রাজধানীর পল্লবীতে গত ১৬ মে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে শিশুসন্তানের সামনে বাবা সাহিনুদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে দু'জন এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছে- এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয় সেসময়। সেই বিভৎস ভিডিওটি ছড়িয়ে সেটি নোয়াখালীর যতন সাহা হত্যাকাণ্ডের বলে প্রচার করছে কুচক্রিমহল। দেশে অরাজক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যেই ষড়যন্ত্রকারীরা ওই ভিডিওটি ভাইরাল করেছে বলে মনে করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। 

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে যড়যন্ত্রকারীরা সাহিনুদ্দিন হত্যাকাণ্ডের ভিডিওটি যতন সাহা খুনের বলে ভাইরাল করেছে। দেশে মুসলিম ও সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে বিভেদ ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই চক্রান্তকারীরা এই গুজব ছড়াচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নেওয়া হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার বিভাগের উপ-কমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া সমকালকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন লিংক থেকে ভিডিও পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে আমরা সতর্ক রয়েছি। গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে সাহিনুদ্দিনের সঙ্গে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক এমপি এম এ আউয়ালের দীর্ঘদিন বিরোধ চলছিল। বিরোধ মিটিয়ে দেওয়ার কথা বলে গত ১৬ মে বিকেলে সাহিনুদ্দিনকে মোবাইল ফোনে ডাকা হয় পল্লবীর ডি ব্লকে। ছয় বছরের ছেলেকে নিয়ে মোটরসাইকেলে সেখানে যান তিনি। এরপরই তাকে একটি বাড়ির গ্যারেজের ভেতর নিয়ে সন্তানের সামনেই কোপানো হয়। এক পর্যায়ে সেখান থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন তিনি। রাস্তার ওপর কুপিয়ে খুন নিশ্চিত করে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। তাতে দেখা যায়, দুই যুবক সাহিনুদ্দিনকে কুপিয়ে খুন নিশ্চিত করে। সাহিনুদ্দিনের পরনে ছিল পেস্ট কালারের পাঞ্জাবি ও সাদা পাজামা। যে দু'জনকে ভিডিওতে সাহিনুদ্দিনকে কোপাতে দেখা যায় তাদের শনাক্ত করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তারা হলো- মানিক ও মনির। পরে মানিক র‌্যাবের এবং মনির ডিবির সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' মারা যায়। এ দু'জন ছাড়াও হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে সাবেক এমপি আউয়ালসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে এবং পরবর্তীতে দেশের কয়েকটি জেলার পূজামণ্ডপে নাশকতা চালানো হয়। এর মধ্যে ১৫ অক্টোবর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি মন্দিরে হামলা চালানো হয়। এতে যতন সাহা নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এরপরই স্বার্থানেষী মহল সাহিনুদ্দিন হত্যাকাণ্ডের ভিডিওটি যতন সাহা হত্যাকাণ্ডের বলে গুজব ছড়ায়।

সমাজ বিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক জিয়া রহমান সমকালকে বলেন, 'ফেসবুক বা ইউটিউবে নানা ধরনের গুজব ভাইরাল হচ্ছে। যারা এ ধরনের কাজ করছে তারা থেমে নেই, একের পর এক গুজব ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতিরোধ করার কী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এটাও কিন্তু একটি পলিটিক্যাল ইস্যু। গুজবের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে হবে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ব্যবস্থা না করলে এ ধরনের কাজ থেমে থাকবে না। গুজবের ফলে যারা ভুক্তভোগী হচ্ছে তাদের রক্ষার জন্য জনমত তৈরি করা অতি জরুরি। সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি যদি এগিয়ে না আসে তাহলে সবাইকেই ঘটনার শিকার হতে হবে। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাদের কৌশল ও দক্ষতা বাড়াতে হবে।'