এবার হাওরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পানি এসেছে। এর আগে হাওরে আগাম বন্যা হলেও পানির প্রবাহ এত বেশি থাকেনি। এ বছর হাওরে পানিপ্রবাহ বেড়েছিল আশঙ্কাজনক হারে। করোনাকালের এই বিপর্যস্ত সময়ে ভরা পানির কারণে এবার হাওরের বিভিন্ন স্পটে পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসুদের আগমন ঘটেছে সবচেয়ে বেশি, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। হাওরের সেই ভরা প্রবল স্রোতের পানি নেমে গেছে মাসখানেক আগে। কিন্তু বর্ষায় আসা উপচেপড়া পানি দ্রুত নামার কারণে ভাঙনও শুরু হয়েছে হাওর জনপদে। ঘুরে দেখা গেছে, হাওরে পানি নামার গতির সঙ্গে ভাঙনের গতি প্রায় একই তালে।

কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার বিভিন্ন গ্রামে, বিশেষ করে নদীপাড়ের গ্রামগুলোতে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও বর্ষার পানিতে এতদিন হাওরের গ্রামগুলো ভাসছিল। সেই পানি এখন প্রতিদিন কমতে শুরু করেছে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বাঁশ ও জলজ উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি 'গাইল' (প্রতিরক্ষা বাঁধ) ভাঙছে। সেই সঙ্গে গাইলের ওপর দাঁড়ানো ঘরবাড়ি আংশিক ভেঙে পড়ছে। তাছাড়া পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ডুবো সড়কের সাইড ওয়ালও ভাঙছে। ক্ষতি হচ্ছে ডুবো সড়কসহ হাওরের রাস্তার। পানি নামার কারণে ভেঙে যাচ্ছে ঘরের কিনারা। ফলে দরিদ্র হাওরবাসী পড়ছে বিপাকে।

কিশোরগঞ্জের গভীর হাওর উপজেলা ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও নিকলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভরা বর্ষায় তৈরি গাইল ভেঙে মাটি সরে যাচ্ছে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি 'পাইলিং' ভেঙে মাটি সরে যাওয়ায় গ্রামের গরিব মানুষ নতুন করে সমস্যায় পড়েছে।

ইটনা উপজেলার পশ্চিম শিমুলবাগ, নয়াপাড়া, ইমামপাড়া, নয়া হাজারীবাগ, নয়াবাড়ী, আনন্দপাড়া, জেলেপাড়া, ঋষিপাড়া, মতিরহাটি, বাউলেরপোতা, বাজারহাটি, নন্দীহাটি; মিঠামইন উপজেলার আটপাশা, কাটখাল, হাশিমপুর, সাহেবনগর, হোসেনপুর, বিশুরীকোনা, কার্তিরখলা, চমকপুর, বগাদিয়া, হাতখুবলা, ঘাগড়া, কেওয়ারজোর, গোপদীঘি, ঢাকী, কাঞ্চনপুর; নিকলী উপজেলার ছাতিরচর, শহরমুল ইত্যাদি গ্রামে পানি না থাকলেও গ্রামের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে মাটি সরে গিয়ে ছনের ও টিনের ঘরবাড়ির ভিটেমাটি সরে যাচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ভাঙছে।

পশ্চিম শিমুলবাগ-নয়াপাড়া গ্রামের মোশারফ হোসেন (৪২) জানান, এবার বর্ষার পানি সরে যাওয়ায় এখন আটির (গ্রামের) চারপাশের মাটি সরে যাচ্ছে। ফলে, প্রতি গ্রামেই বাড়িঘর ভেঙে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, দুই বছর আগে শিমুলবাগ গ্রামে আমাদের আবাসস্থল ছিল। ঢেউয়ের আঘাতে বাড়িঘর হারিয়ে আমরা দু'বছর হলো শিমুলবাগ-নয়াপাড়া গ্রামে নিজেদের শ্রমে মাটি কেটে আবাসস্থল গড়ে বসবাস করছি। এখন পানি নেমে যাওয়ায় বাড়িঘর ভেঙে পড়ায় আমরা নতুন সংকটে পড়েছি। গ্রামের বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছর পানি নেমে যাওয়ার সময় বাড়িঘর কিছু ভাঙে। কিন্তু এ বছর ভাঙন কিছুটা বেশি হওয়ায় হাওরের দরিদ্র পরিবারগুলো সংকটে পড়েছে। মাটি কেটে পুনরায় আটি নির্মাণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাফিসা আক্তার বলেন, হাওরে ভরা বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সময় অনেকেই বাড়িঘর ভেঙে কিছুটা ক্ষতির মধ্যে পড়ে। এ বছর বন্যার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় এবং এখন পানি নেমে যাওয়ায় গ্রামে স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রতিরক্ষা প্রাচীরের বাঁশসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপাদান সরে পড়ায় মাটি সরে গিয়ে এক ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ কারণেই অনেক গ্রামে দরিদ্র পরিবারগুলো আর্থিক সমস্যায় পড়েছে।

মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রভাংশু সোম মহান বলেন, পানি নামার সময় প্রতি বছরই মাটি সরে গিয়ে গ্রামগুলো ছোট হয়ে আসে। অনেকেই নতুন করে ঘরবাড়ি হারায় এবং নির্মাণ করে। এ বছর বর্ষায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ভাঙন তীব্রতর হয়েছে। পানি নামার সময় গ্রামগুলোতে গাইলের মাটি সরে যাওয়ায় বাড়িঘরের ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পানি নামার পর শুস্ক মৌসুমে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় মাটি ভরাট করে গ্রামগুলোকে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা রয়েছে। উপজেলা পরিষদের সভায় এ নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মন্তব্য করুন