আল জাজিরা টেলিভিশনে সম্প্রতি প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে সামিউল আহমেদ খান ওরফে সামিকে উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদন প্রচারের পর সামিউলের নাম সামনে আসে। তবে প্রশ্ন হলো কে এই সামি? একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তার ব্যাপারে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।

গোয়েন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্নেষণ করে জানা যায়, অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে যুক্ত সামি। র‌্যাব কর্মকর্তা পরিচয়ে আর্থিক প্রতারণায় জড়িত থাকার ঘটনায় ২০০৬ সালে গ্রেপ্তারও হন তিনি। এ ছাড়া ২০২০ সালের মে মাসে র‌্যাবের একজন ডিএনডি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে রমনা থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলার ১১ জন আসামির মধ্যে ৬ নম্বর আসামি সামি। অপকর্মের জন্য তিনি সেনানিবাসে নিষিদ্ধও হন।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সামির প্রকৃত নাম সামিউল আহমেদ খান। তবে তথ্য গোপন করে সামিউল তার নামে যে পাসপোর্ট করেন, সেখানে তার নাম দেওয়া হয় জুলকার সায়ের খান। এমনকি পাসপোর্টে বাবার নামও বদলে ফেলেন সামি। তার বাবার প্রকৃত নাম আবদুল বাসেত খান। তিনি অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল। তবে পাসপোর্টে বাবার নাম বদলে সামিউল রেখেছেন- 'কর্নেল ওয়াসিত খান।'

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, মূলত পাসপোর্টে কোনো সেনা কর্মকর্তা তার র‌্যাঙ্কব্যাজ ব্যবহার করেন না। অনৈতিক সুবিধা নিতেই সামিউল তার পাসপোর্টে বাবার ভুয়া র‌্যাঙ্ক ব্যাজের পরিচয় দেন। অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মো. আবদুল বাসেত খানের চার সন্তানের মধ্যে সামিউল আহমেদ খান সবার বড়। তার জন্ম ১৯৮৪ সালে। ১৪ বছর বয়সে সামিউল মাকে হারান। এর দুই বছর পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। মা হারানোর পর থেকেই ভুল পথে পা বাড়াতে থাকেন। অপকর্মের জন্য ক্যাডেট কলেজ থেকে বহিস্কারও হন সামিউল। এরপর ভর্তি হন কুমিল্লার ইম্পাহানি স্কুলে।

গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে, ছোটবেলা থেকে নানা অপকর্মে জড়ান সামিউল। ১৭ বছর বয়সে তার বিরুদ্ধে একটি ট্রাকসুট চুরির অভিযোগ ওঠে। ১৭ ইসিবিতে কর্মরত তৎকালীন মেজর ওয়াদুদের বিদেশ থেকে আনা ওই ট্র্যাকসুট চুরি করে ধরা পড়েন তিনি। এরপর ২০০০ সালের জুলাই মাসে টাইগার অফিসার্স থেকে হাতির দাঁত চুরির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সেটি চট্টগ্রামে নিউমার্কেটের অঙ্গনা জুয়েলার্সে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েন তিনি। বাবার চাকরির সুবাদে নিজেকে কখনও সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, কখনও ক্যাপ্টেন হিসেবে পরিচয় দিতেন। এরপর ২০০১ সালের ২৮ ও ২৯ এপ্রিল ঢাকা সেনানিবাসে নিজেকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করেন তিনি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বন্ধু উৎপলের কাছে নিজেকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে প্রমাণ করতে বেল্ট, বুট ও র‌্যাঙ্ক ও ইউনিফর্ম কেনেন সামিউল। উৎপলের বাসা থেকেই সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরে ট্যাক্সিক্যাব দিয়ে সেনানিবাসসহ ঢাকার একটি পত্রিকা অফিস, ধানমন্ডির রাপা প্লাজা ও জাতীয় চিড়িয়াখানা ঘুরে জাহাঙ্গীর গেট হয়ে সিএমএইচে প্রবেশের সময় দুপুর ২টায় মিলিটারি পুলিশের (এমপি) হাতে ধরা পড়েন সামিউল। দু'দিন পর বাবা অঙ্গীকারনামা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনেন। এ ধরনের গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকায় ২০০২ সাল থেকেই সেনানিবাস ও সেনানিবাসের আওতাভুক্ত এলাকায় সামিউলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। তার কার্যকলাপ সেনাবাহিনীর জন্য অনাকাঙ্খিত ও সংবেদনশীল হওয়ায় তার ব্যাপারে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গোয়েন্দা তথ্যে আরও উঠে এসেছে, ২০০৬ সালের ২০ জুলাই র‌্যাব কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটের এ জে টেলিকমিউনিকেশন থেকে ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার মোবাইল ফোন কিনে একটি ভুয়া চেক দেন সামিউল। একইভাবে প্রাইজ ক্লাব নামক একটি কম্পিউটার ফার্ম থেকে ল্যাপটপ কেনা নিয়েও প্রতারণা করেন। চেক ডিজঅনারের অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব-১ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনার পর অনিয়ন্ত্রিত ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য সামিউলকে ত্যাজ্য করেন তার বাবা লে. কর্নেল (অব.) আবদুল বাসেত। ঠিক এর পরদিন কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসার পথে ২০০৬ সালের ২৩ জুলাই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন বাসেত।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত জীবনেও প্রতারক ছিলেন সামিউল। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এ ছাড়া একটি রাষ্ট্রের দূতাবাস কর্মকর্তা পরিচয়ে ওই দেশে ভিসা দেওয়ার কথা বলেও লাখ লাখ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ব্যবসায় যুক্ত করার কথা বলেও অনেকের কাছ থেকে অর্থ হাতান। শ্বশুরের টাকায় হাঙ্গেরিতে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করেন। এরপর জড়ান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে।

এ ছাড়াও গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে তরার অপচেষ্টার অভিযোগ আছে সামিউলের বিরুদ্ধে। গত বছরের মে মাসে বিভিন্ন ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, মহামারি করোনাভাইরাস সম্পর্কে গুজব, রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে ১১ জনের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করেন র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা। ওই মামলার ৬ নম্বর আসামি ছিলেন সামিউল। মামলায় তার নাম লেখা ছিল- জুলকার নাইন সায়ের খান। মামলার এজাহারে আরও বলা হয়- অভিযুক্তরা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধ করেছেন।

এ ছাড়া ‌‘আই অ্যাম বাংলাদেশি’ নামে একটি ফেসবুক পেইজট চালানোর অভিযোগে ১১ জনকে আসামি করে মামলা হয়। মামলার আসামিরা হলেন- সায়ের জুলকার নাইন, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ ও লেখক মুস্তাক আহমেদ, নেত্র নিউজের সাংবাদিক তাসনীম খলিল, সাহেদ আলম, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন, রাষ্ট্র চিন্তারকর্মী দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া ও মিনহাজ মান্নান।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে ওই মামলার প্রতিবাদে কলাম লিখেছিলেন বিতর্কিত ডেভিড বার্গম্যান। একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশকে টার্গেট করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে আল জাজিরা ওই প্রতিবেদন প্রচার করে।

পুলিশ জানায়, রমনা থানার মামলায় মাস খানেক এই মামলায় তিনজনকে আসামি করে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। তারা হলেন- আহমেদ কবির কিশোর, মুস্তাক আহমেদ ও দিদারুল ভূঁইয়া।

রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জহিরুল ইসলাম বলেন, সঠিক নাম-পরিচয় ও ঠিকানা সংগ্রহ করতে না পারায় জুলকার নাইনসহ ওই মামলার ৮ জনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত করা হয়েছে তিনজনকে।