আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী এক যুবক। পরনে শার্ট-প্যান্ট। ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার কথা বলে সে ঢোকে বিভিন্ন বাসায়। এরপর গৃহকর্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে পালিয়ে যায়। রাজধানীর দক্ষিণখানে পরপর এমন পাঁচটি হামলায় আহত তিন নারীর মৃত্যু হয়। মারাত্মক আহত হন দু'জন। আরও কয়েকটি বাসায় একই কায়দায় হামলার উদ্দেশ্যে ঢুকলেও শেষ পর্যন্ত তার চেষ্টা সফল হয়নি। তদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ভয়ংকর এক সিরিয়াল কিলার একের পর এক এসব ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। এতে ওই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
সেই সিরিয়াল কিলারকে ধরতে শুরু হয় নানামুখী তৎপরতা। এক পর্যায়ে সিসিটিভির ফুটেজ দেখে তাকে চিহ্নিত করা হয়। সেই ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী হামলাকারীর রঙিন ছবিও আঁকিয়ে নেয় পুলিশ। পাঁচ বছর আগের এসব ঘটনাক্রম ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করলেও খুনিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থার তথ্য পেতেও গলদঘর্ম হতে হয়েছে। দক্ষিণখান থানা পুলিশ জানায়, মামলা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। তবে সিআইডি দাবি করে, মামলা তাদের কাছে আসেনি! অবশেষে আদালত সূত্রে জানা যায়, দুটি হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও অন্যান্য সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণখানের গাওয়াইর এলাকার ৭১৫/২ নম্বর বাসার মালিক ওয়াহিদা আক্তার সীমাকে হত্যা করে এক যুবক। এর পরই মূলত ক্রমিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টার বিষয়টি সামনে চলে আসে। এর আগে ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলে ভাবা হয়েছিল। সীমা হত্যাকাণ্ডের আগে ওই বছরের ২৪ জুলাই দক্ষিণখানের উত্তর গাওয়াইরে শাহিদা বেগমকে কুপিয়ে হত্যা এবং পরদিন ওই এলাকার আশকোনা মেডিকেল রোডে মাহিরা বেগমকে কুপিয়ে আহত করা হয়। এরপর ২১ আগস্ট তেঁতুলতলা এলাকার ইয়াছিন রোডে একই কায়দায় খুন হন সুমাইয়া বেগম। ৩১ আগস্ট মুন্সি মার্কেট এলাকায় জেবুন্নেছা চৌধুরীকে কুপিয়ে আহত করা হয়। প্রত্যেক ঘটনায় শুধু বাসার মালিক নারীদেরই টার্গেট করা হয়েছে। এ কারণে ধারণা করা হয়, কোনো কারণে বাড়ির মালিকদের প্রতি ওই যুবকের ক্ষোভ রয়েছে। তার মানসিক সুস্থতা নিয়েও সন্দেহ করে পুলিশ। তদন্ত সংশ্নিষ্টরা প্রথমে ধারণা করেন, সে দক্ষিণখান এলাকাতেই পালিয়ে আছে। তবে দীর্ঘদিনেও খোঁজ না পেয়ে পুলিশ জানায়, সে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।
মামলার খোঁজে ঘাটে ঘাটে :বিস্মৃতপ্রায় ঘটনাগুলোর মামলার খোঁজ করতে নেমে প্রথমেই দক্ষিণখান থানার বর্তমান ওসি সিকদার মো. শামীম হোসেনের সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি জানান, এগুলো তার দায়িত্ব নেওয়ার আগের ঘটনা হওয়ায় বিশেষ কিছু বলতে পারছেন না। তবে তার নির্দেশে ওই থানার এসআই মো. আরিফ তথ্যভান্ডার ঘেঁটে জানান, দুটি হত্যা মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ওয়াহিদা আক্তার সীমা ও সুমাইয়া বেগম হত্যা মামলা ২০১৭ সালেই ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
ওই সময় দক্ষিণখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শেখ রোকনুজ্জামান এখন রংপুরের মাহিগঞ্জ থানার ওসি। তিনি জানান, কুপিয়ে আহত করার কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও হত্যা মামলা হয়েছিল দুটি। পরে তা ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়।
সুমাইয়া হত্যা মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কবীর হোসেন এখন জামালপুরের ইসলামপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, মামলাটি ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
এর পরের ধাপে মামলাগুলোর হদিস পেতে সহায়তা করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম। তিনি জানান, বছর খানেক আগে মামলাগুলো সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে সিআইডির গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার আজাদ রহমান দাবি করেন, সিআইডির কাছে মামলা দুটি নেই। সেগুলো সম্ভবত ডিবির কাছেই রয়েছে। এরপর আবারও ডিবিতে খোঁজ নেওয়া হয়। তখন তারা সিআইডিতে মামলা পাঠানোর কথা পুনর্ব্যক্ত করে।
রহস্যেই থেকে গেল সিরিয়াল কিলার :পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে মামলার সন্ধান না পেয়ে শেষে আদালতের সংশ্নিষ্ট শাখায় খোঁজ নেওয়া হয়। দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, দুটি মামলারই ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিয়েছেন সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা। এর মধ্যে সুমাইয়া বেগম হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালত গ্রহণ করেছেন। আর ওয়াহিদা আক্তার সীমা হত্যা মামলার প্রতিবেদন জমা পড়লেও করোনা পরিস্থিতির কারণে এখনও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি আদালত।
সীমা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক প্রদীপ কুমার ঘোষ সমকালকে বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনা সত্য। তবে আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এ কারণে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। অপর মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট সিআইডির আরেক কর্মকর্তা দেন বলেও জানান তিনি।
এর ফলে রহস্যের অন্ধকারেই থেকে গেল জনমনে আতঙ্কের জন্ম দেওয়া সেই সিরিয়াল কিলার।


বিষয় : সিরিয়াল কিলার

মন্তব্য করুন