করোনাকাল

কিশোরগঞ্জে শেষ বিদায়ের কারিগর

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

করোনায় নিহতদের দাফন করছেন কিশোরগঞ্জের আল্লামা আনোয়ার শাহ (রহ.) ফাউন্ডেশনের কর্মীরা	- সমকাল

করোনায় নিহতদের দাফন করছেন কিশোরগঞ্জের আল্লামা আনোয়ার শাহ (রহ.) ফাউন্ডেশনের কর্মীরা - সমকাল

কিশোরগঞ্জে করোনার ভয় ও আতঙ্ককে জয় করে কভিড-১৯-এ মৃত্যু এবং করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীদের জানাজা ও লাশ দাফন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আল্লামা আনোয়ার শাহ (রহ.) ফাউন্ডেশন। সারাদেশে মারাত্মক ছোঁয়াচে করোনা রোগী মারা গেলে সর্বত্র ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করে। মৃত ব্যক্তির প্রিয়জন-আপনজন ভয় ও আতঙ্কের কারণে লাশের ধারেকাছে যেতে চায় না। ক্ষেত্রবিশেষে আপনজনও আক্রান্ত থাকায় করোনায় মারা যাওয়া প্রিয়জনের কাছে ইচ্ছা থাকলেও তাদের শেষ বিদায়ের সময় থাকতে পারছেন না। এমন রূঢ় বাস্তবতা আর অপারগতার মধ্যে করোনার মৃতদেহ সৎকারে ঝুঁকি নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন আল্লামা আনোয়ার শাহ (রহ.) ফাউন্ডেশনের কিছু স্বেচ্ছাসেবক। ফাউন্ডেশনের প্রায় ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে ফাউন্ডেশনের ১০ জনের এককটি দল একের পর এক করে যাচ্ছে জানাজা ও দাফন। কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় তারা করোনা লাশ দাফন-কাফনে মানবিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ জেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় এ পর্যন্ত ৫৭টি লাশ দাফন-কাফন করেছেন তারা।
আল্লামা আনোয়ার শাহ (রহ.) ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা আল্লামা সামসুল ইসলাম জানান, করোনার প্রাদুর্ভাবের পর করোনায় মৃত ব্যক্তিদের লাশ দাফনে স্বেচ্ছাসেবীরা সক্রিয় এবং উৎসাহী হয়ে ওঠে। তারা এ পর্যন্ত ৫৭টি লাশ দাফন-কাফন করেছেন।
জানা যায়, মৃতদের সৎকারে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছে আল্লামা আনোয়ার শাহ (রহ.) ফাউন্ডেশন। পুরো দলটি শহরের জামিয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসায় তাদের অস্থায়ী প্রধান কার্যালয়ে থাকছে। মৃতদেহ সৎকারে কিশোরগঞ্জ ছাড়াও অন্যত্র ডাক পড়লে তারা ছুটে যান দেশের যে কোনো স্থানে। তাদের সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও দাফন টিমে অংশ নেন। আল্লামা আনোয়ার শাহ (রহ.) ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা সাব্বির আহম্মদ রশিদ বলেন, '৩০ জুলাই পর্যন্ত আল্লামা আনোয়ার শাহ (রহ.) ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা করোনায় ৫৭ জনের মৃতদেহ দাফন করেছে। এর মধ্যে ৯-১০ জন ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। কিশোরগঞ্জের বাইরে কমপক্ষে ১৫টি লাশ তারা দাফন করেছে।
ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি শোলাকিয়া বৃহৎ জামাতের সহকারী ইমাম মাওলানা সোয়াইব আবদুর রউফন বলেন, 'দাফন-কাফনের সব ধরনের সরঞ্জাম কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, সিভিল সার্জন ডা. মো. মজিবুর রহমান ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক তাদের সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করেছেন। আর খরচের টাকা ফাউন্ডেশন থেকেই দেওয়া হয়েছে। ৩০ জনের টিমে পাঁচজন নারী সদস্য রয়েছেন। খবর পেলেই সবাই পরিবার ছেড়ে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। তারা সবাই ভালো আছেন।' তিনি আরও জানান, মুসলমান হিসেবে বিবেকের কারণেই আমরা এই সংকটময় পরিস্থিতিতে করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে এগিয়ে আসি। দেখা যায়, একটি লাশ সাত-আট ঘণ্টা মাটিতে পড়ে থাকলেও এর কাছে কেউ আসে না। আর আমাদের কাছে খবর এলে আমরা লাশগুলো সংগ্রহ করি।
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, 'ফাউন্ডেশনের কাজে আমি আনন্দিত ও গর্বিত। মানবিক কাজে তাদের জাগ্রত বিবেক যেভাবে সাড়া দিয়েছে, বলতে দ্বিধা নেই, তা মানবতার সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।'


বিষয় : করোনা