও বেশি হওয়ার কথা। আন্তর্জাতিক এই তিনটি হোম সিরিজের জন্য এরই মধ্যে সাড়ে সাত কোটি টাকা পাওনা হয়ে গেছে কে-স্পোর্টস ও ঢাকা কমিউনিকেশন্সের কাছে। অথচ জাতীয় দলের গ্রাউন্ডস স্পন্সর স্বত্বের বিপরীতে কোনো ব্যাংক গ্যারান্টি বিসিবিকে দেননি বলে জানান ফাহাদ করিম। কেন দেননি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছেন, 'টাকা দিয়ে দিলে আর ব্যাংক গ্যারান্টির দরকার কী!' বাস্তবতা, বিসিবির দেওয়া বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল ব্যাংক গ্যারান্টি লাগবে।

২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ছয় সিরিজের জন্য ১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকায় মাত্রা এন্ড আর্ডেন্ট আন্তর্জাতিক সিরিজের গ্রাউন্ডস রাইটস নিয়েছিল। কে-স্পোর্টস ও ঢাকা কমিউনিকেশন্সের কাছে প্রকৃতই কত টাকায় জাতীয় দলের খেলার এই স্পন্সর স্বত্ব বিক্রি করা হয়েছে, বিসিবির কোনো পরিচালক জানেন না। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুসের কাছে এই তথ্য জানতে চাওয়া হলে বলেন, তার জানা নেই। বিপিএল এবং মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান বা সদস্য সচিবরা বলতে পারবেন। মজার ব্যাপার হলো, এই দুই বিভাগের দুই প্রধান কর্মকর্তা শেখ সোহেল ও ইসমাইল হায়দার মল্লিক দেশে নেই।

শেখ সোহেল বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল ও মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান। আর মল্লিক বিপিএলের সদস্য সচিব ও মার্কেটিং বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান। বিসিবি ফিন্যান্স কমিটিরও চেয়ারম্যান তিনি। তারা দু'জনই বিদেশে থাকায় গতকাল যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে গত বুধবার শেখ সোহেল থাইল্যান্ড থেকে ফোনে বলেছেন, 'বিসিবির টাকা কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। আমি তো জানি, সব চুক্তিই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া মেনে হয়। তবে জানি না, ব্যাংক গ্যারান্টি আছে কি নেই। যদি না থাকে, দেশে ফেরার পর আমার প্রথম কাজই হবে ব্যাংক গ্যারান্টি নেওয়া এবং বকেয়া টাকা আদায় করা।'

এ ব্যাপারে বিসিবির মার্কেটিং কমিটির সাবেক চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিপিএলের স্পন্সরগুলো বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল করে থাকে। কে-স্পোর্টস ও ঢাকা কমিউনিকেশন্সের সঙ্গে যখন চুক্তি হয় তখন বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন প্রায়ত পরিচালক আফজালুর রহমান সিনহা ও সদস্য সচিব ইসমাইল হায়দার মল্লিক। আর জাতীয় দলের চুক্তির সময় মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ সোহেল ও সহসভাপতি মল্লিক।

বিষয় : খেলা ক্রিকেট বাংলাদেশ বিপিএল গ্রাউন্ডস স্বত্ব