'ঘরে থাকাই সবার জন্য মঙ্গল'

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

--

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে এক এক করে দেশের সবকিছুই বন্ধের পথে। সরকারি অফিস-আদালতে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই কঠিন বাস্তবতায় খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সামনে জীবনের নূ্যনতম প্রয়োজন মেটানোই চ্যালেঞ্জ। দেশের এই মানুষগুলোর কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছেন ঘরবন্দি মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। গতকাল টেলিফোনে টি২০ অধিনায়কের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেন আলী সেকান্দার

সমকাল: বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রিকেট নিয়ে কী ভাবছেন?

মাহমুদুল্লাহ: আজই স্টোর থেকে কিটস ব্যাগ নামালাম। একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করলাম। 'হোম প্র্যাকটিসে'র প্রস্তুতি বলতে পারেন।

সমকাল: যেহেতু এরকম সময়ের মুখোমুখি কখনও হননি, মানসিক অবস্থা কী?

মাহমুদুল্লাহ: না, না, এরকম পরিস্থিতি জীবনে কখনও আসেনি। এই প্রথম একটানা এতদিন বাসায়। বাসা থেকে এক কদম বাইরে পা রাখিনি। বাসার নিচেও যাইনি। প্রয়োজনীয় জিনিস বাসার ওপরেই নিয়ে আসে, ওখান থেকে আমিও নিচ্ছি।

সমকাল: বিশ্বে খেলাধুলা নেই, একজন খেলোয়াড়ের জন্য কতটা মনবেদনার?

মাহমুদুল্লাহ: খুবই হতাশার। আগেই যেটা বললাম, কখনও এমন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি। বাস্তবতা বুঝতে পারছি, বসে থাকতে কেমন লাগে। খেলা না থাকলেও আগে কিছু না কিছু করেছি। নিজে রানিং, জিম করেছি, ব্যাটিং-বোলিং করেছি। বাইরে ব্যক্তিগত কাজ থাকলে সেটা করেছি। এখন এমন একটা পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। বাসায় থাকাটা সবার জন্যই মঙ্গলজনক। হতাশার। তবে আশা করি সবাই মিলে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চললে তাড়াতাড়ি করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি মিলবে।

সমকাল: ঘরে বসে কোনো প্রস্তুতি?

মাহমুদুল্লাহ: হ্যাঁ, করছি। ব্যাট নিয়ে শ্যাডো করছি। বাচ্চার সঙ্গে কিছুক্ষণ রুম ক্রিকেট খেলি। যতটুকু কাজকর্ম করা যায় ঘরের ভেতরে করার চেষ্টা করি। রানিং এবং ব্যান্ডের কাজ করি। এগুলোর থেকেও বড় বিষয় যেটা, খারাপ লাগে দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভেবে। আমার চলার সামর্থ্য আছে, বাসায় থাকতে পারছি। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষ, যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের কী হবে? খুব কষ্ট হয় ভাবলে, উনারা কীভাবে টিকে থাকবেন। আল্লাহ কেন এমন পরীক্ষার মধ্যে ফেলল? হয়তো বা আল্লাহই আমাদের একটা উপায় বের করে দেবেন সবার জন্য। তবুও খেটে খাওয়া মানুষের কথা ভেবে মনটা খারাপ থাকে। সারাক্ষণ চোখের সামনে খেটে খাওয়া মানুষের মুখগুলো ভাসে।

সমকাল: অফুরান সময়- বই পড়া বা অন্য কিছু করেন?

মাহমুদুল্লাহ: চেষ্টা করছি পরিবারকে সময় দিতে। স্বাভাবিক সময়ে আমরা তো অনেক ব্যস্ততার মধ্যে থাকি। এখন যেহেতু ওসব নেই, তাই বাচ্চার হোমওয়ার্কে পাশে থাকা, কার্টুন দেখা বা একটু গল্প করার চেষ্টা করি।

সমকাল: ক্রিকেট নিয়ে একটু কথা বলি, টি২০ বিশ্বকাপে নিয়ে বড় কোনো লক্ষ্য?

মাহমুদুল্লাহ: অবশ্যই, লক্ষ্য সবসময় উঁচু থাকা প্রয়োজন। লক্ষ্য বড় থাকলে কাছাকাছি যাওয়া যায়, লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। আর লক্ষ্য ছোট থাকলে, নিজেকে ছোট মনে করলে বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়। আমি বিশ্বাস করি, লক্ষ্যে অবিচল থাকা এবং সেটা নিয়ে কাজ করাও গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু খেলা বন্ধ, জানি না কবে ক্রিকেট ফিরবে। এ মুহূর্তে তাই বিশ্বকাপ নিয়ে খুব বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। এরপরও বলব, আমাদের দলের লক্ষ্য উঁচুতেই থাকবে।

সমকাল: কোচ বলছিলেন, টি২০ বিশ্বকাপ নিয়ে পরিকল্পনাগুলো করে রাখতে চান?

মাহমুদুল্লাহ: তা তো অবশ্যই। এর জন্যই তো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের জন্য কিছু কাজ দিয়েছেন। জিম ও ব্যান্ডের কাজগুলো ট্রেনার দিয়েছেন। কী কী কাজ ঘরে বসে করতে পারব, তার একটা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করতে থাকব। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যাতে সব ঠিকঠাক করতে পারি।

সমকাল: দেশের ক্রিকেটে মাঝে কিছুটা খারাপ সময় গেছে, বর্তমান দল নিয়ে কি উত্তরণ সম্ভব?

মাহমুদুল্লাহ: আমি খুবই আশাবাদী। যারা উদীয়মান তারকা আছে- আফিফ, নাঈম, হাসান মাহমুদ, নাসুম আহমেদ তারা সবাই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। আরও যে ক'জন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার আছে তাদের নিয়ে আমাদের দলে বেশ ভারসাম্য এসেছে। এটাও মানতে হবে, আমরা মাঝের পাঁচ-ছয় মাস সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারিনি। ক্রিকেটে এমন উত্থান-পতন থাকে। আমাদের অতীত ট্র্যাক রেকর্ড দেখেন- ২০১৫ ও ২০১৬ সালে খুব ভালো কয়েকটি সিরিজ জিতেছি। এরপর কিছুটা পড়ে গেলেও আবার গ্রাফ উপরে গেছে। এ রকম থাকবেই, আমরা যেন অধৈর্য না হই।

সমকাল: ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা কি কমে গেছে?

মাহমুদুল্লাহ: আমি এর সঙ্গে একমত নই। এখন খেলোয়াড়রা অনেক বেশি পেশাদার। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনেছে। জিম, রানিং সব সময় করে। এই বিষয়ে আপনার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। আমার দৃষ্টিতে খেলোয়াড়রা এখন অনেক বেশি দায়িত্বশীল।

সমকাল: বাংলাদেশে সবাই দ্রুত ফল চায়। হারতে দেখলেই সমালোচনার বান ডাকে। এই জিনিসগুলো আপনাদের ওপর কেমন চাপ তৈরি করে?

মাহমুদুল্লাহ: চাপের কিছু নেই। সর্বোচ্চ পর্যায়ে যখন দেশকে প্রতিনিধিত্ব করি- ভালো খেললে বাহ্বা পাওয়া যায়। গ্রাফ নেমে গেলে একটা সমালোচনা তো হবেই। এগুলো খেলার অবিচ্ছেদ্য। এসব মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। খেলায় কীভাবে উন্নতি করা যায় চিন্তাধারা সেভাবে হওয়া উচিত। কে কী বলল, কে সমালোচনা করল, এগুলো তো খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ভালো খেললে ভালো বলবে, খারাপ করলে খারাপ বললে। আমি নিজে এগুলো নিয়ে কখনও দুশ্চিন্তা করি না। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, যারা পারফরমার তাদের এই জিনিসগুলো মেনে নেওয়ার প্র্যাকটিস করতে হবে। এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

সমকাল: জীবনে অনেক কিছুই তো হঠাৎ করে আসে, যেমন আপনার টি২০ অধিনায়কত্ব পাওয়া, বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেবেন?

মাহমুদুল্লাহ: আমি নিশ্চিত না, বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেবো কিনা। দায়িত্ব পেলে অবশ্যই এটা আমার জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ হবে। দল গড়ে তোলা, ভালো কিছু অর্জন করার চ্যালেঞ্জ থাকবে। প্রাপ্তি তখনই হবে যখন দলের জন্য ভালো কিছু করতে পারব। দল দেশের জন্য ভালো ফল করলে তখনই প্রাপ্তি যোগ হবে। অবশ্যই অধিনায়ক হওয়া সম্মানের। সফল হব তখনই, যখন দেশের জন্য বড় কোনো ফল বয়ে আনতে পারব।

সমকাল: আপনি অন্তর্মুখীন না বহির্মুখীন অধিনায়ক, অর্থাৎ অন ও অফ ফিল্ড দুটোতেই সমান গুরুত্ব দেন?

মাহমুদুল্লাহ: মাঠের ভেতর ও বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা জগৎ। অধিনায়কের অনেক দায়িত্ব থাকে মাঠের বাইরে। খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণ করা, চাঙ্গা রাখা, পারফরম্যান্স আদায় করা অধিনায়কের কর্তব্য। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে কথা বলা, একজন খেলোয়াড় অধিনায়কের কাছ থেকে কী চায়, কী আশা করে ওই জিনিসগুলো বোঝা। আবার অধিনায়ক ওই খেলোয়াড়ের কাছ থেকে কী চাচ্ছে, ওই জিনিসটা খেলোয়াড়কে বোঝানোও অধিনায়কের দায়িত্ব। এই বোঝাপড়া প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে থাকলে এবং দলের ভেতরে স্বাস্থ্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলে দলের জন্য ভালো। আমি সব সময় ওভাবেই চিন্তা করি- দলের ভেতরে যেন সুন্দর পরিবেশ বজায় থাকে এবং স্বাস্থ্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে। তাতে দলের ও খেলোয়াড়ের মান ওপরের দিকে যাবে। এগুলোর নজরদারিতে রাখা অধিনায়কের জন্য অবশ্য করণীয়।

সমকাল: আপনি তো বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে দলে ঢুকেছেন, এখন বোলিং নেই, ব্যাটিং আছে?

মাহমুদুল্লাহ: আমি দলে স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলাম। প্রথম আট-নয় বছর নিয়মিত বোলিং করেছি। তখন দলে বোলিং অপশন কম ছিল। এখন দলে বেশ কয়েকজন স্পিন অলরাউন্ডার আছে। এ ছাড়া বিশ্বকাপের আগে আমার কাঁধে চোট পাওয়ায় বোলিং করতে পারিনি। ২০১৫ সালে ব্যাটিং অর্ডার প্রমোশন দেওয়া হয়েছিল, এসব কারণে বোলিংয়ে ফোকাসটা কমে যায়। ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দিতে হয়েছিল বেশি। আমি সব সময় নিজেকে ব্যাটিং অলরাউন্ডার মনে করি।

সমকাল: খারাপ সময়গুলো কী করে ম্যানেজ করেন?

মাহমুদুল্লাহ: জীবনে কঠিন সময় থাকবে। উত্থান-পতনের ভেরত দিয়ে যেতে হবে। সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এগুলোই ক্রিকেটিং চ্যালেঞ্জ। কঠিন সময়কে জয় করতে না পারলে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। ক্রিকেট খেলারও কোনো মানে হয় না। চ্যালেঞ্জ না থাকলে জীবন পানসে। চ্যালেঞ্জ থাকলেই বরং নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কার করায় আনন্দ আছে।

সমকাল: চাপে থাকলে চুপচাপ হতে দেখা যায় আপনাকে?

মাহমুদুল্লাহ: নীরব হয়ে যাই ঠিক তা নয়। আমি যখন খেলার ভেতরে থাকি তখন পুরোপুরি সেখানে ঢুকে যাই। বাইরের বিষয়গুলো দূরে রাখার চেষ্টা করি। সতীর্থদের সঙ্গে হয়তো দুষ্টামি করি। আমার মনে হয় দুটোর ভারসাম্য জানাটাও গুরুত্বপূর্ণ।

সমকাল: ড্রেসিংরুমের ঘটনা বাইরে এলে আপনার ওপর কতটা প্রভাব ফেলে?

মাহমুদুল্লাহ: আমার মনে হয় আমাদের দলটা বিশ্বের অন্যতম সুশৃঙ্খল। টিমমেটরা সবাই আন্তরিক। যে ঘটনাগুলো বাইরে এসেছে সেগুলোর কোনো সত্যতা ছিল না। সবই গুজব ছিল। আমরা টিমমেটদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। একজন আরেকজনকে যথেষ্ট সম্মান দিই এবং তার কাজকেও সম্মান করি।

সমকাল: আপনি ব্যক্তিগত রেকর্ডগুলোকে কোথায় দেখতে চান?

মাহমুদুল্লাহ: এগুলো নিয়ে খুব একটা চিন্তা করি না। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, পরের সিরিজে কতটুকু ভালো খেলতে পারব। সব সময় ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করি। ছোট ছোট লক্ষ্যে স্থির থাকার চেষ্টা করি। ধরেন, একটা সিরিজে ভালো করলে পরের সিরিজটা আরও কীভাবে ভালো হতে পারে, সেটা নিয়ে ভাবি। আশানুরূপ ভালো না হলে কীভাবে ছন্দে ফেরা যায়, সেটা নিয়ে ভাবি। এভাবে সিরিজ বা ম্যাচ ধরে ধরে চিন্তা করার পক্ষপাতী।

সমকাল: নিশ্চই সব ফরম্যাটে খেলতে চান?

মাহমুদুল্লাহ: আমি লড়াই করে যাব। আমি মনে করি, দল ও দেশকে এখনও অনেক কিছু দেওয়ার বাকি আছে।