রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা কারওয়ান বাজার। দিনে-রাতে এ বাজার ঘিরে থাকে জনস্রোত। এই এলাকা ঘিরে সরকারি-বেসরকারি প্রচুর অফিস রয়েছে। আবার রাত যত গভীর হয়, কারওয়ান বাজারে নানা পণ্যের পাইকারি বেচাকেনা জমে ওঠে। আর এই বাজার এলাকা একটি বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। দিনে তারা টানা পার্টি ও ছিনতাই চক্রের সদস্য হিসেবে কাজ করে। আর রাত নামলেই যানবাহনকে টার্গেট করে ডাকাতিতে নামে। ভোলা, আলমগীর ও কালু গ্রুপের মাধ্যমে অন্তত ৬০-৭০ জন ওই এলাকায় প্রায় নিয়মিত ছিনতাই ও ডাকাতি করে আসছে। গত এক মাসে এসব গ্রুপের ৩০ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও থেমে নেই অপকর্ম।

গত ২০ জুলাই তানজিল পরিবহনের বাসে করে ফেরার সময় কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে এক ছিনতাইকারী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী পারিশা আক্তারের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। ধাওয়া করেও পারিশা ওই ছিনতাইকারীকে ধরতে পারেননি। তবে অল্প সময়ের মধ্যে একই এলাকায় আরেকজনের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর সময় তাকে ধরে ফেলেন। কৌশলে ওই ছিনতাইকারীর এক সহযোগীকেও আটক করা হয়। পরে দুই ছিনতাইকারীকে পুলিশের হাতে তুলে দেন ওই শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় অনেকেই পারিশার সাহসের প্রশংসা করেন।

ডিবির সহকারী কমিশনার হাসান মুহাম্মদ মুহতারিম বলেন, কারওয়ান বাজারসহ বেশ কিছু এলাকায় যারা ছিনতাই, টানা পার্টি ও ডাকাতি করছে- তাদের অনেকেই আমাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে এসেছে। এসব চক্রের কয়েকজন দলনেতাকে খুঁজছি। একটি গ্রুপের সূত্র ধরে আরও কয়েকজনকে ধরতে ধারাবাহিক অভিযান চলছে। অনেকে গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে জড়ায়। অনেক সময় টানা পার্টির সদস্যরা চাকু ও চাপাতিও সঙ্গে রাখে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পারিশার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে এরই মধ্যে আলমগীরের গ্রুপের সংশ্নিষ্টতা তাঁরা পেয়েছেন। আলমগীরের সহযোগী নূরে আলম, হৃদয় ও রাকিব জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। মোবাইল ফোন বন্ধ করে তারা গা-ঢাকায় দেওয়ায় তাদের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে এখনও পরিস্কার কোনো তথ্য পুলিশের কাছে নেই। পারিশার মোবাইল ফোনসেট উদ্ধারে পুলিশ এখন গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, ওই মোবাইলে তাঁর গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য রয়েছে।

পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক অপরাধ গ্রুপের কর্মকাণ্ড অভিনব। এখানে যেসব গ্রুপ ছিনতাই, টানা পার্টি ও ডাকাতি করছে- তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভোলা গ্রুপ। এর নেতৃত্বে রয়েছে মো. লোকমান হোসেন (৩০)। তার গ্রামের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জের পূর্ব চড়াইন এলাকায়। তবে সে ভোলা গ্রুপ নামে পরিচিত। তার সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে রাব্বি মোল্লা, আসাদ মণ্ডল, রানা মিয়া, নামিম, হাসান শেখ, বাবু ও হাসান। এই এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকা আরও দুটি গ্রুপ হলো কালু ও আলমগীর গ্রুপ। কারওয়ান বাজার ও আশপাশ এলাকায় কে কোন সড়কের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা ভাগ করা আছে। কারওয়ান বাজার এলাকার মূল সড়কের নিয়ন্ত্রণ আলমগীরের সাঙ্গোপাঙ্গদের। এ ছাড়া কারওয়ান বাজার এলাকার ভেতরের অংশ, ফার্মগেট, বিজয় সরণির নিয়ন্ত্রণ ভোলা গ্রুপের হাতে। কালু গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে মাছের আড়ত, এফডিসি ও আশপাশের এলাকা।

প্রতিদিন সকালে প্রথমে অফিসমুখী মানুষকে টার্গেট করে পৃথকভাবে মাঠে নামে টানা পার্টি ও ছিনতাই চক্রের সদস্যরা। দলনেতা আশপাশে থেকেই টার্গেট বাছাই করে দেয়। টার্গেট ঠিক হওয়ার পর একই গ্রুপের সদস্যরা একটু দূরে অবস্থান নেয়। মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাইয়ের পর প্রথমজন ২০ গজের মতো দৌড়ে একই গ্রুপের আরেকজনের হাতে তুলে দেয়। ধরার পড়ার ভয়ে কেউ একাকী পুরো কাজটি সম্পন্ন করে না। এসব গ্রুপের সদস্যদের আরেকটি কমন বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো একটি সফল অপারেশনের পর সবাই একসঙ্গে বসে নির্জন এলাকায় মাদক সেবন করে। গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন ও ব্লু মরফিন এরা নিয়মিত সেবন করে থাকে। দিন-রাত মিলিয়ে কয়েক দফায় তারা দলবদ্ধ হয়ে এসব মাদক সেবন করে। রাত হলেই গ্রুপের সদস্য সবজি, মাছবাহী ট্রাক ও ভ্যান টার্গেট করে ডাকাতি করে থাকে।

ডিবি সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার রাতে তেজতুরীবাজার এলাকায় ট্রাক ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে হাতেনাতে অস্ত্রসহ ভোলা গ্রুপের দলনেতা লোকমান ও তার আট সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লোকমান স্বীকার করেছে, গত তিন মাসে তাদের বড় কাজের মধ্যে ছিল কারওয়ান বাজারে তিনটি পণ্যবাহী ট্রাকে ডাকাতি। এ ছাড়া দিনে প্রায় প্রতিদিন একাধিক ছিনতাইয়ে তার সঙ্গীরা জড়িত ছিল।

পুলিশ জানায়, এসব গ্রুপের মালপত্র কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় তারা বিক্রি করে। এর মধ্যে আছে গুলিস্তান, রাপা প্লাজা, সাভারের কয়েকটি মার্কেট। ঢাকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন টানা পার্টির মালপত্র কেনার হোতার নাম হলো টিপু ও সাজ্জাদ। চোরাই মাল কেনার পাশাপাশি মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডিকেন্দ্রিক তাদের নিজস্ব গ্রুপও রয়েছে। ওই গ্রুপের নাম 'হোন্ডা বাহিনী'।