ব্যবসায়ীদের পকেটে ১৫০ কোটি টাকা

 অভিযানেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি পেঁয়াজের বাজার

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মিরাজ শামস

দেশে পেঁয়াজের বাজার এখনও সিন্ডিকেটের কবলে। গত দু'দিনেই কারসাজি করে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের পকেট কেটে বের করে নিয়েছেন দেড়শ' কোটি টাকা। ভারত রোববার পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর ঢাকাসহ সারাদেশে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেয় এই অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। এক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম বেশি নেওয়া হয় ৪০ টাকা। গতকালও সারাদেশে পেঁয়াজের দাম একশ' টাকার ওপরে বেচাকেনা হয়েছে। দাম বাড়েনি, তবে কমেওনি। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং জোরদারে নতুন করে ১০টি টিম গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বাজার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল রাজধানীর মিরপুর শাহআলী, মিরপুর ৬ নম্বর বাজার ও মোহাম্মদপুর টাউনহলসহ বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়ে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রির অভিযোগে বেশ কয়েকজন দোকানদারকে জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সারাদেশে বাজারে অভিযান চলছে। নোয়াখালীতে গুদামভর্তি ও বাজারে প্রচুর সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ১০০ টাকা কেজি পেঁয়াজের দাম নেওয়ার অপরাধে চৌমুহনী ও মাইজদী পৌরবাজারের দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোকনুজ্জামান খানের নেতৃত্বে র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করে। এরপরও বাজারের চড়া দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

রাজধানীসহ সারাদেশের বাজারে আগের দিনের মতো গতকাল খুচরায় প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১১০ থেকে ১২০ ও আমদানি করা পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়। এই পেঁয়াজ দু'দিন আগে ছিল যথাক্রমে ৭৫ থেকে ৮০ ও ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে ৪০ টাকা কেজিতে আমদানি করা পেঁয়াজ খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। এতে গত দু'দিন প্রতি কেজি পেঁয়াজে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য গুনেছেন ক্রেতারা। খুচরা বিক্রেতারা বলেন, পাইকার ও আমদানিকারকরা একই হারে দাম বাড়ানোর ফলে খুচরায় এই দাম বেড়েছে। বড় এই ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের অতিরিক্ত মূল্য বাগিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।

দু'দিন ধরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও পুরান ঢাকার শ্যামবাজারসহ সব পাইকারি আড়তে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১০৫ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৯০ থেকে ৯৫ ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হয়। মিয়ানমারের পেঁয়াজ এখন সব বাজারেই ভারতীয় বলে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি আড়তে দু'দিন আগে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৫৮ থেকে ৬০ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৫৪ থেকে ৫৫ ও মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫২ টাকা ছিল। পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিতে বিক্রিও বেড়েছে। মিরপুর ১ নম্বর বাজারে শ্রীরাম ভান্ডারের পাইকারি ব্যবসায়ী কানাই লাল সাহা বলেন, পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রিও বেড়েছে। অন্য সময়ে এই বাজারে দিনে ২০০ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি হলেও গত দু'দিনে এক হাজার বস্তার বেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। কারওয়ান বাজারের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মো. আবদুল খালেক সমকালকে বলেন, বাজার স্বাভাবিক থাকলে দিনে ২০ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি হয়। আর গত দু'দিনে তিনি একাই ১৫০ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন। রাজধানীর পেঁয়াজের বড় আড়ত শ্যামবাজারেও বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে বলে জানান পাইকারি ব্যবসায়ীরা। গত দু'দিনে গড়ে প্রায় ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ বেচাকেনা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশে ছয় হাজার টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে এই চাহিদা সাত হাজার টন। কম দামে আমদানি করা এবং দেশে মৌসুমে উৎপাদিত পেঁয়াজ অতিরিক্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এখন। এ ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের বাড়তি কোনো ব্যয় হয়নি। তবুও ভারতের রফতানি বন্ধের ঘোষণায় কেজিতে ৪০ টাকা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন তারা। এ হিসাবে গত দু'দিনে ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ বিক্রিতে ১৬০ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করেছেন ব্যসায়ীরা। এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্টরা মনে করেছেন, অতিরিক্ত মুনাফা রোধে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আইন ও কৃষি বিপণন আইন অনুযায়ী যৌক্তিক মূল্য বেঁধে দেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে পেঁয়াজে অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। এতে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষ। তিনি বলেন, গত দু'দিনে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দেড়শ' কোটি টাকার বেশি মুনাফা লুটে নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দাম নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং জোরদার করা উচিত।

বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দীন সমকালকে বলেন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। গতকাল দেশের বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অপরাধে জরিমানা করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ব্যবসায়ীদের পেঁয়াজ আমদানি বাড়ানো এবং নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর পরও কোনো ব্যবসায়ী পেঁয়াজ মজুদ কিংবা কৃত্রিম উপায়ে মূল্য বাড়ালে এবং স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন এবং সুদের হার কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্থল ও নৌবন্দরগুলোতে আমদানীকৃত পেঁয়াজ দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজ দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পৌঁছাতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের ১০ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা দেশে বেশি পেঁয়াজ সরবরাহ করা জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, যশোর, দিনাজপুর, পাবনা, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ ও শরীয়তপুরের বাজারগুলোতে তদারক শুরু করেছেন। এ ছাড়া প্রতিটি জেলা প্রশাসন থেকেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এলসি'র মাধ্যমে মিয়ানমার, মিসর ও তুরস্ক থেকে আমদানীকৃত পেঁয়াজ বন্দরে খালাস করা শুরু হয়েছে। পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় আছে।

দেশে পেঁয়াজের মূল্য ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ঢাকা শহরের ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৪৫ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। সংস্থাটির বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসের ব্যবধানে সব ধরনের পেঁয়াজের মূল্য ৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশি পেঁয়াজ ১১০ ও আমদানি করা পেঁয়াজ ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা দু'দিন আগেও যথাক্রমে ৮০ ও ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বছরে মোট পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। এর ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ স্বাভাবিকভাবেই নষ্ট হয়। এ ছাড়া বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ টন আমদানি হয়। এ হিসাবে দেশে পেঁয়াজের কোনো সংকট নেই। নতুন পেঁয়াজ ওঠা পর্যন্ত ঘাটতি নেই বলে মনে করে মন্ত্রণালয়।