রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের (আরএসআরএম) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুর রহমানকে রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। 

বুধবার রাতে এ অভিযান চালানো হয়। র‌্যাব বলছে, তিনি একজন শীর্ষ ঋণখেলাপি। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। সেই পরোয়ানামূলেই তাকে আটক করা হয়েছে।

র‌্যাব সূত্র জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাকসুদুর রহমানের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে রাত ১১টার দিকে গুলশান-২ নম্বর সেকশনের ১২২ নম্বর নম্বর সড়কের বাসায় অভিযান শুরু হয়। পরে রাত ১টার দিকে তাকে আটক করে র‌্যাব।  বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করা হবে।

সংশ্লিষ্ট  সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ইস্পাত খাতের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান রতনপুর গ্রুপ। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া গ্রুপটির বার্ষিক টার্নওভার ছিল প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। তাদের কর্মীসংখ্যা ছিল ৮০০। কিন্তু ৪০ কোটি টাকা বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের কারণে গ্রুপটির দু'টি কারখানার উৎপাদন এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। গ্রুপটির কাছে বর্তমানে ১০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার ঋণ আটকে আছে। এই পাওনা আদায়ে গ্রুপের কর্ণধারদের বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে সোনালী ব্যাংকের দুটি এনআই অ্যাক্ট মামলায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। এই গ্রুপের কাছে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে জনতা ব্যাংক লালদিঘী শাখার। এর মধ্যে মেসার্স মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেডের কাছে ৪০৯ কোটি, মেসার্স রতনপুর শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ৩১৩ কোটি ও এসএম স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের কাছে ৪৮২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

এর আগে জানুয়ারিতে আরএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাকসুদুর রহমানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত। 

জনতা ব্যাংকের ৩১২ কোটি ৮২ লাখ টাকা ঋণখেলাপির দায়ে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তখন ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তার পাসপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা করে জনতা ব্যাংক লিমিটেডের লালদীঘি ইস্ট কর্পোরেট শাখা। মামলার রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, মাকসুদুর রহমান একজন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। ২০১৯ সালে মাত্র দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুযোগে ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন অনেক খেলাপি। কিন্তু সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও তা নেননি বিবাদী।

এদিকে ২০১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রতিষ্ঠানটির স্থাবর সম্পত্তি নিলামে তুলতে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয় সোনালী ব্যাংক। গত ৫ জানুয়ারি পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- মেসার্স রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলসের কাছে সোনালী ব্যাংকের ২০১ কোটি ৪৩ লাখ ৫২ হাজার ৮৬৫ টাকা পাওনা খেলাপি হয়েছে। 

এই পাওনার বিপরীতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায় গ্রুপটির কারখানাসহ ১০০ শতক জমি বন্ধক রয়েছে। দীর্ঘদিনেও ঋণ পরিশোধ না করায় অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩ (সংশোধন ২০১০) এর ১২ ধারার বিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনাসহ এসব স্থাবর সম্পত্তি নিলামে তোলা হবে। এ ছাড়া অর্থ আদায়ে গ্রুপটির বিরুদ্ধে অর্থঋণ ও এনআই অ্যাক্টে মোট ১২টি মামলা করেছে ব্যাংকটি।

চট্টগ্রামভিত্তিক আরএসআরএম গ্রুপের দুটি ইস্পাত কারখানার উৎপাদন এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর গ্রুপটির দু'টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর স্টক এপচেঞ্জে চিঠি দিয়ে আরএসআরএমের দুটি কারখানা উৎপাদনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। তখন তাদের শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ৩৮ টাকায় পৌঁছে। এই সুযোগে আরএসআরএমের কর্ণধার তাদের কাছে থাকা ২০ লাখ শেয়ার বিক্রি করে দেন।