করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় কোনো গ্রাহক ঋণের কিস্তি দিতে না পারলে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে এর মধ্যেও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা; যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি তিন মাস অন্তর ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে। গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমে ৯২ হাজার ৫১১ কোটি টাকায় নামে। মোট ঋণের যা ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। মার্চে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক নির্দেশনায় বলা হয়, আগে থেকে ঋণ পরিশোধ করছেন এমন গ্রাহক কিস্তি দিতে না পারলে তাকে জুন পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। এই মেয়াদ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে থেকেই বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ রয়েছে। করোনার সময়ে নতুন করে কেউ খেলাপি না হলেও আগের খেলাপি ঋণ এই সময়ে আদায় হয়নি বললেই চলে। বিশেষ সুবিধা না থাকলে হয় তো খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে যেত।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হালিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার ফলে নতুন করে কোনো ঋণ আর খেলাপি করা হচ্ছে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরোনো কিছু ঋণ খেলাপি করে দেওয়ায় জুনে সামান্য বেড়েছে। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ না বাড়লেও বকেয়া স্থিতির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। কিস্তি না দিলেও খেলাপি না করার এই নির্দেশনা তুলে নিলে দেখা যাবে একেবারেই খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। অবশ্য ব্যাংকগুলো সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন থেকে সতর্কতা অবলম্বন করছে। যেসব গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের মতো সামর্থ্য আছে তাদের ফেরত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা যাচাই করে। আবার বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও সব তথ্য যাচাই করা হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের দেখানো নিয়মিত ঋণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় খেলাপি হতে পারে। এমন হলে এসব ঋণ পরবর্তী প্রান্তিকে খেলাপি দেখানো হয়। অন্য বছর মার্চ প্রান্তিকেই এর প্রতিফলন হয়। তবে করোনাভাইরাসের কারণে এবার এই বিষয়ে বৈঠক হয়েছে মে মাসে। এ কারণে জুন প্রান্তিকের প্রতিবেদনে কিছু সংশোধন প্রতিফলিত হয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নীতি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গত বছর মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়মিত করা হয়। গত বছর রেকর্ড ৫২ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা হয়। এর মধ্যে শেষ তিন মাস অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়েই পুনঃতফসিল করা হয় ২১ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। এসব কারণে আদায় না বাড়লেও গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা হয়। এর তিন মাস আগে তথা গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এর মানে গত বছরের শেষ তিন মাসে ২১ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমেছিল। সেখান থেকে এক হাজার ৮২০ কোটি টাকা কমে মার্চে ৯২ হাজার ৫১১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। তিন মাস আগে ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। এর মানে তিন মাসে নতুন ঋণ এবং আগের সুদ মিলে ঋণস্থিতি বেড়েছে মাত্র ২৪ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। জুলাই মাস থেকে প্রণোদনার ঋণ ব্যাপকভাবে বিতরণ শুরু হয়েছে। ফলে আগামী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঋণের পরিমাণ অনেক বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্নিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফরাহ মো. নাছের সমকালকে বলেন, এপ্রিল ও মে মাসে সাধারণ ছুটিসহ নানা কারণে গত প্রান্তিকে ঋণ বিতরণ হয়েছে কম। তবে শিল্প ও সেবা খাতের প্রণোদনার ৩৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে বিতরণ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঋণস্থিতি অনেক বাড়বে বলে আশা করা যায়।

গত এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ঋণে সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হয়েছে। যে কারণে লোকসান ঠেকাতে এরই মধ্যে খরচ কমানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকগুলো। বেসরকারি খাতের এক্সিম, দি সিটি, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ও এবি ব্যাংকসহ কয়েকটি এরই মধ্যে বেতন কমিয়ে দিয়েছে। অনেক ব্যাংক নানা উপায়ে ব্যয় সংকোচন করছে।