পুলিশ সদর দপ্তরের নিচতলা। পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিট। মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ২টা। সবাই কাজে ব্যস্ত। এরই মধ্যে একটি ডেস্কে থাকা মোবাইল ফোনের রিং বেজে উঠল। ধরলেন এক নারী পুলিশ। বললেন- 'পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে ফোন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার সমস্যাটা বলুন!' অপর প্রান্তে এক নারী। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের একটি জেলার বাসিন্দা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পরিচয় দিয়ে বলেন, 'আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয়েছে। আইডি থেকে এক বন্ধুকে আমার কিছু ছবি পাঠিয়ে চাঁদা দাবি করছে। বিকেল ৫টার মধ্যে চাঁদার টাকা না দিলে আমার ছবি ভাইরাল করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি এখন কী করব?'

দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দিয়ে চাঁদা দাবি করার মেসেজের স্ক্রিনশটগুলো চাইলেন। বললেন- 'নিজের ঘনিষ্ঠ কারও ফেসবুক আইডি থেকে আমাদের ফেসবুক পেজের মেসেঞ্জারে তথ্যগুলো পাঠান। বিষয়টি আমরা দেখছি।'

গত মার্চ মাসে ঢাকা বিভাগের একটি জেলার কলেজছাত্রী শর্মীর (আসল নাম নয়) স্মার্টফোনটি নষ্ট হয়ে যায়। ফোনটিতে তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট লগ-ইন করা। কোনো কিছু না ভেবে পূর্ব পরিচিত এক দোকানে ফোনটি মেরামত করেন। কয়েক দিন পর শর্মীর ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে তাঁর পরিচিতদের কাছে আপত্তিকর ভিডিও ও মেসেজ পাঠানো হয়। বিষয়টি জানার পর তিনি যান মোবাইল ফোনের সার্ভিসিংয়ের সেই দোকানের মালিকের কাছে। তিনিও হুমকি দেন এবং টাকা দাবি করেন। শেষে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের শরণাপন্ন হন শর্মী। অনুসন্ধানে নেমে পুলিশ জানতে পারে মোবাইল সার্ভিসিং দোকানের মালিক ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলেননি। তবে তাঁর কাছ থেকে শর্মীর ছবি ও ভিডিও নিয়ে এক কলেজছাত্র ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে ব্ল্যাকমেইলিং করছেন। ওই কলেজছাত্র শর্মীর পূর্বপরিচিত।

পরে পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাড়ছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার। বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষের হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সাইবার অপরাধও। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ অন্য মাধ্যমগুলোতে অপরাধের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি সাইবার সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন তরুণীরা।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে 'পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন' নামে একটি ইউনিট করা হয়। উদ্বোধনের পর থেকে গত ৩১ মে পর্যন্ত দেড় বছরে এই ইউনিটের ফেসবুক পেজে ২৩ হাজার ১৭০টি মেসেজ, হটলাইন নম্বরে ৪১ হাজার ৭৫১টি কল এবং ৫৬০টি মেইল এসেছে। এ ছাড়া অনেকেই একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন এবং করছেন। ১৭ হাজার ৬১৭ জন নারী সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে যোগাযোগ করেছেন। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫৮৯ জন (৪৩ শতাংশ) ফেইক আইডি সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তাঁদের ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে মিথ্যা ও বেনামে আইডি খুলে ভুক্তভোগীর ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রচার করা হয়েছে। আইডি হ্যাকড সংক্রান্ত অভিযোগ করেছেন ২ হাজার ৮ জন (১১ শতাংশ)। ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে অভিযোগ করেছেন ২ হাজার ৯২৫ জন (১৬ শতাংশ)। তাঁদের ছবি ও ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে কোনো সুবিধা আদায় বা টাকা দাবি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বেশিরভাগই ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচত। এ ছাড়া মোবাইল ফোন হ্যারেসমেন্ট সংক্রান্ত ১ হাজার ৯৪৫ জন (১১ শতাংশ), আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো সংক্রান্ত ১ হাজার ৪৬৪ জন (৯ শতাংশ) এবং অন্যান্য বিষয়ে শিকার হয়ে ১ হাজার ৬৮৬ জন (১০ শতাংশ) নারী অভিযোগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার ৬৪৩ জন পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রদানে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে মোট ১১ হাজার ২৬৯ জনের অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাকি ৭০৫ জনের অভিযোগ তদন্তাধীন।

ঢাকার মৌমিতা (আসল নাম নয়) নামের কলেজ পড়ূয়া এক তরুণী ফেসবুক ব্যবহার করেন। ফেসবুক বন্ধুর তালিকায় অপরিচিতদেরও সংযুক্ত করতেন। গত মার্চে এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ফেসবুকে মৌমিতার পরিচয় হয়। পরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে রূপ নেয়। একপর্যায়ে তরুণীর কাছে অনৈতিক আবদার করে বসলে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি হয়। পরে মৌমিতা তাঁর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগমাধ্যম ব্লক করে দেন। কিছুদিন পর তাঁর ছবি ও মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করে তিনটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আপত্তিকর পোস্ট করতে থাকেন ওই ব্যক্তি। পরে মেয়েটি বিষয়টি জানার পর পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে যোগাযোগ করেন এবং প্রতিকার পান।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. কামরুজ্জামান সমকালকে বলেন, সাইবার জগতে হয়রানির শিকারদের বেশিরভাগই নারী। ইউনিটের নারী সদস্যরা তাঁদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (এল আই সি শাখা) মীর আবু তৌহিদ সমকালকে বলেন, এই সেবা চালু করা হয়েছে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের উদ্যোগে। যেসব নারী সাইবার জগতে বিভিন্ন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে অল উইমেন সাপোর্ট সেবা চালু করা হয়েছে। যেখানে ভুক্তভোগী নারীরা পুলিশের নারী সদস্যদের কাছে নির্বিঘ্নে তাঁদের সমস্যার কথা বলতে পারেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত সহায়তা নিতে পারেন। এই সার্ভিস চালু করার পর থেকে অভূতপূর্ব সাড়া এসেছে এবং আসছে। নারীদের এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে অন্যান্য জায়গার মতো সাইবার জগতকেও সুরক্ষিত রাখার জন্য পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সেবা বদ্ধপরিকর।