দেশের ইতিহাসে যে কয়েকটি উগ্রপন্থি সংগঠন নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের জন্য কুখ্যাত তার মধ্যে অন্যতম হলো আনসার আল ইসলাম। এটি এক সময় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) হিসেবে পরিচিত ছিল। বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়, জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপন, ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুসহ কয়েকজন লেখক ও মুক্তমনা ব্যক্তির ওপর হামলার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ঢাকায় ইউএসএইড কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী মাহবুব তনয়কে হত্যা করে এই সংগঠনের সদস্যরা। দীর্ঘদিন বাহ্যিক কোনো ভয়ংকর অপারেশন না থাকলেও গোপনে আনসার আল ইসলামের কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
সমকালের অনুসন্ধানে অনেক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। উগ্রপন্থিদের কর্মকাণ্ডের ওপর এক যুগের বেশি নজর রাখছেন এমন একাধিক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা সমকালকে সংগঠনটির সর্বশেষ কার্যক্রম নিয়ে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তথ্যমতে, নতুনভাবে শায়েখ তামিম আল আদনানী নামে একজনের খোঁজ মিলেছে, যিনি প্রায় নিয়মিত অনলাইনে আনসার আল ইসলামের সদস্যদের উদ্দেশে জঙ্গি মনোভাবাপন্ন মতবাদ প্রচার করে আসছেন। সংগঠনের অপারেশনাল কমান্ডার পলাতক মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে দল গোছাচ্ছেন আদনানী। বর্তমানে আনসার আল ইসলাম দাওয়াতি কার্যক্রমের দিকে বেশি মনোযোগী। কাউকে হত্যার মিশন আপাতত তাদের নেই।
আনসার আল ইসলাম 'হোমগ্রোন' উগ্রপন্থি সংগঠন। আল কায়দার আদর্শ অনুসরণ করে থাকে। মূলত তিনটি কারণে এই সংগঠনটি অপারেশনাল কার্যক্রম আপাতত গুটিয়ে রেখেছে। একটি হলো- গুলশানে ২০১৬ সালে হলি আর্টিসানে হামলার পর প্রেক্ষাপট বদল। দুই- হলি আর্টিসানে হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশব্যাপী ধারাবাহিক অভিযান চালায়। এতে অনেক উগ্রপন্থি মারা যায়। শক্তি ক্ষয় হয় ব্যাপক। এতে আনসার আল ইসলামের মধ্যে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার হয়। তিন- এই সংগঠনটি প্রচার করে যে যারা আল্লাহ ও রাসুলের কটাক্ষকারী তাদের হত্যার অধিকার তাদের রয়েছে। তারা বলছে, ব্লগার লেখকদের মধ্যে যারা ইসলামের কটাক্ষকারী তাদের অনেকে এরই মধ্যে দেশ ছেড়েছেন। তাই তাদের সামনে তেমন কোনো টার্গেট নেই। মূলত এই তিনটি কারণে অপারেশনাল কার্যক্রমে নেই আনসার আল ইসলাম। তবে দাওয়াতি কার্যক্রমসহ সংগঠনের নানামুখী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে তারা।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিশেষ কয়েকটি অ্যাপসের মাধ্যমে সংগঠনটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে। নিজস্ব গ্রুপে প্রায় প্রতি মাসে বক্তব্য দিচ্ছেন জনৈক তামিম আল আদনানী। 'জিহাদের' গুরুত্বের কথা তুলে ধরছেন তিনি। নিজের চেহারা লুকিয়ে ভয়েস রেকর্ড প্রচার করা হচ্ছে। সর্বশেষ ইউটিউবে আদনানীর একটি বক্তব্য ৮ লাখ ৪২ হাজার জন দেখেছেন। এরই মধ্যে আদনানীর ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিচ্ছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। জানা গেছে, আদনানী তার সাংগঠনিক নাম। গোয়েন্দাদের এখন পর্যন্ত ধারণা- আদনানী নামে এই ব্যক্তি মাদ্রাসার সাবেক এক শিক্ষক। ধর্মীয় লাইনে তার কিছু পড়াশোনা রয়েছে। তবে যে কোনো যুক্তি নিজের মতো করে অন্যকে বোঝাতে পারঙ্গম। গোয়েন্দাদের এখন টার্গেট আদনানীর প্রকৃত নাম-পরিচয়, ঠিকানা বের করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা। যদিও আনসার আল ইসলামের আদর্শে যারা বিশ্বাস করে তাদের কাছে দেশে সংগঠনটির 'বড় নেতা' হিসেবে পরিচিত পলাতক জিয়া। তবে একাধিক দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সূত্র সমকালকে জানায়, সংগঠনে জিয়ার চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নন আদনানী। সমর্থক ও অনুসারীদের বিশ্বাস, জিয়া ও আদনানী সংগঠনের প্রধান দুই স্তম্ভ। নানা পর্যায়ে বর্তমানে এই সংগঠনে দুই শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে।
জঙ্গি তৎপরতার তথ্য রাখেন এমন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আনসার আল ইসলামের জন্ম জামা'আতুল মুসলিমিন বা আল জামাহ ওয়াততাকফির ওয়াল হিজরাহ নামক সংগঠন থেকে। প্রচলিত আছে, এর উৎস জর্ডানে। সংগঠনটির আমির ছিলেন আবু ইসা। তার সঙ্গে এক সময় ভালো যোগাযোগ ছিল ইজাজ আহমেদের। তিনি আরেক জঙ্গি সংগঠন জামা'আতুল মুজাহিদিন অব বাংলাদেশ-জেএমবির একাংশের আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের মেয়ের জামাই। ২০০৯ সালের দিকে ইজাজ পাকিস্তানে চলে যায় এবং সেখানকার এক মেয়েকে বিয়েও করে। ওই সময় সেখানে ইজাজ আল কায়দার তৎকালীন উপমহাদেশীয় নেতা আহমেদ ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। এরপর বাংলাদেশে যারা ইজাজ ও আবু ইসার অনুসারী ছিল তারা 'আনসার' নামে একটি পেজ ও ব্লগে তাদের মতাদর্শ প্রচার করতে থাকে। ২০১৩ সাল থেকে পেজ ও ব্লগটি 'আনসার আল ইসলাম' নামে পরিচিতি পায়। তবে ওই বছরই আর্থিক কিছু ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইজাজ ও ফারুকের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এরপর ইজাজ তার অনুসারীদের নিয়ে বিভক্ত হয়ে যায়। আনসার আল ইসলাম ছেড়ে নব্য জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হয়। আর ফারুকের নির্দেশনায় কাজ করে যায় আনসার আল ইসলামের মূল সদস্যরা। সংগঠনটি ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে খুনের মধ্য দিয়ে প্রথম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।
সূত্র বলছে, আনসার আল ইসলাম কয়েকটি উইংয়ের মধ্য দিয়ে তাদের কার্যক্রম চালায়। তা হলো- দায়ী বা দাওয়াতি বিভাগ, আশকারি বা মিডিয়া উইং, আইটি, ইন্টেলিজেন্স ও অপারেশন্স বিভাগ। যারা সংগঠনের আদর্শকে বিশ্বাস করে তাদের বলা হয় মাদু বা সমর্থক। এরপর প্রাথমিক পূর্ণ সদস্য। তাদের বলা হয়- ইখওয়াহ। ৪/৫ জন ইখওয়াহ মিলে তৈরি হয় তৈইফা বা সেল। একে মডিউল বা স্লিপার সেলও বলা হয়ে থাকে। প্রতি সেলে একজন দায়িত্বশীল বা মাসুল থাকে। ৩-৪টি সেল নিয়ে তৈরি হয় একেকটি সেকশন। সেকশন নিয়ে তৈরি হয় যে প্ল্যাটফর্ম তাকে বলা হয় মামুর। কয়েকজন মামুর মিলে তৈরি হয় হেড অব সেকশন। আনসার আল ইসলামের পুরো কার্যক্রম কাট-আউট পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। এক তৈইফার সদস্য আরেক তৈইফার সদস্যের ব্যাপারে কোনো তথ্য জানে না। কাউকে হত্যার জন্য টার্গেট করা হলে তার ব্যাপারে তথ্য আনসার আল ইসলামের ফতোয়া বোর্ডে পাঠানো হয়। ফতোয়া বোর্ড তাদের মতামত দিয়ে তা সুরা বোর্ডের কাছে পাঠায়। এরপর হত্যার জন্য সর্বশেষ কাজটি সম্পন্ন করে অপারেশনাল ইউনিট। এর আগে গোপন আস্তানায় রেখে হত্যা মিশন সফল করতে ট্রেনিং দেওয়া হয়। এই কাজটি নিজে সরাসরি তদারক করে আসছিলেন জিয়া।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) একজন কর্মকর্তা জানান, যারা সাধারণত জিয়ার মাধ্যমে আনসার আল ইসলামে যুক্ত হয়েছে বা কোনো একটি পর্যায়ে তার সংস্পর্শে এসেছে তাকে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনে করা হয়।
সর্বশেষ ২০১৬ সালে ধানমন্ডিতে জোড়া খুনের মধ্য দিয়ে আনসার আল ইসলাম একক হামলা চালালেও ২০১৮ সালের জুনে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে লেখক ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুর ঘটনায় তাদের নাম আসে। বাচ্চুর ঘটনার পর দেশে বড় ধরনের কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি। পরে বেরিয়ে আসে পুরাতন জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের সদস্যরা একত্র হয়ে ওই হামলা চালায়। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, আপাতত বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা কোনো জঙ্গি সংগঠনের না থাকলেও 'উপযুক্ত' পরিবেশ পেলে তারা যে কোনো সময় ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই আনসার আল ইসলামের মতো সংগঠনের ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।


মন্তব্য করুন