সকল প্রশংসা পরম করুণাময় মহান আল্লাহতায়ালার। তিনিই কাউকে সম্মানিত কিংবা অসম্মানিত করার মালিক। মর্যাদা দেওয়া এবং নেওয়ারও মালিক। আমাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির আসনে অধিষ্ঠিত করায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি সকল কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া আদায় করছি। দরুদ ও সালাম জানাচ্ছি দয়ার নবী রাসুল (সা.)-এর প্রতি।
আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি এই জাতিরাষ্ট্রের সফল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং প্রতিষ্ঠাতা। আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সব শহীদ সদস্যসহ কারান্তরালে শহীদ জাতীয় চার নেতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বাংলার ৩০ লাখ বীর সন্ততানকে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি দুই লাখ নির্যাতিত মা-বোনকে। বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ও বাংলার সব মানুষকে, যাদের চরম ত্যাগ এবং অবর্ণনীয় দুর্দশার ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ; আজকের স্বাধীন বিচার বিভাগ ও আমার জীবনের এই অভূতপূর্ব মুহূর্তগুলোর।
দুই. আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা মরহুম আব্দুল গফুর মোল্লা এবং মাতা মরহুমা নূরজাহান বেগমকে, যাদের অকৃত্রিম স্নেহে লালিত-পালিত হয়েছি। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি আমার পরিবারের সব সদস্যের প্রতি, যারা সবসময় আমাকে সহায়তা প্রদান করেছেন। আমি আরও স্মরণ করছি আমার বিজ্ঞ সিনিয়র মরহুম ব্যারিস্টার আবদুল হামিদকে, যার হাতে আমার ওকালতি পেশায় হাতেখড়ি। আমার ভগ্নিপতি সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মরহুম হাবিবুর রহমান এবং আমার বড় ভাই আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকীকে; যাদের অনুপ্রেরণা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে সব সময়। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সেসব মহান আইনজীবীকে, যারা নির্দি্বধায় ২০০৩ সালে আমার 'নন-কনফার্মেশন'-পরবর্তী দিনগুলোতে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
তিন. আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নতুন মাত্রায় উন্নীত করার মাধ্যমে আমার প্রতি আপনাদের দেখানো এই সম্মান সমুন্নত রাখা সম্ভব। বাংলাদেশের সব বিজ্ঞ আইনজীবী, সর্বস্তরের বিজ্ঞ বিচারক, বিচার বিভাগীয় সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাষ্ট্রের অপর দুটি বিভাগের সক্রিয় সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া আমার ওপর অর্পিত এই পবিত্র দায়িত্ব সফলভাবে পালন করা কঠিন হবে। বার ও বেঞ্চ হলো একটি পাখির দুটি ডানা, আর জুডিশিয়ারি হলো সমস্ত দেহ। পাখা দুটি সমানভাবে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যেতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। বারের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই কোর্ট পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
চার. সবাই বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সমস্যা সম্পর্কে সম্যক অবগত। সর্বস্তরে মামলার অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, আদালত অনুপাতে বিচারকার্যে সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, আদালতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, বিচার বিভাগ ডিজিটালাইজেশন, আধুনিক বিচার প্রশাসন কৌশল প্রণয়ন, উন্নত প্রশিক্ষণ, বিচার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জোগান, রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার নিরিখে বিচারকদের প্রয়োজনীয় দাবি পূরণসহ আরও যেসব বিষয় রয়েছে, সে সম্পর্কে আমি সজাগ ও সচেতন রয়েছি। পাশাপাশি ন্যায়বিচারে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বিজ্ঞ আইনজীবীদের সমস্যা সম্পর্কেও আমি জ্ঞাত আছি। আমি বিশ্বাস করি, বিচার বিভাগের এসব প্রয়োজন পূরণে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা আগের তুলনায় অধিক গতিতে অব্যাহত থাকবে।
পাঁচ. আমি বলতে চাই, যে জাতি তার ৩০ লাখ সন্তানের রক্তের বিনিময়ে, কোটি কোটি মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে এবং অসীম সাহসিকতার সঙ্গে জীবন বাজি রেখে পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করতে পারে, সে জাতি বিচার বিভাগের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না- এটা আমার কখনোই বিশ্বাস হয় না। আমি বরাবর আশাবাদী একজন মানুষ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ' ব্যর্থ না হওয়ার সবচাইতে নিশ্চিন্ত পথ হলো সাফল্য অর্জনে দৃঢ় সংকল্প হওয়া।' বিচার বিভাগের সমস্যা সমাধানের জন্য নেতৃত্বের দায়িত্ব আমাদের সবাইকে যৌথভাবে পালন করতে হবে।
রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটি যদি দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত হয় তাহলে রাষ্ট্রটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে পারে না। সে কারণে আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের অপর দুটি বিভাগ তাদের নিজ নিজ অবস্থানে থেকে বিচার বিভাগের সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। রাষ্ট্রের সব বিভাগ ও ব্যক্তিকে অবশ্যই বারবার স্মরণ করতে হবেথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে গণতান্ত্রিক সভ্যতা পরাজিত হবে। আমি ফ্রান্সিস বেকনের সঙ্গে একমত হয়ে বলতে চাই- 'ইফ উই ডু নট মেইনটেইন জাস্টিস, জাস্টিস উইল নট মেইনটেইন আস।'
ছয়. আসুন, বিচার বিভাগের এই সন্ধিক্ষণে আমাদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে মাত্র এক হাজার ৯০০ জন বিচারকের কাঁধে যে বিপুল সংখ্যক মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে, তা বিচার বিভাগের জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়। আমার দায়িত্বভার গ্রহণের সূচনালগ্নে সর্বস্তরের বিজ্ঞ বিচারকদের আহ্বান জানাব- আসুন, কঠোর পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীর প্রতি সমবেদনা ও ভালোবাসা দিয়ে অধিক সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হই। এটি হবে বিচার বিভাগের জন্য মামলার জট থেকে মুক্তির যুদ্ধ।
সাত. দেশের সব অধস্তন আদালতে মামলাজট নিরসন তথা বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে ৮টি বিভাগের জন্য একজন করে বাংলদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতিকে প্রধান করে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। প্রতি মাসে আমি তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিবেদন গ্রহণ করব। পুরাতন মামলাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপারভাইস এবং মনিটর করা হবে। সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে বিচারিক সময় ও দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রত্যেক বিচারককে মামলা নিষ্পত্তির অভূতপূর্ব অভিযাত্রায় অগ্রসেনানী হওয়ার এক ইতিবাচক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
আট. মনে রাখতে হবে, ন্যায়বিচার জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া জনগণের প্রতি দয়া নয় বরং এটি জনগণের সহজাত অধিকার। আমি এ অধিকারকে কেবল সাংবিধানিক অধিকার বলে সাব্যস্ত করতে রাজি নই। ন্যায়বিচারের সৌকর্য এবং আইনের রাজকীয়তা প্রকৃতপক্ষে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বটে। সে কারণে দেশের সব বিজ্ঞ বিচারককে নিরপেক্ষতার সঙ্গে নির্মোহ হয়ে, নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে জনগণের ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির সহজাত অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। এ প্রসঙ্গে আমি মহান গ্রন্থ পবিত্র আল কোরআনের 'সুরা নিসা'র ১৩৫ নম্বর আয়াতকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- 'হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে অটল থেকো। তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য সাক্ষ্য দেবে। সত্য বলার কারণে যদি তোমার নিজের ক্ষতি হয় অথবা মা-বাবা বা আত্মীয়ের ক্ষতি হয়, তবুও সত্য সাক্ষ্য দেবে। আর পক্ষদ্বয় বিত্তবান হোক বা বিত্তহীন (সে বিবেচনা না করেই) সত্য সাক্ষ্য দেবে। আল্লাহর প্রাধিকার ওদের সবার ওপরে; লোভ-লালসা বা প্রবৃত্তির অনুগামী হয়ে ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরে যেও না। যদি পক্ষপাতিত্ব করে পেঁচানো কথা বলো; সত্যকে বিকৃত কর বা পাশ কাটিয়ে যাও তবে মনে রেখো, আল্লাহ সবকিছুরই খবর রাখেন।'
নয়. বিচার কার্যক্রমে সংশ্নিষ্ট সবাইকে আমার এই অভিপ্রায় জানাতে চাই যে, বিচার বিভাগে কোনো দুষ্টক্ষতকে আমরা নূ্যনতম প্রশ্রয় দেব না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সব শাখার অস্বচ্ছতা, অনিয়ম, অলসতা এবং অযোগ্যতাকে নির্মূল করতে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে সবাইকে পাশে পাব- এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় যারা নিয়ামক শক্তি রয়েছেন, তারা সবাই আমাদের প্রতি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন- এটা আমার একান্ত আবেদন। ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয় এমন সব কারণ চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য আমরা বদ্ধপরিকর হবো।
দশ. আমি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ সমাজের একজন সাধারণ মানুষ। এই দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট, আবেগ-অনুভূতি ও আনন্দ-বিরহ মনের গভীর থেকে আমি উপলব্ধি করতে পারি। সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার কোনো অশুভ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা কখনোই মেনে নেওয়া হবে না।
প্রসঙ্গত, আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণে আমি উদারচিত্তে বিচার বিভাগকে নিয়ে আইনের কাঠামোর মধ্যে যে কোনো গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। কবিগুরুর ভাষায় বলতে চাই, 'নিন্দা করতে গেলে বাইরে থেকে করা যায়, কিন্তু বিচার করতে গেলে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়।' আপনারা যারা বিচার বিভাগের আলোচক ও সমালোচক বন্ধু রয়েছেন, তারা বিচার বিভাগের সমস্যা উপলব্ধি করবেন, নিঃসংকোচে আলোচনা বা সমালোচনা করবেন- রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণকামিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে।
এগার. স্বতন্ত্র জাতিসত্তার মর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ১৮ কোটি মানুষের ন্যায়বিচারের ভরসাস্থল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের পবিত্র রক্তের অক্ষরে লেখা সুমহান সংবিধানের চেতনা সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট দায়িত্ব পালন করবে অতন্দ্র প্রহরীর মতো। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সবসময় সংবিধানে বর্ণিত 'সাম্য ও ন্যায়ানুগ' সমাজ গঠনে দৃশ্যমান, কার্যকরী ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে মর্মে আমি প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বক্তব্যে প্রকাশ করার চেয়ে কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নে ব্রতী হওয়াকে অধিকতর জরুরি মনে করি। এ ক্ষেত্রে আমরা সবাই হাতে হাত রেখে একত্রিত হয়ে কাজ করব- এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
বার. বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীদের অনুরোধ করব, দয়া করে জুনিয়র আইনজীবীদের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকাবেন। তাদের কষ্ট আমি অনুভব করি, যেহেতু আমি নিজে অনেক কষ্ট করেছি। জুনিয়র আইনজীবীদের অনুরোধ করব, শক্তি হবে শিক্ষা, জ্ঞান ও দীক্ষার। সম্মান অর্জন করতে গেলে সম্মান দিতে জানতে হবে। সহকর্মীদের অনুরোধ করব, সবার প্রতি আপনাদের শপথের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ ও ব্যবহার করবেন।
(রোববার সুপ্রিম কোর্টে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তব্যের ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষ্য।)
বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী :নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি, বাংলাদেশ