অস্তিত্বহীন ও কাগুজে দুই প্রতিষ্ঠানের নামে ভোজ্যতেলের কাঁচামাল আমদানি দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) ৭৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। মোস্তফা গ্রুপের এমএম ভেজিটেবল অয়েল প্রোডাক্টস থেকে বিডিবিএলে এলসি খুলে কাগুজে প্রতিষ্ঠান মেসার্স গ্লোব ইন্টারন্যাশনাল ও লুসিডা ট্রেডিংয়ের নামে কাঁচামালের এ সরবরাহ দেখানো হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে এই অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে।
চট্টগ্রামের মোস্তফা গ্রুপের সহযোগী কোম্পানি এমএম ভেজিটেবল অয়েল প্রোডাক্টস মূলত সয়াবিন ও পামঅয়েল রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান কারখানার কাঁচামাল আমদানির লক্ষ্যে প্রথমে বিডিবিএলে মোট ৭৯ কোটি ৫৫ লাখ সাত হাজার ৪২০ টাকার দুটি এলসি খোলে। ভোজ্যতেলের কাঁচামাল আমদানির জন্য তাদের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব ইন্টারন্যাশনাল ও লুসিডা ট্রেডিংকে এলসি দুটি দেয়।
পরে কাগুজে প্রতিষ্ঠান গ্লোব ইন্টারন্যাশনাল ২০১২ সালের ২১ জুলাই ট্রাস্ট ব্যাংক চট্টগ্রামের নেভাল শাখার ০৫৬৫১২৯৯০০১৫ নম্বর এলসির বিপরীতে ৫৪ কোটি ৩১ লাখ ৮৮ হাজার ১০০ টাকা মূল্যের এলসি খোলে। একই বছরের একই তারিখে ঢাকা ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখার ০৫৬৫১২৯৯০০১২ নম্বর এলসির বিপরীতে ২৫ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার ৩২০ টাকা মূল্যের এলসি খোলে আরেক কাগুজে প্রতিষ্ঠান লুসিডা ট্রেডিং।
দুদকের উপপরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান তদন্ত করে বিডিবিএলের অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর এ তথ্য পেয়েছেন। তার তদন্ত প্রতিবেদন এরই মধ্যে কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।
দুদকের তদন্ত থেকে জানা যায়, এমএম ভেজিটেবল বিডিবিএলে দুটি এলসি খুলে এই ব্যাংকটিকে জানিয়েছিল, তারা সয়াবিন ও পাম তেল রিফাইন করবে। তাই এসব তেলের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। এলসির বিপরীতে মালামাল আনা হবে গ্লোব ইন্টারন্যাশনাল ও লুসিডা ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে। এমএম ভেজিটেবল একটি এলসি গ্লোবকে ও অন্যটি লুসিডাকে দিয়েছে কাঁচামাল আনতে। এ দুই সরবরাহকারীকে যেদিন এলসি দুটি দেওয়া হয়, ভুয়া কাগজপত্রে তারা সেদিনই মালামাল সরবরাহ দেখায়।
পরে গ্লোব ও লুসিডা এসব কাগজপত্র ঢাকা ও ট্রাস্ট ব্যাংকে জমা দিয়ে জানায়, এমএম ভেজিটেবলকে মালামাল সরবরাহ করা হয়েছে। তারা এলসির বিপরীতে টাকা দাবি করে। তাদের দাবি অনুযায়ী ট্রাস্ট ও ঢাকা ব্যাংক গ্লোব ও লুসিডাকে অর্থ দেয়। পরে ব্যাংক দুটি গ্লোব ও লুসিডার কাগজপত্র বিডিবিএলে জমা দিয়ে সেগুলোকে দেওয়া অর্থ দাবি করে। এ সময় এমএম ভেজিটেবল বিডিবিএলকে জানায়, তারা মালামাল বুঝে পেয়েছে।
পরে বিডিবিএল থেকে ওই দুটি এলসির বিপরীতে মোট ৭৯ কোটি ৫৫ লাখ সাত হাজার ৪২০ টাকা ঢাকা ও ট্রাস্ট ব্যাংকে ট্রান্সফার করে। এরপর এমএম ভেজিটেবল ঢাকা ও ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে এই টাকা তুলে আত্মসাৎ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন উচ্চ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিডিবিএলে দুটি এলসি খোলা, মালামাল সরবরাহের জন্য গ্লোব ও লুসিডাকে এলসি দুটি দেওয়া, ঢাকা ও ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে এক দিনেই মালামাল আমদানি ও সরবরাহ দেখানো, এমএম ভেজিটেবলের মালামাল বুঝে পাওয়া, বিডিবিএল থেকে অর্থ ছাড় করার ঘটনা সবই ছিল সাজানো।
তিনি বলেন, ২০১২ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রায় ৯ বছরে এলসি দুটির বিপরীতে এমএম ভেজিটেবল বিডিবিএলের পাওনা টাকা পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা দণ্ডবিধি ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দুদক সূত্র জানায়, বিডিবিএলে খোলা এলসি দুটির বিপরীতে কোনো ধরনের জামানত নেই। এলসির বিপরীতে ব্যাংকে জমা দেওয়া সব কাগজপত্র ছিল জাল। বিদেশ থেকে কোনো মালামালও আনা হয়নি। কোম্পানি ছিল জাল, ডকুমেন্ট ছিল জাল। ট্রাস্ট ও ঢাকা ব্যাংকে এলসি খোলার দিনেই মালামাল যেন হাওয়া থেকে পাওয়া গিয়েছিল। তদন্তে গ্লোব ও লুসিডা নামের কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
দুদক জানায়, গত ১০-১২ বছর মোস্তফা গ্রুপের সব ধরনের উৎপাদন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তারা নিজেদের ব্যবসা বন্ধ করে জাল-জালিয়াতি করে ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের পথ বেছে নিয়েছে। মোস্তফা গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন মো. হেফাজুতুর রহমান। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে এমএম ভেজিটেবল অয়েল প্রোডাক্টসের পরিত্যক্ত কারখানা রয়েছে।
দুদকের তদন্তে আরও জানা যায়, রেকর্ডপত্রাদি বিশ্নেষণ ও সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়, মেসার্স গ্লোব ইন্টারন্যাশনাল ও লুসিডা ট্রেডিং মূলত মোস্তফা গ্রুপেরই কাগুজে প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে পত্র দিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির অস্তিত্ব নেই মর্মে জবাব পাওয়া গেছে। বিডিবিএল থেকে তিন সদস্যের টিম সরেজমিনে পরিদর্শন করেও প্রতিষ্ঠান দুটির অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি।
যে ট্রাকগুলোর মাধ্যমে ভোজ্যতেলের কাঁচামাল পরিবহন দেখানো হয়েছে, সেসবও ছিল ভুয়া। লিবার্টি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির ট্রাকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর যাচাই করতে চট্টগ্রাম বিআরটিএতে পত্র দেওয়া হলে সেখান থেকে জানানো হয়, ওইসব ট্রাকের রেজিস্ট্রেশন সঠিক নয়।
দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা সরেজমিনে লিবার্টি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। বিডিবিএল থেকে তিন সদস্যের টিম সরেজমিনে পরিদর্শন করেও এর অস্তিত্ব পায়নি। ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরি করে মালামাল দেওয়া-নেওয়া দেখিয়ে বিডিবিএল থেকে ওই টাকা ট্রাস্ট ও ঢাকা ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়েছিল। পরে ওই টাকা তুলে আত্মসাৎ করে পরিত্যক্ত এমএম ভেজিটেবল।

মন্তব্য করুন