নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে শাহীরুল ইসলাম সিকদার নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে র‌্যাব -৪। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক ও বিভিন্ন জিনিসপত্র জব্দ করা হয়।

র‌্যাব জানায়, উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর শাহীরুল একটি পরিবহনে কন্ডাক্টর হিসেবে চাকরি করেন। পরে গড়ে তোলেন নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার নামে হাতিয়ে নেন বিপুল অর্থ। নতুন কৌশল হিসেবে শুরু করেন ফ্ল্যাট ও জমির ব্যবসা। এ ক্ষেত্রেও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফ্ল্যাট বা জমি বুঝিয়ে দেননি। উল্টো টাকা ফেরত চাইলে দিতেন হুমকি।

এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে শনিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সম্প্রতি সোলায়মান হোসেন নামে এক ব্যক্তিসহ কয়েকজন ভুক্তভোগী শাহীরুল ইসলাম সিকদারের বিরুদ্ধে র্যা বের কাছে অভিযোগ করেন। এর ভিত্তিতে র্যা বের গোয়েন্দা দল ছায়াতদন্ত শুরু করে। তদন্ত ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, শাহীরুল নিজেকে একটি কথিত মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যান্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

অভিযানে তার কাছ থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, একটি শটগান, একটি এয়ারগান, একটি এয়ার রাইফেল, ২৩৭ রাউন্ড গুলি, পাঁচটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি খালি খোসা, ২২টি কার্তুজ, চারটি চাকু, একটি লোহার স্টিক, তিনটি ডামি পিস্তল, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যান্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেডের মাধ্যমে চাকরির আবেদন ফরম, চুক্তিপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই, ব্যানার, প্যাড, স্ট্যাম্প, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, গোপন ক্যামেরা, পাসপোর্ট, ভিজিটিং কার্ড, আইডি কার্ড, নেমপ্লেট, বিভিন্ন নামিদামি ব্যক্তির সঙ্গে তোলা ছবি, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, পাসপোর্ট, মানি রিসিপ্ট বই, বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালপত্র জব্দ করা হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সৌখিন পরিবহনে কাজ করেন শাহীরুল। এরপর তিনি শুরু করেন নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহ। ২০১৪ সালে রামপুরা এলাকায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠান খুলে শুরু হয় প্রতারণা। অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হওয়ার লোভে তিনি প্রতিষ্ঠানের নামে অগণিত মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেন। একসময় প্রতারণার অভিযোগ আড়াল করতে তিনি অফিসের ঠিকানা পরিবর্তন করেন। 

নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি কথিত মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে সেগুলো প্রদর্শন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেকার ও শিক্ষিত বহু নারী-পুরুষকে সিকিউরিটি গার্ড, ড্রাইভার, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী, বিক্রয় কর্মকর্তা, লাইনম্যান ইত্যাদি হিসেবে চাকরি দেওয়ার নামে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

প্রতারণার কৌশল :বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের নামে চটকদার বিজ্ঞাপন দিতেন শাহীরুল। বেকার তরুণ-তরুণীরা বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে আবেদন করলে তাদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৫-২৫ হাজার টাকা জামানত হিসেবে নিতেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে নেওয়া হতো ৫-১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ, ইউনিফর্ম ও আনুষঙ্গিক খরচ হিসেবেও টাকা নেওয়া হতো। এভাবে অগণিত মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কয়েকজনকে নিয়োগ দিয়ে বাকিদের টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি। 

দীর্ঘদিন তার অফিস ও বাসায় ঘোরাঘুরির পরও চাকরি না পাওয়া ব্যক্তিরা টাকা ফেরত চাইলে তিনি অবৈধ অস্ত্র দিয়ে জীবননাশের হুমকি দিতেন। নিজেকে সরকারি কর্মকর্তা ও শুটিং ক্লাবের সদস্য বলেও পরিচয় দেন তিনি। ভুয়া পরিচয়ে চাঁদাবাজির অপরাধে তার নামে রামপুরা থানায় চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মামলা রয়েছে। 

তিনি হোমল্যান্ড হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের নামে কয়েকজনকে ফ্ল্যাট ও প্লট দেওয়ার কথা বলে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন। এ ছাড়া প্রতারণার উদ্দেশ্যে তিনি হোমল্যান্ড বেভারেজ অ্যান্ড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং মাদারল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠান চালু করেন। নিজেকে বাংলাদেশ আউটসোর্সিং অ্যান্ড পাওয়ার সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দেন তিনি। তবে তার কোনো প্রতিষ্ঠানই অনুমোদিত নয়।

এদিকে, তার বাসা-অফিস থেকে দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও প্রচুর গুলি পাওয়া গেলেও তিনি এ-সংক্রান্ত বৈধ কাগজ দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে রাখা তিনটি ডামি পিস্তলও পাওয়া গেছে।