ব্যাংক সিবিএ নেতার ঋণ বলে কথা!

দুদকের তদন্তের মধ্যেই বাড়তি সুবিধাসহ পুনঃতফসিল

প্রকাশ: ১৯ মে ২০১৯     আপডেট: ১৯ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ওবায়দুল্লাহ রনি

খন্দকার মো. নজরুল ইসলাম

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে এমন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে রাষ্ট্রমালিকানার অগ্র্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এপিসোড এগ্রো লিমিটেড নামে এ প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন ব্যাংকটির সিবিএ সভাপতি খন্দকার মো. নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা। পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধাও দেওয়া হয়েছে।

রাজবাড়ী জেলার আলাদিপুরে নিজ এলাকায় গরুর খামার দেখিয়ে ২০১৫ ও ২০১৭ সালে অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় এপিসোড এগ্রো। কাগজ-কলমে কোম্পানির মালিকানায় রয়েছেন নজরুল ইসলামের তিন ভাই এবং তার মেয়ে। তবে এ ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী তিনি। খামার রাজবাড়ীতে হলেও ঋণ দেওয়া হয়েছে ঢাকার প্রধান শাখা থেকে। এপিসোড এগ্রোর কাছে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে আট কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, ঋণের বিপরীতে বন্ধকী জমি ভুয়া। এ অভিযোগের ওপর দুদকের তদন্ত চলছে। দুদকের তদন্তের মধ্যে সম্প্রতি বিশেষ বিবেচনায় ঋণটি পুনঃতফসিলের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। পুনঃতফসিলের নথিতে খামারে ৯০০ গরু রয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। যদিও বাস্তবে গরু আছে ৩০টির  মতো।

অভিযোগ রয়েছে, ঋণের টাকায় নজরুল ইসলাম রাজধানীর গ্রিন রোডে দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। এ ছাড়া ব্যাংকের পদোন্নতি, বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মে সম্পৃক্ত হয়ে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থে ফরিদপুর, রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায় কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি কিনেছেন। যদিও এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন তিনি।

নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তার কিছু রাজনৈতিক শত্রু রয়েছে, যারা তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন। তিনি স্বীকার করেন, এপিসোড এগ্রো তাদের পারিবারিক কোম্পানি। এখান থেকে মুনাফার একটা অংশ তিনি পান। তিনি বলেন, গরু কেনাবেচার মধ্যে থাকে। এখন তাদের খামারে একশ'র মতো গরু আছে। গত বছর চারশ'র মতো ছিল। গত বছর ও তার আগের বছর হঠাৎ বন্যার পর এক কোটি টাকার মতো লোকসান হয়। এ কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে গেছে। দুদকের তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের খামারের জমির মধ্যে আরেকজনের কিছু জমি আছে। ওই ব্যক্তির কাছ থেকে জমিটুকু তিনি কিনতে বা বিনিময় করতে চান। জমির দাম চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি চেয়ে ওই ব্যক্তি দুদকের কাছে অভিযোগ করে বসে আছেন।

জানা গেছে, ভুয়া জমি দেখিয়ে এপিসোড এগ্রোর নামে ঋণ সৃষ্টির বিষয়ে গত বছরের ১২ নভেম্বর তদন্ত শুরু করেছে দুদকের ফরিদপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়। ঋণ অনিয়মের বিষয়ে এরই মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ে দুদকের কর্মকর্তারা কথা বলেছেন। এ অবস্থায় গত বছরের ২৮ জানুয়ারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এপিসোড এগ্রোর ঋণ পুনঃতফসিল প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। তবে পর্ষদ থেকে কিছু পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানো হয়। এরপর গত ৫ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ঋণ পুনঃতফসিলের পক্ষে সুপারিশসহ আরেকটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করলে পর্ষদ তা অনুমোদন করে।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপিসোড এগ্রোর নামে প্রকল্প ঋণ রয়েছে তিন কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের জুনে দেওয়া এ ঋণ ২০২৯ সালের জুলাই পর্যন্ত পুনঃতফসিল করা হয়েছে। আর কারখানার আধুনিকায়ন ও বিস্তারের জন্য ২০১৭ সালের মার্চে দেওয়া চার কোটি ৬৯ লাখ টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে ২০৩০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। পুনঃতফসিলের পর উভয় ঋণের প্রথম কিস্তি পরিশোধের সময় দেওয়া হয়েছে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটির নামে ৮৬ লাখ টাকার সিসি ঋণ রয়েছে। এপিসোড এগ্রোর মালিকানায় থাকা নজরুল ইসলামের ভাইদের মধ্যে আবুল কালাম আজাদ কোম্পানির চেয়ারম্যান, মিজানুর রহমান এমডি এবং জাহিদ হাসান সজল পরিচালক। তাদের পিতার নাম মো. ওয়াজি উল্যাহ। আর নজরুল ইসলামের মেয়ে নাঈমা নীতি এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। এ চারজনের প্রত্যেকের নামে কোম্পানির ২৫ শতাংশ করে শেয়ার রয়েছে।

জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত সমকালকে বলেন, পুনঃতফসিল প্রস্তাব অনুমোদনের আগে খামারে কত গরু আছে, সব কাগজপত্র ঠিক আছে কি-না এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদন চাওয়া হয়। তারা পর্ষদের সামনে একটি লিখিত রিপোর্ট উপস্থাপন করে। ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পুনঃতফসিল প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়েছে। তবে দুদকের তদন্তের বিষয়টি পর্ষদ অবহিত নয়। এ বিষয়ে ব্যাংকের এমডি মোহম্মদ শামস-উল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ঋণ পুনঃতফসিলের প্রস্তাবে বলা হয়, খামারে ৯০০টি গরু আছে। এর মধ্যে তিনশ' মোটাতাজাকরণ ষাঁড়, ৩০০ গাভী ও ৩০০ বাছুর। এসব গাভী থেকে বছরে মোট ১৩ লাখ ৭২ হাজার লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এর মানে দৈনিক উৎপাদন হয় তিন হাজার ৮১১ লিটার দুধ। ব্যাংকের নথিতে এ রকম তথ্য থাকলেও সরেজমিনে মিলেছে ভিন্ন চিত্র। সরেজমিন ঘুরে সমকালের রাজবাড়ী প্রতিনিধি সৌমিত্র শীল জানান, এলাকার লোকজন এ খামারকে অগ্রণী ব্যাংকের সিবিএ সভাপতির খামার হিসেবেই জানেন। খামারে তিনটি টিনশেডের অবকাঠামো আছে। বাছুরসহ বর্তমানে যেখানে ৩০টির মতো গরু আছে। কখনোই সেখানে ৯০০ গরু ছিল না। ৯০০ গরু পালনের মতো অবকাঠামোও সেখানে নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, এই ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য ডাউনপেমেন্ট হিসেবে নূ্যনতম ১৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা। তবে এপিসোড এগ্রো দিয়েছে ৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা। সাধারণভাবে কোনো ঋণ প্রথম মেয়াদে দুই বছরের জন্য পুনঃতফসিল করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে পাঁচ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিলের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে অগ্রণী ব্যাংক। যে কারণে অগ্রণী ব্যাংকের পর্ষদের এ সিদ্ধান্তের ওপর অনাপত্তির জন্য তা পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। ২০১৫ সালে এ ঋণ অনুমোদনের সময় অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন মিজানুর রহমান খান। নানা অনিয়মের অভিযোগে মিজানুরের বিরুদ্ধে দুদকে তদন্ত চলছে।