ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

চঞ্চল চৌধুরী যেভাবে সৃজিতের মৃণাল সেন হয়ে উঠলেন

চঞ্চল চৌধুরী যেভাবে সৃজিতের মৃণাল সেন হয়ে উঠলেন

চঞ্চল চৌধুরী। ছবি: এম ডব্লিউ

এমদাদুল হক মিল্টন

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪ | ১৩:০২ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৪ | ১৩:০৭

সব চরিত্রেই চঞ্চল চৌধুরী যে অনবদ্য, এর প্রমাণ তিনি দিয়েছেন বহুবার। গল্পের চরিত্র যেমনই হোক, নিজেকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন তাঁকে ঘিরেই এ চরিত্রের সৃষ্টি। কোনটি তাঁর আসল রূপ আর কোনটি অভিনয়, ধাঁধায় ফেলে দেয় দর্শককে। এবার তিনি হয়েছেন পর্দার মৃণাল সেন। গত ১৪ মে ছিল এই গুণী নির্মাতার জন্মদিন। সে উপলক্ষে কলকাতার নন্দনে প্রকাশ পেল সৃজিত মুখার্জির পরিচালনায় মৃণাল সেনের বায়োপিক ‘পদাতিক’-এর টিজার। জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধা জানাতে প্রয়াত মৃণাল সেনের জীবন ও তাঁর সময়ের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘পদাতিক’। এতে মৃণাল সেন রূপে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। গত বছর যখন চরিত্রের লুক প্রকাশ হয়, চমকে গিয়েছিল সবাই। হুবহু মৃণালের মতোই লাগছিল তাঁকে। সিনেমার ঘোষণাপর্ব থেকে যে সফর শুরু হয়েছে, তা পূর্ণতা পেল টিজার প্রকাশের দিন। এ উপলক্ষে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন চঞ্চলও। পেয়েছেন উপস্থিত সবার প্রশংসা। টালিউডে এটিই তাঁর প্রথম কাজ। 

কী ছিল টিজারে 

১ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের টিজারে মৃণালরূপে আরেকবার দর্শকদের চমকে দিলেন চঞ্চল। এতে প্রথমেই উঠে এসেছে বাইশে শ্রাবণের ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষযাত্রায় শামিল হতে রাস্তায় নেমেছিল লাখো জনতা। সেই ভিড়ে অসহায় এক লোক তাঁর শিশুর মরদেহ নিয়ে এসেছেন দাহ করতে। কিন্তু এত মানুষের মধ্যে সুযোগই পাচ্ছেন না শ্মশান পর্যন্ত পৌঁছানোর। একপর্যায়ে মানুষের ভিড়ে লোকটা হারিয়ে ফেলেন নিজের সন্তানের লাশ। দূর থেকে অসহায় চোখে এ দৃশ্য দেখেন তরুণ মৃণাল। নির্মাতা তাঁর বিভিন্ন লেখায় এ ঘটনার কথা বলেছেন। সেটিই উঠে এসেছে টিজারে। এরপর দেখানো হয় কখনও মৃণাল সম্পাদনার টেবিলে, কখনও নৌকায় বসে লেখায় নিমগ্ন, ক্যামেরার পেছনে তাঁর চিন্তিত মুখ, দু-একটা শুটিংয়ের দৃশ্য, উত্তাল রাজনীতি; এসব পেরিয়ে মৃণালকে দেখা যায় বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ধরা পড়েছে। টিজার শেষ হয়েছে সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য দিয়ে, যেখানে মৃণাল ফাঁকা রাস্তায় প্রায় শুয়ে পড়েছেন। পেছনে তাকিয়ে এক হাত উঁচু করে বলেন, ‘কাট’।

পর্দায় নিজেকে দেখার অনুভূতি

নন্দনে বড় পর্দায় নিজেকে প্রথমবার মৃণাল সেনের চরিত্রে দেখে কী মনে হলো চঞ্চলের? অভিনেতার ভাষ্য, ‘স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। কাজটা যখন শুরু করি, তখন মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছিল। কিন্তু ডাবিং করা পর্যন্ত খুব টেনশনে ছিলাম।’ চঞ্চল জানালেন, ‘লুক সেটের ছবি দেখে প্রথমে তাঁর একটু মনের জোর বাড়ে। তারপরেও একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, মৃণাল সেনকে নিজের মধ্যে ধারণ করা। এত বড় একজন ব্যক্তিত্ব! পরিচালনা ছাড়াও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং রাজনৈতিক সত্তাকে ধারণ করতে না পারলে তো চরিত্রটাই অপূর্ণ রয়ে যাবে!’

পর্দার মৃণাল হয়ে ওঠার গল্প

পর্দায় মৃণাল হয়ে উঠতে নিজের মতো প্রস্তুতি নিয়েছিলেন চঞ্চল। শুধু চেহারার মিল থাকলেই হয় না। আরও অনেক কিছু লাগে। নতুন করে মৃণাল সেনের ছবিও তিনি দেখেছিলেন। এ প্রসঙ্গে চঞ্চল বললেন, ‘কলেজ জীবনে তাঁর [মৃণাল সেন] ছবি দেখেছি দর্শক হিসেবে। কিন্তু তাঁর চরিত্রে অভিনয় করব বলে যখন ছবিগুলো আবার দেখলাম, তখন মানুষটাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করি।’

চঞ্চল কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবেননি, মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয় করবেন। পুরো ভাবনা এবং তা বাস্তবায়নের কৃতিত্ব তিনি সৃজিতের ঝুলিতেই তুলে দিতে চাইলেন। চরিত্র হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘‘চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনকে ধারণ করা কঠিন কাজ। কারণ, আমি কখনও বায়োপিকে অভিনয় করিনি। একটা বায়োপিকের কাজ দর্শক যখন দেখেন তখন তিনি গুণী মানুষটির শতভাগ মেলাতে চান। যে অভিনয় করছেন আর যার চরিত্রে অভিনয় করছেন দুজন মানুষ কিন্তু এক নয়। কিছু তফাৎ থাকবেই। ফটোশুটের পর যখন দেখা গেল লুক কাছাকাছি তখন এপার বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের দর্শকের আগ্রহ বাড়তে থাকল। বলিউড ‘শাহেনশাহ’ অমিতাভ বচ্চনের কাছ থেকেও প্রশংসা পেয়েছি। মৃণাল সেনের বায়োপিকে তাঁর কলকাতায় যাওয়া, চাকরি-বাকরি, সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হওয়া, স্ট্রাগল, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি–সবকিছুই উঠে এসেছে। একরকম দেখতে তো কত মানুষ আছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ব্যক্তিত্ব, দর্শন তো আর এক হবে না। এ বিষয়গুলো নিয়েও অনেক কাজ করতে হয়েছে। সিনেমাটিতে অভিনয় করতে গিয়ে মৃণাল সেনের আদর্শিক জায়গাটা বোঝার চেষ্টা করেছি। তাঁকে আমরা একজন নির্মাতা হিসেবে চিনি। যখন আমি তাঁর চরিত্রে অভিনয় করতে গেলাম, গল্পের প্রয়োজনে তখন তাঁর পুরো জীবনযাপনই চিনতে ও বুঝতে হয়েছে। এভাবে কাজটি শেষ করেছি। কলকাতায় এ সিনেমার যখন দৃশ্যধারণ চলছিল তখন আমার বাবা মারা যান। অভিনয় করার মতো মানসিক অবস্থাই ছিল না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। সে অবস্থায়ও কাজটি করেছি। সৃজিতদা সাহায্য না করলে কাজটা করতে পারতাম না। হয়তো আমার প্রস্তুতিতে কিছুটা কমতি ছিল। যতটুকু মানসিকভাবে মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল বাবার মৃত্যুর কারণে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারপরেও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে চেষ্টা করেছি চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে। বাকিটা দর্শক পর্দায় দেখবেন। মৃণাল সেন আমাদের গর্ব। এ মানুষটির জন্ম, বেড়ে ওঠা ফরিদপুরে। তাঁর সফলতা বা অর্জনের অংশীদারিত্ব আমাদেরও আছে। আমরাও চাই মৃণাল সেনকে ধারণ করতে। তাঁকে আমাদের মানুষ বলে শ্রদ্ধা জানাতে।’’ 

শুধুই অভিনয়...
দুই বাংলায় চঞ্চল অনেকেরই প্রিয় অভিনেতা হয়েছেন। তারকাখ্যাতি কতটা, তাঁর অভিনীত ইউটিউবে থাকা কাজগুলোর নিচে মন্তব্য পড়লেই বোঝা যায়। এ অন্য রকম উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার মন্ত্র কী? দেখুন, ‘আমি আমার কাজটি ঠিকঠাক করতে চাই। আমার ভক্তরা বলেন যে, তারা আমার অভিনয়কে বাস্তব মনে করেন। সম্ভবত, অন্য কারণটি হলো, আমি সর্বদা নানা চরিত্রে দর্শকের সামনে হাজির হওয়ার চেষ্টা করি। যদি আমি বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে দর্শকদের সামনে হাজির হই তাহলে সহজে তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম হবেন। এটি আমার অভিনয়ের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে। এ কারণে আমি ভালো গল্প ও চরিত্র নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি। অনেক সময় আমি নেতিবাচক ভূমিকায়ও অভিনয় করেছি। মূলধারার অনেক অভিনেতা নেতিবাচক ভূমিকা নিতে দ্বিধাবোধ করতে পারেন। কিন্তু ভালো গল্পে যে কোনো চরিত্রে অভিনয়ে আমার আপত্তি নেই’ বললেন চঞ্চল চৌধুরী। মাঝে মধ্যে গান করলেও অভিনেতা ছাড়া আর কোনো পরিচয় নেই তাঁর। নিজেও চান না অন্য কোনো পরিচয় তাঁর থাকুক। কারণ, শুধু অভিনয়কেই ভালোবাসেন তিনি। এই ভালোবাসা নিয়েই যেতে চান আরও বহুদূর। 

অন্যান্য
নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘মনোগামী’ সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। গত ঈদে মুক্তি পাওয়া চরকির সিনেমাটি নিয়ে ছিলেন বেশ আলোচনায়। একই উৎসবে পাওয়া হইচইয়ের ‘রুমি’ সিরিজে এক অন্ধ গোয়েন্দা চরিত্রে অভিনয় করেও নজর কেড়েছেন তিনি। এ দুই কাজের আলোচনার মধ্যেই খবর এলো ‘তুফান’ সিনেমায় চঞ্চলের অভিনয়ের খবর। যদিও রায়হান রাফি পরিচালিত ‘তুফান’-এর টিজার ছিল শাকিবময়। কিন্তু একেবারে শেষে স্বল্প উপস্থিতি দিয়েই নিজের মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। এঅভিনেতার মুখে– ‘তুফান, ভয় পাইছি রে’ এখন অনেকেরই মুখে ফিরছে।  এসভিএফ বাংলাদেশ, আলফা আই ও চরকির আরেক সিনেমা ‘দম’-এর মূল চরিত্রে অভিনয় করছেন চঞ্চল চৌধুরী। সিনেমাটি পরিচালনা করবেন রেদওয়ান রনি। এছাড়া মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে চরকির অরিজিনাল সিরিজ ‘কালপুরুষ’। সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে এর টিজার। টিজারের শেষে বেশ চমক দিতে হাজির হয়েছেন চঞ্চল।
 

আরও পড়ুন

×