চিকিৎসক কাজী সাবিরা রহমান লিপিকে তার পরিচিত কেউই নৃশংসভাবে খুন করেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত ওই হত্যাকাণ্ডে মামলা না হলেও তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সন্দেহের বাইরে নেই নিহতের স্বজনরাও। গতকাল সাবিরার ছেলেকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পারিবারিক কারণ ছাড়াও তার কর্মস্থলে কোনো ঝামেলা রয়েছে কিনা, সেটিও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।

সোমবার সকালে রাজধানীর কলাবাগানে প্রথম লেনের ৫০/১ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে সাবিরার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির প্রাথমিক ধারণা, রোববার মধ্যরাতে হত্যাকাণ্ডটি হতে পারে। তার গলা ও পিঠে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের ক্ষত রয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

সাবিরা গ্রিন লাইফ হাসপাতালের চিকিৎসক ছিলেন। তার ভাড়া ফ্ল্যাটটির দুটি কক্ষ সাবলেট দিয়ে একটি কক্ষে দ্বিতীয় সংসারের মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। তবে ঘটনার রাতে মেয়ে নানির বাসায় ছিল। তার প্রথম পক্ষের সংসারে ২১ বছর বয়সী ছেলে তাজোয়ার থাকেন নানির বাসাতেই।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বেশ কয়েকটি কারণ মাথায় রেখে তদন্ত চলছে। পারিবারিক বিষয়সহ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হচ্ছে। বাসার আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্নেষণ করা হচ্ছে।

কলাবাগান থানা পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত শেষে সাবিরার মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বজনদের মামলা করতে বলা হলেও রাত ৮টা পর্যন্ত কেউ মামলা করেননি। শুরুর দিকে সাবিরার স্বামী শামসুদ্দীন আজাদকে মামলার বাদী হতে বলা হয়েছিল। ডায়াবেটিসসহ শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে তিনি তাতে রাজি হননি। এরপর এক মামাকে বাদী হতে বলা হলেও ঢাকার বাইরে বসবাস করায় তিনিও রাজি হননি। মেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ছেলে তাজোয়ারকে বাদী হতে বলা হলেও শেষ পর্যন্ত নানা কারণে তিনি হননি। তবে লাশ দাফন করে পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে মামলা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সাবিরার মামাতো ভাই রেজাউল হাসান জুয়েল জানান, ময়নাতদন্ত ও দাফনের ব্যস্ততার কারণে মামলা করতে দেরি হচ্ছে।

পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার সাজ্জাদুর রহমান সমকালকে বলেন, মামলা না হলেও তদন্ত থেমে নেই। এখন পর্যন্ত তদন্তে মনে হচ্ছে, চিকিৎসক সাবিরার খুনি বা খুনিরা তার পরিচিতই। কারণ, ওই রাতে ফ্ল্যাটে তিনি যে একা ছিলেন, তা পরিচিত কেউ ছাড়া জানার কথা নয়। হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক বিষয়টি গুরুত্ব দিলেও আরও অনেক বিষয়ই তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সাবিরার চিকিৎসক স্বামী মারা যান। প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর ২০০৫ সালে তিনি ব্যাংক কর্মকর্তা শামসুদ্দীন আজাদকে বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে তার মনোমালিন্য থাকার কথা জানা যায়। তারা আলাদা বাসায় বসবাস করছিলেন।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে দূরত্বের কারণে সাবিরা অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন কিনা বা কর্মস্থলে কারও সঙ্গে কোনো বিরোধ রয়েছে কিনা, সেসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার দিন আটক সাবলেটের ভাড়াটে তরুণী কানিজ ফাতেমা, তার বন্ধু, বাড়ির দারোয়ান ও গৃহকর্মীকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু তথ্য মিলেছে। তারা এখনও পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

পুলিশের নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহেনশাহ মাহমুদ সমকালকে বলেন, তদন্তের স্বার্থে তারা অনেকের কাছ থেকেই তথ্য নিচ্ছেন। অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। ছেলে ছাড়াও অনেক স্বজনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত পরিবারের কেউ রাজি না হলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।