প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের করোনা টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন হলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হবে। আর করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। এর আগে সকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশমত ভ্যাকসিন দেওয়ার বয়সের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্কুল থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষায় যারা আছে সবাই যেন ভ্যাকসিন পায় এবং দ্রুত যেন আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারি সেই ব্যবস্থাটা আমরা নেব।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু না থাকায় শিক্ষার্থীদের খুবই কষ্ট হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের টিকা প্রদান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রম সম্পন্ন হলে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া যাবে। কভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল মাদ্রাসা খুলে দেওয়া হবে।

করোনার ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকার দেশের সব নাগরিককে বিনামূল্যে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। টিকা সংগ্রহে যত টাকাই লাগুক; সরকার তা দেবে। টিকা নিয়ে সমস্যা হবে না। 

জুলাই মাস থেকে আরও টিকা আসার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ব্যাপকভাবে টিকাদান শুরু করা হবে।যত টাকাই প্রয়োজন হোক না কেন সরকার প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংগ্রহ করবে। 

ভ্যাকসিন সঙ্কট কেটে যাওয়ার কথা জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, ভারত ভ্যাকসিন রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা সাময়িকভাবে সমস্যায় পড়ে গেছি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বর্তমানে আমাদের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন আর কোনো সমস্যা হবে না। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সব কোম্পানির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। আশা করছি জুলাই মাস থেকে আরো ভ্যাকসিন আসবে। ব্যাপকভাবে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করবো। 

স্বাস্থ্যখাতকে সর্বাপেক্ষা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, গত বছর করোনার প্রথম ঢেউ সফলভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতায় দ্বিতীয় ঢেউয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মহামারী মোকাবিলা করে জনস্বাস্থ্য ও জনজীবন সুরক্ষা করতে সক্ষম হবেন বলেও তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। করোনা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থার কথা জানান সরকার প্রধান।

তিনি বলেন, করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ এখনো বিদ্যমান থাকায় যেকোন জরুরি চাহিদা মোকাবিলায় এবারের বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রয়েছে। দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১০ হাজার চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতে অভিঘাত থেকে মুক্তি পেতে সমন্বিত বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। বাজেটে এ খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চলছিল পৃথিবীর সব জায়গায় যোগাযোগ করা হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন দেওয়ার আগেই টাকা পাঠিয়ে ভ্যাকসিন বুক করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনক ভারতে হঠাৎ করোনা ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়ায় তারা ভ্যাকসিন রপ্তানি বন্ধ করে। ফলে সাময়িকভাবে সমস্যার সৃষ্টি হয়। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বর্তমানে ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন আর কোনো সমস্যা হবে না। চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সব কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। জুলাই মাস থেকে আরো ভ্যাকসিন আসবে। ব্যাপকভাবে ভ্যাকসিন প্রদান শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, ভাকসিন কেনার জন্য বাজেটে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকে ইতোমধ্যে এক কোটি ১৪ লাখ ৬ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, যারা বিদেশ যাচ্ছে তাদের আগে ভ্যাকসিন দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে গিয়ে যাতে তাদের কোয়ারেন্টাইন করতে না হয়, কর্মস্থলে যেতে পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কোন ভ্যাকসিন কোন বয়স পর্যন্ত দেওয়া যাবে তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তা বিবেচনায় রেখে স্কুল থেকে শুরু করে সবাই যাতে ভ্যাকসিন পায়। এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসে সারাবিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত এমন সময় আমরা বাজেট দিয়েছি। একদিকে সারাবিশ্ব করোনায় আক্রান্ত অপরদিকে আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি। একই সময় বাংলাদেশকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে পেরেছি। এই তিনটি গৌরবময় অধ্যায়ের মাঝে করোনায় জর্জরিত।

তিনি বলেন, মহামারী দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব সত্ত্বেও সরকারের পদক্ষেপে অর্থনীতি পূর্ণাঙ্গভাবে পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। সরকার সঙ্কটকালে দেশের মানুষের পাশে আছে। 

মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, জীবন-জীবিকার সুরক্ষা দেওয়া এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন হলে দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

করোনা মহামারীতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন,  প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনাভাইরাসজনিত কারণে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ সময় অর্থনৈতিক অভিঘাত হতে উত্তরণে ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। 

করোনায় বন্ধুপ্রতীম দেশ ও সংস্থাকে বাংলাদেশ পাশে পেয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেট সহায়তা ঋণ পাওয়া গেছে। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে আরো প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পেতে যাচ্ছে। পাশাপাশি টিকা কিনতে ভ্যাকসিন সাপোর্ট বাবদ আরো ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে। 

বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সহায়তা পাওয়া সহজ হয়েছে বলেও মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী। 

সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের কথা উল্লেখ করে সংসদ নেতা বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর অত্যন্ত সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলছে। ২৩ প্যাকেজের  এক লাখ ২৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার বিপরীতে মে ২১ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হার ৭১ দশমিক ৫০ ভাগ। এ পর্যন্ত ৬ কোটি ৫ লাখ ব্যক্তি এবং এক লাখ ৬ হাজার প্রতিষ্ঠান সরকারের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হয়েছে। প্যাকেজ কার্যক্রম থাকায় এই সংখ্যা সামনে আরো বাড়বে।

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবাখাতের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ৪১ হাজার কোটি স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে গত মে পর্যন্ত তিন হাজার ২৮৮ হাজার প্রতিষ্ঠানকে ৩২ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। কুটির ও মাঝারী শিল্পের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের মধ্যে মে মাস পর্যন্ত ৯৬ হাজার ৬৭৫টি এসএমই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১৪ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। প্রাপ্তদের মধ্যে নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন ৫ হাজার ২৫৩ জন।

তিনি জানান, করোনা আক্রান্তদের সেবায় সরাসরি নিয়জিত চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের দুই মাসের সমান বেতনের সমাপরিমাণ বিশেষ সম্মানী দেওয়া হয়েছে। এতে ২০ হাজার ৫শ' জন স্বাস্থ্যকর্মীকে ১০৪ কোটি টাকা সম্মানী দেওয়া হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা সেবায় সরাসরি সম্পৃক্ত বিভিন্ন সেক্টরের কর্মচারীদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী ১৭৩ জনের পরিবারকে ৬৯ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বাণিজ্যক ব্যাংকে ঋণের বিপরীতে এক হাজার ২৯০ কোটি টাকা সুদ ভর্তুকি প্রদান করা হয়েছে। অতীতে দেশে কখনো সুদ ভর্তুকি দেওয়া হয়নি। এতে ৭২ লাখ ৮০ হাজার ঋণ গ্রহীতা সুবিধা পেয়েছেন। 

তিনি বলেন, মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব সত্ত্বেও সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের ফলে দেশের অর্থনীতি পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে সংসদ নেতা বলেন, এই বাজেট দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা ও জীবন-জীবিকা সুরক্ষা ও মহামারীর অর্থনৈতিক প্রভাব দৃঢ়তার সঙ্গে কাটিয়ে ওঠার ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দারিদ্র বিমোচনসহ আমাদের উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। 

তিনি বলেন, আমরা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন চাই। আমরা প্রবৃদ্ধি চাই। আবার সমাজের দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ঘটাতে চাই। প্রবৃদ্ধির সুফলটা যেন তৃণমূলের মানুষ পায় সেটাই চাই।