পরিচয় দেওয়ার মতো বাস্তবে কোনো পেশাই নেই রুবেল আহম্মেদের। তবে তিনি চড়েন হেলিকপ্টারে। পরিচয় দেন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে। তহবিল সংগ্রহের কথা বলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের হাতে ধরা পড়ার পর তার এই মহাপ্রতারণার তথ্য বেরিয়ে আসে। রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

সিটিটিসি জানায়, প্রতারক রুবেল কিছুদিন একটি এনজিওতে চাকরি করেছেন। এরপরই প্রতারণার অভিনব কার্যক্রম শুরু করেন। নিজেকে কানাডিয়ান কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন নামে কথিত একটি সংস্থার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন তিনি। উত্তরায় একটি হোটেলের কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতেন। তার টার্গেটে ছিল বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিরা। বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিদের বলতেন, তার প্রতিষ্ঠানে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা, আশ্রয়হীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্প ও স্থানীয়ভাবে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ এসেছে।

এসব বলে বিভিন্ন এলাকার চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে সাহায্যপ্রার্থীদের নামের তালিকা নিতেন। যেসব জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক অবস্থা ভালো দেখতেন, তাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করতেন। সেই বৈঠকে বলা হতো, অর্থ ছাড়ের জন্য ব্যাংক ও এনজিও ব্যুরোকে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ দিতে হবে। এ জন্য তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো। অর্থ ছাড় করা গেলে বড় অঙ্কের কমিশন দেওয়ার আশ্বাসও দিত এই প্রতারক। এভাবে তিনি কুষ্টিয়া, মাগুরা ও খাগড়াছড়ি এলাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

সিটিটিসির ইকোনমিক ক্রাইম অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, জনপ্রতিনিধিদের আস্থা অর্জনের জন্য উত্তরায় বিলাসবহুল হোটেল কক্ষে বৈঠক করতেন প্রতারক রুবেল। বিভিন্ন জেলায় হেলিকপ্টার ভাড়া করে কথিত প্রকল্প পরিদর্শনে যেতেন। এভাবে আস্থা অর্জন করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যেতেন। তার বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া, মাগুরা ও খাগড়াছড়িতে প্রতারণার মামলা রয়েছে। রুবেলের বাড়ি শরীয়তপুর।

এই কর্মকর্তা বলেন, ওই প্রতারকের কাছ থেকে সাহায্যপ্রার্থীদের কথিত ফরম, নামের তালিকা, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার নামে তৈরি করা ভুয়া নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, প্রতারক রুবেল সম্প্রতি কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার ৩ নম্বর বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম পরিদর্শন করেন। সেখানে জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, দারিদ্র্যপীড়িত লোকের তালিকা তৈরি করেন। এ জন্য তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানান, তার কাছে ১৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকার একটি অনুদান রয়েছে। এ অনুদানের অর্থ দিয়ে সেই গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত ও দরিদ্র লোকদের আবাসন নির্মাণ, গভীর নলকূপ প্রদান, স্কুল নির্মাণ, নদীভাঙন রোধে রক্ষাবাঁধ নির্মাণ ও দুস্থদের চিকিৎসাসেবা দেবেন। জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার লোকজন তার কথায় আস্থা অর্জন করে এলাকার দরিদ্র পরিবারের মধ্যে ২০০ জনের একটি তালিকাও তৈরি করে দেন।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, আস্থা অর্জনের জন্য ওই প্রতারক প্রাথমিকভাবে খোকসায় কিছু ইট কেনেন এবং একটি জমি কেনার জন্য দেড় লাখ টাকা বায়না করেন। তিনি ওই এলাকায় তিনবার হেলিকপ্টারে গিয়ে পরিদর্শনও করেন। এসব কারণে মানুষ তাকে বিশ্বাস করে। বরাদ্দের টাকা ছাড় করাতে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি দুই দফায় তাকে ৪৩ লাখ টাকাও তুলে দেন। এরপরই রুবেল তার মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।