অনেকক্ষণ কথা বলার পর চোখ তুলে সরাসরি তাকালেন কাজল। বললেন, 'আমি প্রতিশোধ নিতেই ভিডিওটি ভাইরাল করেছি। চেয়েছি সবার সামনে টিকটক হৃদয়ের ভয়ংকর রূপটি প্রকাশ করে দিতে। আমার তো সব শেষ; যাতে আর কেউ এ রকমভাবে প্রতারিত না হয়।'
কাজল এই তরুণীর আসল নাম নয়। আমরাও তার আসল নাম প্রকাশ করতে চাই না। তবে কাজল নামেই তিনি পাচার হয়েছিলেন বেঙ্গালুরুতে। সৌভাগ্যক্রমে পালিয়ে ফিরতে পেরেছেন। আর দেশে আসার পর ঘটনাক্রমে তার হাতে চলে আসে ভারতের বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে নির্যাতনের ভয়াবহ ভিডিওটি। পরে তার হাত হয়েই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরই মধ্যে কাজলকে খুঁজে পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের হাতিরঝিল থানা পুলিশ। বুধবার সেখানে তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায় সমকাল। এ সময় অকপটে তিনি তুলে ধরেন প্রতারিত হয়ে পাচার ও পাচার-পরবর্তী রোমহর্ষক ঘটনা।
কাজল বলেন, 'হৃদয়ের চক্রে পড়ে নানা হাত ঘুরে বেঙ্গালুরু পর্যন্ত পৌঁছাই চলতি বছরের ১৯ মার্চ। এক মাস ১৮ দিন ভারতের নানা শহরের হোটেলে থাকতে হয়েছিল। কাজের কথা বলে বেঙ্গালুরুর বাসা থেকে নানা হোটেলে নেওয়া হয়। এমন কাজ করানো হয়, যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়লেও ভয়াবহ সেই নিপীড়ন চলতে থাকত। মনে হতো, এই জীবন এখনই শেষ করে দিই।'
"সাতক্ষীরা সীমান্ত হয়ে ভারতের ওপারে যাওয়ার পরই আমাকে একটি কার্ড দেওয়া হয়। সেটি 'আধারকার্ড' নামে পরিচিত। সেখানে আমার নাম লেখা ছিল কাজল। এর পর থেকে হৃদয়ের পরিচিত যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তারা ওই নামে আমাকে ডাকত। সীমান্তের ওপারে দুই রাত একজনের বাসায় রাখা হয়। বাসার ভেতর অন্ধকার। প্রথমে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই। যার বাসায় রাখা হয়েছিল, হৃদয় তাকে বলছিল- আমার সঙ্গে যেন 'খারাপ' কিছু করা হয়। এর পর কান্নাকাটি শুরু করি আমি। তবে ওই লোকের মন গলেনি। তখন বুঝলাম, ওরা এখন থেকে যা চাইবে আমাকে তা-ই করতে হবে। যে বাসায় রাখা হয়েছিল, সেখানে আরও একটি মেয়ে ছিল। আমি যাওয়ার এক দিন পর ওকে বেঙ্গালুরুতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন আমাকেও পাঠানো হলো। একটি পাঁচতলা বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে থাকতাম। বাইরে থেকে দরজা সব সময় বন্ধ করা থাকে। ওই ফ্ল্যাটে আরও অনেক মেয়ে ছিল। কয়েক দিন পরপরই তাদের আলাদাভাবে চেন্নাই, কেরালাসহ অনেক রাজ্যে পাঠানো হতো। 'কাজের জন্য' যখন অন্য রাজ্যে হোটেলে থাকার ডাক পড়ত, তখন সব মেয়ের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিত। সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের জন্য নেওয়া হতো। বেঙ্গালুরুর বাসা থেকে বের হওয়ার পর হোটেলে পৌঁছা পর্যন্ত ওদের লোক পাহারায় থাকত। হোটেলে থাকার সময় ঠিকমতো তিনবেলা খাবারও দেওয়া হতো না-" বলে চলেন কাজল।
ঢাকার শাহজাহানপুরে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন কাজল। এসএসসি পড়ূয়া এই তরুণী ২০১৯ সালের মার্চে এক বান্ধবীর সঙ্গে ঘুরতে হাতিরঝিলের মধুবাগ ব্রিজে যান। ওই বান্ধবীর বাসা মগবাজারে। ঘুরতে যাওয়ার পর তাদের সামনে পাঁচ-ছয়জন ছেলে আসে। তাদের মধ্যে এক ছেলে তার বান্ধবীর সঙ্গে কথা বলে। পরে জানতে পারেন, ওই ছেলের নাম রিফাদুল ইসলাম হৃদয়। সে ওই দিন কাজলের মোবাইল নম্বর ও ফেসবুক আইডি জানতে চাইলে সেটা দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। মাসখানেক পর বিক্রয়কর্মীর চাকরিপ্রার্থী হিসেবে বসুন্ধরা সিটিতে যান কাজল। সেখানে বিক্রয়কর্মীর চাকরির জন্য গেলে কাকতালীয়ভাবে তার সঙ্গে আবার দেখা হয় হৃদয়ের। ওই দিনও মোবাইল নম্বর ও ফেসবুক আইডি চাইলে তা হৃদয়কে জানান ওই তরুণী। এর পর মাঝেমধ্যে তাকে কল ও মেসেজ দিত হৃদয়। ২০২০ সালে ওই তরুণী মৌচাকে একটি বুটিকশপে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ নেন। পরিচয়ের সূত্র ধরে হৃদয় তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। সেটা প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। তবে মেসেঞ্জারে বন্ধু হিসেবে তাদের মধ্যে কথা হতো।
কাজল জানান, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হৃদয় ফতুল্লায় অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ডপার্কে 'টিকটক হ্যাংআউট পার্টি'র আয়োজন করে। তার আমন্ত্রণে ওই পার্টিতে যান তিনি। তখন হৃদয় অফার দেয়, বিদেশে ভালো বেতনে চাকরির সুযোগ রয়েছে। সেটা না করলে টিকটক তারকা হওয়ার পথ খোলা আছে। এর পর গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের আফরিন গার্ডেন রিসোর্টে আরেকটি পুল পার্টির আয়োজন করে হৃদয়। সেখানে ৭০০-৮০০ তরুণ-তরুণী অংশ নেয়। পার্টিতে সবাইকে মদ সরবরাহ করা হয়েছিল। কারও কাছ থেকে ফি নেওয়া হয়নি। এই পার্টিতে হৃদয়ের সহযোগী হিসেবে মারুফ, ইমাম, সম্রাট, আবিদ, সাইফুল ও ইমন ছিল।
'২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হৃদয় জানায়, কুষ্টিয়ায় একটি মাজারে টিকটক হ্যাংআউট পার্টির আয়োজন করা হচ্ছে। তার আগের দিন মেসেঞ্জারে হৃদয় বলে, সকাল ৭টায় বাস ছাড়বে। হৃদয়ের অনুরোধে কুষ্টিয়ায় তার সঙ্গে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হই। বাসে দু'জন ঢাকা ছাড়ি। পথে বাসের সুপারভাইজারের কাছে জিজ্ঞেস করি, কুষ্টিয়া পৌঁছাতে কত সময় লাগবে? তখন সুপারভাইজার জানান, বাস তো সাতক্ষীরা যাবে। হৃদয়ের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে সে জানায়, 'ভুল বাসে উঠেছি। তবে টেনশন করার দরকার নেই'- বলেন কাজল।
সাতক্ষীরা পৌঁছার পর মোটরসাইকেলে একজন আসে। সে হৃদয়ের সঙ্গে কিছু কথা বলে। এর পর ওই লোকের মোটরসাইকেলে তরুণীকে উঠে বসতে ইশারা করে হৃদয়। তখন সেখানে উঠতে অস্বীকৃতি জানালে তরুণীকে সে বলে, তার কাছে মাত্র তিনশ টাকা রয়েছে। হোটেলে থাকা সম্ভব নয়। এই লোক তার পরিচিত। আজ রাত তার বাসায় অবস্থান করে পরদিন টাকা ম্যানেজ করে কুষ্টিয়ায় রওনা হবে। ওই লোকের বাসায় ঢোকার পর সেখানে আরও তিন ছেলে ও একটি মেয়েকে দেখেন। পরদিন হৃদয় জানায়, অদূরে সীমান্ত। সেখানে ছবি তোলার সুন্দর জায়গা রয়েছে। জোরাজুরি করেই তরুণীকে সীমান্তে নিয়ে যায়। কিছু সময় হাঁটার পর সীমান্তে মোটরসাইকেলে দু'জন লোক আসে।
কাজলের ভাষ্য, "পরে জেনেছি, তাদের নাম মেহেদি হাসান বাবু ও মহিউদ্দিন। মোটরসাইকেল রেখে তারা দ্রুত হাঁটতে বলে। ১০-১৫ মিনিট হাঁটার পর অপরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়। সেখানে ছয়টি মেয়ে ছিল। আরও ৩০-৪০ মিনিট হাঁটার পর সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে আসার কথা তাদের কাছে জানতে পারি। তখন হৃদয়ের কাছে জানতে চাইলে সে বলে, 'বাংলাদেশে রয়েছি।' এর পর আরও দুই-তিন ঘণ্টা হাঁটার পর হৃদয় স্বীকার করে- আমরা ভারতে পৌঁছে গেছি। তখন ভয় পাই। সেখানে বকুল ওরফে ছোট খোকন নামে একজনের বাসায় রাখা হয়।"
সেউ বাসায় বকুল ও হৃদয় মিলে প্রথম তরুণীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। ওই বাসায় থাকা আরেক তরুণীকে অন্যরা নির্যাতন করে। রাতে নির্যাতনের শিকার তরুণীর কাছে সেই ভয়াবহ কাহিনি শোনেন কাজল। তিনি বলেন, 'তারা ভয় দেখায়- তাদের কথামতো না চললে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের দায়ে ২০ বছরের সাজা হবে।'
কাজল জানান, সেখানে দু'দিন থাকার পর তাকে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সে বেঙ্গালুরু পাঠানো হয়। এর পর তাকে চেন্নাইয়ের অহিও হোটেলে পাঠানো হবে- জানায় চক্রের সদস্য হৃদয়, সাগর ও সবুজ। সেখানে যেতে রাজি না হলে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয় তারা। বাসায় ডাক্তার এনে চারটি সেলাই দেওয়া হয়। কাঁদতে থাকলে ওই বাসায় রক্তাক্ত অবস্থায় তার ওপর শারীরিক নিপীড়ন চালানো হয়। নগ্ন ছবি এবং ভিডিও ধারণ করে রাখা হয়।
প্রথম যে তরুণীর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তার সঙ্গে বেঙ্গালুরুতে গিয়ে তার দেখা হয় বলে জানান কাজল। তিনি বলেন, ওই তরুণী বছর খানেক ধরে ভারতে রয়েছেন। বেঙ্গালুরুতে থাকা আরও দুই তরুণী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে তার সহায়তা চান। আগে থেকে অবস্থান করা তরুণী তাকে জানান, বেঙ্গালুরু থেকে কেরালায় আসতে তিনি সহায়তা করতে প্রস্তুত। হায়দরাবাদ থেকে পালিয়ে তিনিও কেরালায় গিয়ে তাদের সঙ্গে মিলিত হবেন। তবে ওই দুই তরুণী পালিয়ে কলকাতা হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। একইভাবে কাজলও বাংলাদেশে ফেরেন। এর বিনিময়ে ভারতীয় দালাল ও লাইনম্যানদের ৩০ হাজার রুপি দেন তিনি। বাংলাদেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ওই টাকা নিয়েছেন। এরপর নারী চক্রের হোতাদের কাছে খবর চলে যায়, তাদের পালাতে সহায়তা করেছেন ওই তরুণী। তার ওপর প্রতিশোধ নিতে ভয়ংকর নির্যাতনের ভিডিও করেন তারা।
কাজল বলেন, ঢাকায় আসার অনেক দিন পর বেঙ্গালুরুতে অবস্থান করা এক বাংলাদেশি তরুণীর কাছ থেকে প্রথম জানতে পারেন, যে তরুণীদের পালাতে সহায়তা করেছিল তার ওপর সেখানে ভয়ংকর নির্যাতন চালানো হয়েছে। এরপর তার কাছ থেকে সেই ভিডিও পাই। তখন মনে হয়েছে, হৃদয়ের একটা কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার। এরপর পরিচিত এক ভাইয়ের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিয়েছি। সেটি ভারত-বাংলাদেশে একসঙ্গে ভাইরাল হয়।
কাজল বলেন, 'ওরা বলত- সবাই তাদের কেনা। তাই ভাইরাল হওয়ার আগে তাদের টিকিটি প্রশাসনের কেউ স্পর্শ করেনি। ভিডিও ভাইরাল না করলে সবকিছু অন্ধকারে থাকত। ওরা বলত, চিটারি-বাটপারি করে পালালে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হবে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. শহীদুল্লাহ বলেন, শুধু এ চক্রটি এক হাজারের বেশি নারীকে পাচার করেছে। আরও যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। সাতক্ষীরা থেকে গতকাল মেহেদী হাসান বাবু, মহিউদ্দিন ও আব্দুল কাদের নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হাফিজ আল ফারুক সমকালকে বলেন, 'পিস হিসেবে গণনা করেই সীমান্তে ইয়াবা পাচার হয়। একই আদলে তরুণীদের হাত বদলের সময়ও চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, আজ কত পিস এপার থেকে ওপারে গেল। এরপর সে অনুযায়ী জনপ্রতি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে তারা। নারী পাচারকারীরা রক্ত-মাংসের মানুষকে বিক্রয়যোগ্য বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে। বেঙ্গালুরু থেকে ফিরতে পেরেছেন এমন আরও কয়েকজনকে কাউন্সেলিং করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে এনে আইনি সহায়তা দেওয়া হবে।'
চারজন রিমান্ডে :নারী পাচার চক্রের 'মূল হোতা' ঝিনাইদহের আশরাফুল ইসলাম ওরফে বস রাফিসহ চারজনকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ইয়াসমিন আরা বুধবার এ আদেশ দেন। অপর তিন আসামি হলো- যশোরের সাহিদা বেগম ওরফে ম্যাডাম সাহিদা, ইসমাইল সরদার ও আবদুর রহমান শেখ।
এদিকে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, গতকাল ভারতীয় পুলিশের হাতে এ ঘটনার অন্যতম হোতা গ্রেপ্তার হয়। পরে পালানোর চেষ্টা করলে গুলিবিদ্ধ হয়।

মন্তব্য করুন