মিয়ানমারের পেঁয়াজ আমদানি বন্ধে নতুন কারসাজি

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

মিয়ানমারের পেঁয়াজ এলে স্থিতিশীল হবে পেঁয়াজের বাজার। পড়ে যাবে দাম। এ 'আশঙ্কা' থেকে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধে নতুন কারসাজি শুরু করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। রবি ও সোমবার মিয়ানমার থেকে কিছু পেঁয়াজ আসায় চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় দরপতন হয়েছিল পেঁয়াজের। এটি বুঝতে পেরে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের পাঁয়তারা করা হচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জে মিয়ানমারের কোনো পেঁয়াজ আসেনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইপলাইনে থাকা পেঁয়াজ আসতে আরও দু-তিন দিন সময় লাগবে। তবে টেকনাফ স্থলবন্দরে এখনও ২০ থেকে ৩০ ট্রাক পেঁয়াজ রয়েছে বলে স্বীকার করছেন তারা। কেন এসব পেঁয়াজ পাইকারি বাজারে আসছে না, সে ব্যাপারে কোনো সদুত্তর নেই ব্যবসায়ীদের কাছে।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে হামিদ উল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি। এ মার্কেট পেঁয়াজের পাইকারি মোকাম। এখানে ৪০ থেকে ৫০ জন বড় ব্যবসায়ী আছেন, যারা সারাদেশে পেঁয়াজের সরবরাহ করেন খাতুনগঞ্জ থেকে। বড় এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে- মেসার্স কামাল উদ্দিন ট্রেডার্স, বাগদাদী করপোরেশন, হক ট্রেডার্স ও কাজী স্টোর। কমিশন এজেন্ট হিসেবে পেঁয়াজের ব্যবসা করেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।

বিষয়টি স্বীকার করে হামিদ উল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া সমকালকে বলেন, 'এ মার্কেটে ৪০ থেকে ৫০ ব্যবসায়ী পেঁয়াজের কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। তবে মিয়ানমার থেকে নিয়মিত পেঁয়াজ আনেন না তাদের কেউই। বাজার বুঝে কেউ কেউ মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রবি ও সোমবার মিয়ানমার থেকে ১০ থেকে ১৫ ট্রাক পেঁয়াজ এসেছিল খাতুনগঞ্জে। যতটুকু জানি, এখনও ২০ থেকে ৩০ ট্রাক পেঁয়াজ আছে টেকনাফ স্থলবন্দরে। কিন্তু গতকাল কোনো পেঁয়াজবোঝাই ট্রাক প্রবেশ করেনি এ পাইকারি মোকামে।' কেন পেঁয়াজ আমদানি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'টেকনাফ থেকে কেন পেঁয়াজ আসছে না, সেটি আমার জানা নেই। আমি টেকনাফ থেকে কখনোই সরাসরি পেঁয়াজ আমদানি করিনি। কিছু ব্যবসায়ী সিঅ্যান্ডএফের মাধ্যমে যোগাযোগ করে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আনেন। এ ব্যাপারে তারাই ভালো বলতে পারবেন।'

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জে নাসিকের (পুরনো) পেঁয়াজ ৫০ টাকা ও সাউথের নতুন পেঁয়াজ ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। অথচ মিয়ানমারের কিছু পেঁয়াজ আমদানির কারণে সোমবার একই পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল যথাক্রমে ৪৫ ও ৪৮ টাকা দরে। শুক্রবার ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর পর শনিবার একদিনেই খাতুনগঞ্জে এ দু'ধরনের পেঁয়াজের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬২ ও ৬০ টাকা। মিয়ানমারের পেঁয়াজ আসার খবরে একদিনেই পেঁয়াজের দাম কেজিতে কমে ১০ থেকে ১৫ টাকা। যাদের কাছে এখন পেঁয়াজ আছে তারাই চাচ্ছেন না, মিয়ানমারের পেঁয়াজ এ মুহূর্তে প্রবেশ করুক বাজারে। দু-তিন দিন পর এ পেঁয়াজ এলে এর মধ্যে আগের পেঁয়াজ বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা তুলে নিতে পারবেন তারা। এ জন্য টেকনাফ থেকে পেঁয়াজ আনতে কিছুটা ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের ব্যবসা করা সোনালী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নুরুল আবসার অবশ্য দ্বিমত প্রকাশ করে বলেন, 'পেঁয়াজ পচনশীল হওয়ায় বেশিদিন এটি মজুদ করে রাখা যায় না। মিয়ানমার থেকে যারা পেঁয়াজ এনেছিলেন তারা লোকসান দেওয়ায় মঙ্গলবার কোনো পেঁয়াজ আসেনি টেকনাফ থেকে। হয়তো দু-তিন দিন পর আরও কিছু পেঁয়াজ আসবে। তখন বাজারও স্বাভাবিক হবে।' টেকনাফ স্থলবন্দরে এখন কী পরিমাণ পেঁয়াজ আছে তা জানেন না বলে জানান তিনি। তবে মিয়ানমারের পেঁয়াজ আসায় রবি ও সোমবার পেঁয়াজের দাম অনেক কমে এসেছিল বলে স্বীকার করেন তিনি।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমদ বলেন, 'মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ এলে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হতো। কেন সেখান থেকে পেঁয়াজ আসছে না সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। তবে এটা ঠিক যে, পেঁয়াজ সিজনাল এবং পচনশীল হওয়ার কারণে বেশিদিন রাখা যায় না। এখন আমাদের বছরে ২৪ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা আছে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় ১০ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। এজন্য ভারতে দর ওঠানামার ওপর দেশে পেঁয়াজের বাজার ওঠানামা করে।'

প্রসঙ্গত, ভারতের মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে দর বেশ বৃদ্ধি পায়। ফলে ভারত সরকার পেঁয়াজের নূ্যনতম রফতানি মূল্য টনপ্রতি ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করে। আগে যেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ ডলারে আমদানি করা যেত তা ৮৫০ ডলারে ওঠায় দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে শুক্রবার থেকে।