কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় মারধরের শিকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক এ কে এম সাজ্জাদ হোসেন রাজধানীর শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। মঙ্গলবার রাতে শাহবাগ থানায় জিডি করেন তিনি। বুধবার সকালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। 

এ বিষয়ে সাজ্জাদ জানান, মঙ্গলবার রাতে জিডি করার পর আজ বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। পরিচালক আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি তদন্তের আহ্বান জানাবেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছেও এ বিষয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন। 

জিডির বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মওদুত হাওলাদার বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক মারধরের অভিযোগে জিডি করেছেন। আসামিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

এর আগে সোমবার রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় মারধরের শিকার হন সাজ্জাদ হোসেন। ভুক্তভোগী সাজ্জাদ হোসেন সমকালকে বলেন, ‘কলেজ লাইব্রেরিতে পড়াশোনা শেষে রাত সাড়ে নয়টার দিকে আমি শহীদ মিনারের দিকে যাই। সেখানে আমি একা একা বসে বাদাম খাচ্ছিলাম। তখন দেখি, দুই-তিন জন করে একেকটা দলে ভাগ হয়ে বেশ কয়েকজন ছেলে শহীদ মিনারে আগতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে, অনেককে সেখান থেকে উঠিয়ে দিচ্ছে। তারা কেন এটা করছিলো আমার জানা নেই। এক পর্যায়ে তিন জন এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি সেখানে কী করছি। আমি বললাম, 'আমি বসে আছি।' তখন তারা আমার পরিচয় জানতে চায়। আমি আমার পরিচয় দেওয়ার পরও তারা আমার পরিচয়পত্র দেখতে চায়। আমার কাছে পরিচয়পত্র নেই জানালে তারা আমাকে বলে, 'পরিচয়পত্র নেই কেন? আমাদের কাছে তো পরিচয়পত্র আছে।'  তখন আমি বললাম, 'সবাই কী সবসময় পরিচয়পত্র নিয়ে ঘোরে?' এই কথা বলার পর সঙ্গে সঙ্গে আমাকে একজন থাপ্পড় মেরে বসে। এরপর আরও দুই তিন জন এসে আমাকে চড়-থাপ্পর মারা শুরু করে।’

তিনি বলেন, ‘মারধরের একপর্যায়ে আমি চিৎকার করে বলে উঠি, 'আপনারা চাইলে আমার সঙ্গে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে আমার পরিচয়পত্র দেখে আসতে পারেন।' এই কথা বলার পর তারা হয়তো বুঝতে পারে যে, আমি ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র। আমি কাউকে ফোন দিয়ে এনে হয়তো ঝামেলা করতে পারি, এই ভয়ে তখন তারা আমাকে দ্রুত ওই স্থান থেকে বিদায় করার জন্যে তৎপর হয়ে ওঠে। আমি চলে যাওয়ার সময় যে পারছিল, সেই আমাকে মারধর করছিল এবং চলে যেতে জোর করছিল। ঠিক এই সময় কেউ একজন আমার কানের ওপর জোরে চড় দিলে আমি বসে পড়ি। বসে কেন পড়লাম, এজন্য একজন জুতা পায়ে আমার মুখে লাথি মারে। এ কারণে আমার নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়। এরপর আমি চলে যেতে উদ্যত হলে যাওয়ার পথে যে যেভাবে পেরেছে আমাকে মারধর করেছে রিকশায় ওঠার আগ পর্যন্ত। আমাকে ৮ থেকে ১০ জন মারধর করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিনতাই ছিল নাকি অন্যকিছু ছিল জানি না।’

মারধরকারীদের কেউ কেউ নেশাগ্রস্ত ছিল বলে উল্লেখ করে সাজ্জাদ বলেন, ‘আমাকে মারার সময় অনেকে শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারছিল না, পড়ে যাচ্ছিল। তাদের লক্ষণ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে, তারা নেশাগ্রস্ত। তাদের আচার-আচরণ স্বাভাবিক ছিল না।’

মারধরকারীদের কাউকে চিনতে পেরেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের প্রায় সবার গায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোওয়ালা টি-শার্ট ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তাদের পরিচয় জানা বা বোঝার উপায় ছিল না। তবে সবাই একটু হালকা পাতলা গড়নের ছিল।’ মারধরকারীদের টি-শার্টে তাদের কারও নাম বা হলের নাম লেখা ছিল কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই অবস্থায় আমি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোটা খেয়াল করতে পেরেছি। কারও নাম বা হলের নাম দেখার সুযোগ পাইনি। একজন সিলভার রঙের টি-শার্ট পরা ছিল ঢাবির লোগোওয়ালা। এর বেশি খেয়াল করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘মারধরের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গেলাম। কেস সিলসহ ইঞ্জুরি নোট লেখার পর আমাকে ইএন-এ রেফার করা হয়। চিকিৎসকরা জানান যে,  নাকের সেপ্টাম ইঞ্জুর্ড হয়েছে। মাড়িও কেটে গেছে দাঁতের। গালের পাশে ফুলে আছে। চোখ ডান পাশেরটা লাল হয়ে আছে। ডান কানে কম শুনছি। কান দেখে ডাক্তাররা বলেছেন, কানের পর্দায় 'ব্লিডিং স্পট' আছে। 'হিয়ারিং লস' আছে কি না বুঝতে অডিওগ্রাম করতে হবে। কিন্তু ছুটির দিন থাকার কারণে মঙ্গলবার এটি করা সম্ভব না। বুধবার করাতে হবে। অন্যদিকে, নাকে আঘাত লাগার কারণেও রক্তক্ষরণ হয়েছে।’